মো. সাজ্জাদ হোসেন।।
মা শব্দটি বাংলা ভাষার অভিধানে খুব ক্ষুদ্র একটি শব্দ । মা মানে মাতা, গর্ভধারিণী,জননী । মাতা বা তৎস্থানীয়া নারীকে সম্বোধনে ব্যবহৃত শব্দ মা ।মা শব্দটি আবেগ অনুভূতিময় একটি শব্দ । মা সৃষ্টির সেরা উপহার । মহান সৃষ্টিকর্তা মা জাতিকে তার সন্তানের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে প্রেরণ করেছেন ।‘মা’ পৃথিব্বীতে সবচাইতে মধুরতম একটি শব্দ । মা ডাক সবচেয়ে মধুর ডাক । বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছেন-অনেক কথার গুঞ্জন শুনি
অনেক গানের সুর
সবচেয়ে ভাল লাগে যে আমার
‘মাগো’ ডাক সুমধুর ।সন্তানের মুখ থেকে মা শব্দটি উচ্চারিত হলে মা সবচাইতে বেশি খুঁশি হয় । ‘মা’ মধুমিশ্রিত মধুমাখা শব্দটি উচ্চারণ করলে সন্তান ও তার আবেগ অনুভূতি প্রকাশের মাধ্যমে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ কস্ট ভুলে থাকতে পারে । মা জননী, মা মমতাময়ী,মা সন্তানের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ।
কবি কাজী কাদের নেওয়াজ তার মা কবিতায় মাকে ফুটিয়ে তুলেছেন –
মা কথাটি ছোট্ট অতি
কিন্তু জেনো ভাই,
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
তিন ভুবনে নাই ।
সত্য ন্যায়ের ধর্ম থাকুক
মাথার পরে আজি,
অন্তরে মা থাকুক মম
ঝরুক স্নেহরাজি ।অসংখ্য কবি তার কবিতায়,লেখক তার লেখনিতে,গীতিকার তার গীতিতে মায়ের মমতা,মায়ের রুপ লাবণ্যময় সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছেন ।
জন গে বলেছেন-“ মা, মা-ই,তার অন্য কোনো রূপ নেই ।”
প্রতিটি সন্তান তার মায়ের কাছে অতিপ্রিয় বস্তু ।সন্তানের সুখই মায়ের সুখ । সন্তান ভালো থাকলে মা ভালো থাকে । সন্তানের দুঃখ কস্টে মা সবচাইতে বেশি ব্যথিত হয় । সন্তানের বিপদ আপদের সমস্ত খবর সবার আগে মা ই কেবল বুঝতে পারে । মা সন্তানের পরম আপনজন । মায়ের মত দ্বিতীয় কোন আপনজন সন্তানের কাছে নেই । মায়ের কোল সন্তানের জন্য সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয় । ধর্ম, কর্ম ও সংসার জীবনে দুঃখ কস্ট মানুষের নিত্য সঙ্গী । দুঃখের সাগর পাড়ি দিয়েই প্রতিটা মানুষকে সুখের সন্ধান করতে হয় । দুঃখের সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত হয়ে প্রতিটা মানুষ তার মমতাময়ী মায়ের লাবণ্যময়ী হাঁসিমাখা প্রিয় মুখটি বার বার খুঁজে । কাজী নজরুল ইসলাম তার মা কবিতায় যথার্থ ভাবে তুলে ধরেছেনহেরিলে মায়ের মুখ
দূরে যায় সব দুখ
মায়ের কোলেতে শুয়ে জুড়ায় পরান,
মায়ের শিতল কোলে
সকল যাতনা ভোলে
কত না সোহাগে মাতা বুকটি ভরান ।মা পরিবার নামক কারাগারের একজন বন্দিনী । এই বন্দিনীর দিনের কাজ শুরু হয় সবার আগে,পরিবারের সকল সদস্যের সন্তুষ্টি অর্জনের প্রাণান্তকর চেষ্টা করে যেতে হয় সারাদিন । দুই হাতে দশ হাতের শক্তি সঞ্চয় করে সারাদিনের অমানুষিক খাটুনির মাধ্যমে পরিবারের সকল সদস্যের সন্তুষ্ট চিত্ত হাঁসি মুখটি দেখার জন্য কি আপ্রাণ প্রচেষ্টা । দিনের সকল আন্তরিকতাপূর্ণ প্রচেষ্টা দিয়ে শতভাগ সফলতার সহিত দায়িত্ব পালন করা সত্বেও সফলতার ঝুড়িতে শূন্য নিয়েই সারাদিনের নাওয়া খাওয়াহীন ক্লান্ত,পরিশ্রান্ত শরীর নিয়েই রাতের মধ্যভাগে ঘুমাতে যেতে হয় এই বন্দিনীকে । পিতার ঘাম ঝরানো অন্ন সবার মুখে তুলে দেওয়ার মধ্যেই মা নামক জীবটির দায়িত্ব শেষ হয় না ।
সংসার নামক কারাগারের অভ্যন্তরে মায়ের কোন স্বাধীনতা নেই,কোন ছুটি নেই,কোন অবসর নেই,সর্বদা চিন্তা করতে হয় সন্তানের মঙ্গলের জন্য । পূর্ব আকাশে সূর্য উদিত হওয়ার আগে মাকে তার দৈনন্দিন রুটিন মাফিক কাজ শুরু করতে হয় । শহর ,নগর, গ্রাম গঞ্জের শিক্ষিত,অর্ধশিক্ষত,অশিক্ষিত সকল মা তার সন্তানকে সু-শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়ে যান । গ্রাম গঞ্জের মায়েরা যারা, শিক্ষার অলোয় নিজেকে আলোকিত করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে অথচ সন্তানকে সু-সন্তান করে গড়ে তোলার জন্য নিজের অক্ষর জ্ঞানহীন সমস্ত মেধা বুদ্ধি উজার করে দিচ্ছে । ছোট্ট শিশু ঘুম থেকে উঠার আগেই তার মায়ের মুখ থেকে শুনতে পাই কাজী নজরুল ইসলামের সেই প্রভাতী কবিতা-ভোর হলো
দোর খোলো
খুকুমণি ওঠ রে !
ঐ ডাকে জুঁই-শাখে
ফুল-খুকী ছোট রে !সকালে ঘুম থেকে উঠার পরে সন্তানকে উঠানে,বারান্দায় অথবা রান্না ঘরের মেঝেতে বসিয়ে কবি মদনমোহন তর্কালন্কারের আমার পণ কবিতাটি পড়ান-
সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,
সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি ।
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে,
আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে ।মা সন্তানকে শেখান খোকন খোকন ডাক পাড়ি, হাট টি মাটিম টিম,আম পাতা জোড়া জোড়া,তাই তাই তাই,ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি,আমাদের ছোট নদী,কানা বগীর ছা,চাঁদ মামা,মামার বাড়ির মত ছন্দময় অনেক ছড়া । মা শেখান জীবন ধর্মী ও জীবনকে বদলে দেওয়ার মত আমি হব,পারিব না এবং আদর্শ ছেলের মত অমর কবিতা । শিশু তার মনের অজান্তে মায়ের মুখ থেকে শুনে শুনে শিখে নেই সেই ছন্দময় ছড়া । মা নিজেও জানেনা এটা কোন কবি লিখেছে,তাকে কে পড়িয়েছে । মহান সৃষ্টিকর্তা কত মেধা বুদ্ধি দিয়ে মাকে এই পৃথিবীতে প্রেরণ করেছে । যোগ,বিয়োগ,গুণ,ভাগ মা হাতে কলমে লিখে শেখাতে না পারলে ও বাঁশের কঞ্চির তৈরি কাঠি দিয়ে মা যোগ বিয়োগের অংক শেখান । বিদেশী ভাষার প্রতি মায়ের ভালোবাসা না থাকলেও মা সর্বদা চেষ্টা করেছেন শিশুকে যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে ।
মা- ই একজন শিশুর প্রথম শিক্ষক । শিশুর অক্ষর জ্ঞানের পাশাপাশি নীতি নৈতিকতার শিক্ষা প্রথম পাই তার মায়ের কাছ থেকে । সন্তান আদব কায়দা,গুরুজনে ভক্তি,সৃষ্টি কর্তার প্রতি অবনত চিত্তে ভক্তি শ্রদ্ধা,নিয়মানুবর্তিতা,সময়ানুবর্তিতা সবকিছুই শেখে তার মায়ের কাছ থেকে ।
এজন্য ক্রিস্টিনা রসেটি বলেছেন-“ যে ঘরে মা আছে সে ঘরে শৃঙ্খলা আছে ।”
বিশ্ব বিখ্যাত সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট যথার্থই বলেছেন “ তোমরা আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদেরকে একটি শিক্ষিত জাতি দেবো ।”একজন মা ই তার সন্তানের ভবিষ্যতের ভীত গড়ে দেন । স্বশিক্ষিত মায়ের সচেতনতা ও সুচিন্তিত চিন্তাধারার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে সন্তানের মাধ্যমে । মা সন্তান কে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন এবং সন্তান কে স্বপ্ন দেখান । তাই শিশু মনের মধ্যে সন্তানের অজান্তে স্বপ্নের বীজ বপন করে দেন ।
“ লেখাপড়া করে যেই ।
গাড়ী ঘোড়া চড়ে সেই ।
লেখাপড়া যেই জানে ।
সব লোকে তারে মানে ।”লেখক-
প্রভাষক,হিসাব বিজ্ঞান
লাউর ফতেহপুর ব্যারিস্টার জাকির আহাম্মদ কলেজ ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
