বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক বেতন-ভাতা দেওয়ার অন্তর্ভুক্তির (এমপিওভুক্তি বা মান্থলি পেমেন্ট অর্ডার) কাজটি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিবর্তে আবারও ঢাকায় কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অধীনে আনার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষাপ্রশাসন। অনিয়ম, ঘুষ ও শিক্ষক-কর্মচারীদের হয়রানি বন্ধের লক্ষ্যে সাত বছর আগে এই কাজ মাউশি থেকে সরিয়ে বিকেন্দ্রীকরণ করেছিল তৎকালীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে এখন চার ঘাটে ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ঘটছে। এ জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ের পরিবর্তে আবারও এই কাজ কেন্দ্রে আনার পরিকল্পনা করছে বর্তমান শিক্ষাপ্রশাসন।
নতুন করে এমপিওভুক্ত হওয়া ২ হাজার ৭১৬টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক–কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির কাজটিও সরাসরি মাউশির অধীনে করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
জানতে চাইলে শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি গত বুধবার বলেন, ‘আমরা এটি করার কথা ভাবছি, যাতে শিক্ষকদের হয়রানি বন্ধ হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও অধ্যক্ষের পর্যায়ে যেসব কাগজপত্র যাচাই–বাছাই করার কথা, তা করে অনলাইনে সরাসরি মাউশিতে পাঠালে সহজেই এমপিওভুক্ত হয়ে যাবে। কারও গুরুতর কোনো সমস্যা না থাকলে কাউকে মাউশিতেও আসতে হবে না।’
অবশ্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এই কাজ আবার মাউশিতে আনা হলেও অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কা আছে। বরং এখন যেহেতু বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের নিয়োগ হয়, তাই নিয়োগের সময়ই সব কিছু ভালো করে যাচাই করে শূন্য পদে নিয়োগ দিতে হবে। এরপর বেতন–ভাতার অন্তর্ভুক্তির কাজটি সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীদের মতো করলেই এই সমস্যা থাকে না। এখনকার মতো চার ঘাটে আবেদনের দরকার নেই। এক জায়গায় কাগজপত্র দিয়ে সহজেই এমপিওভুক্ত করতে হবে।
মাউশির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ফাহিমা খাতুন বলেন, সরাসরি মাউশিতে এমপিওভুক্তির কাজটি আনা হলে এখানে আবারও অনিয়ম-দুর্নীতি হবে। আগেও মাউশিতে এই কাজে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি হতো। তাই ‘মাথাব্যথার জন্য মাথা না কেটে’ দুর্নীতির পথটি বন্ধ করে দিতে হবে। এ জন্য তদারকি জোরদার করতে হবে।
মাউশির অধীনে বর্তমানে সারা দেশে প্রায় ৩৫ হাজারের বেশি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। এগুলোর মধ্যে নতুন এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানসহ মোট এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে ২৯ হাজার ১৬৪টি। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী আছেন পাঁচ লাখের বেশি। এমপিওভুক্ত শিক্ষক–কর্মচারীরা সরকার থেকে মূল বেতন ও কিছু ভাতা পেয়ে থাকেন।
আগে মাউশির প্রধান কার্যালয় সরাসরি শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির কাজটি করত। কিন্তু ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ২০১৫ সাল থেকে মাউশির ৯টি আঞ্চলিক কার্যালয়ের মাধ্যমে এমপিওভুক্তির কাজটি চূড়ান্ত হয়। এ জন্য অনলাইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের মাধ্যমে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর আবেদন করতে হয়। উপজেলা কার্যালয় যাচাই-বাছাই করে আবেদনটি জেলা শিক্ষা অফিসে পাঠায়। সেখানে আরেক দফায় যাচাই শেষে আঞ্চলিক কার্যালয়ে পাঠানো হয় এবং সেখানেই এমপিও চূড়ান্ত করা হয়। কিন্তু এখনো এই কাজে ঘুষ ও হয়রানির ঘটনা ঘটছে।
গত বছর প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এখন ওই চার স্থানে ‘হাদিয়া বা সম্মানী’ দিয়ে আবেদন পাঠাতে (অগ্রায়ণ) হয়। শিক্ষক এমপিওভুক্তিতে নিয়ম–বহির্ভূতভাবে পাঁচ হাজার টাকা থেকে শুরু করে এক লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
বিদ্যমান অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে এখন আবারও এই কাজ মাউশিতে আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মাউশিতে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থাকা ঢাকার একটি সরকারি কলেজের একজন শিক্ষক প্রথম আলোকে বলেন, অতীতে মাউশিতে যখন এমপিওভুক্তির কাজ হতো, সেই অভিজ্ঞতা ভালো নয়।
তাই যেটি করতে হবে সেটি হলো, এনটিআরসিএর মাধ্যমে যখন শিক্ষক নিয়োগের জন্য বাছাই হবে, তখনই মাউশিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিদের রেখে সবকিছু যাচাই করে নিতে হবে। এরপর যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হবে, তাঁদের তালিকা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে বেতনের জন্য অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন দেওয়ার কাজটিও সরকারি চাকুরের মতো সহজ করার পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ মাজহারুল হান্নান। তিনি বলেন, নিয়োগ পাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক জায়গায় কাগজপত্র জমা দিলেই বেতন হতে হবে। দ্বিতীয়ত, পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করলে শিক্ষার অনেক সমস্যা কেটে যাবে।সূত্র:প্রথম আলো
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
