।। অধ্যাপক ড. হাসনান আহমেদ ।।
ছোটবেলায় গানের প্রতি আমার তীব্র আকর্ষণ ছিল। একটা গানের কলি এরকম শুনেছিলাম: ‘খোকনসোনা বলি শোনো, থাকবে না আর দুঃখ কোনো, মানুষ যদি হতেই পারো।’ খোকনসোনা-খুকুসোনাদের মা-বাপ এমন করেই তাঁদের সোনামণিদের নিয়ে অনেক ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দেখে থাকেন। যাচ্ছে
কখনো-সখনো সে-স্বপ্ন বাস্তবেও রূপ নেয়। আবার অনেক সময় সোনামণি বড় হয় বটে, মানুষরূপী মানুষই রয়ে যায় মানুষের মতো মানুষ হয় না।লালন গেয়েছিলেন, ‘এই মানুষে আছে রে মন, যারে বলে মানুষ রতন।’ মানুষের মধ্যে এই ‘মানুষ-রত্ন’ জেগে না উঠলে পরিবেশভেদে সে অমানুষ হয়, কখনো মানুষ নামের কলঙ্ক হয়, সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করে।আরেকজন শিল্পী গেয়েছিলেন, ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই, মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই, এই মানুষের ভীড়ে আমার সেই মানুষ নাই।’
শিল্পীর মনের হতাশা কি বাস্তবতার প্রতিফলন? আসলেই কি দিন দিন মানুষের চিন্তা-চেতনা, ভাবনার গন্ডি সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে ? স্বার্থপরতা বেড়ে যাচ্ছে ? হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানি, জুলুম, খুনোখুনি, দুর্বলের প্রতি সবলের আধিপত্য, প্রাবল্য ও কর্তৃত্ব, ‘নরম কাঠে ছুতোরের বল’ সীমালঙ্ঘন করছে? আত্মজিজ্ঞাসা, বিবেকবোধ, মনুষ্যত্ব, উদারতা, লোকলজ্জা প্রভৃতি মানবিক গুণাবলি ক্রমশই যারপরনাই বিলীন হয়ে যাচ্ছে ? ‘সেই মানুষ’ কোথায় গেল? কেন গেল? দায়বদ্ধতা কার? ‘দুনিয়া বোঝাই’ মানুষ কি তাহলে অমানুষ?
আমরা বলি, প্রতিটা মানুষের মধ্যে মানুষ-রত্ন লুকিয়ে আছে। তাকে বের করে আনতে হয়, উপযুক্ত পরিবেশ দিয়ে লালন করতে হয়, কাজে লাগাতে হয়। তারপর একটা মানুষ ‘মানুষ’ হয়। তাতে তার নিজের, সমাজের, দেশ ও দশের কল্যাণ হয়। সমাজ ও রাষ্ট্রময় বসবাসে শান্তির সুশীতল ছোঁয়া অনুভ‚ত হয়। উন্নতির চরম শিখরে উঠে বিশ্বসভায় জাতি-গোষ্ঠী মাথা উঁচু করে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়।
উপযুক্ত সুশিক্ষার মাধ্যমেই কেবল মানুষকে প্রকৃত মানুষ, সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং জনসম্পদে পরিণত করা যায়, সু-সঠিক পথে চালানো যায়। শিক্ষা দরকার প্রথমত, নিজের সুষ্ঠু চিন্তা-চেতনাবোধ, পরিশীলিত বিবেক ও সচেতনতা, মঙ্গল-অমঙ্গল বোঝা, পেশা নির্বাচন, আদর্শ পরিবার গঠন, ভালো মন্দ পৃথক করতে পারার ক্ষমতা অর্জনের জন্য; সুখ-শান্তিতে বসবাসের উপযুক্ত প্রগতিশীল সামাজ গঠনের জন্য; উন্নত চিন্তা ও সেবার মাধ্যমে আদর্শ ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গঠনে অবদান রাখার জন্য। দ্বিতীয়ত, সৃষ্টির কল্যাণ ও স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা, এবাদত, উপাসনা, প্রার্থনা করার জন্য। তৃতীয়ত, নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সুকুমার সৃষ্টিধর্মী প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ সাধনের জন্য।
শিক্ষা এবং লেখা ও পড়া জানা বা অক্ষরজ্ঞান থাকা এক কথা নয়। শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে এ দেশের সচেতনমহল সম্যক অবহিত। অথচ এ অস্বস্তিকর অবস্থায় নির্বাক হয়ে কিংবা হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় একদম নেই। করণীয় করতে হবে, পরিবর্তন আনতে হবে ; নইলে পরিণতি আরো ভয়াবহ হতে বাধ্য। সাধারণ স্কুল-কলেজের কথাই বলি। লেখাপড়ায় লেখাও নেই, পড়াও নেই।
নেই চিন্তা করতে শেখা, বিশ্লেষণের ক্ষমতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, জ্ঞানের স্ফুরণ, সত্যের সাধনা, চিন্তাধারার উৎকৃষ্টতা, জানার পিপাসা, শিক্ষা নিয়ে ভাবুক মন, গভীর আত্মজিজ্ঞাসা বা অধ্যবসায়। আছে শুধু নোটবই-গাইডবই বিক্রি, মোসাহেবি আর টিউশনি। সাথে মুখস্ত কিছু উত্তর শিখে টিক-চিহ্ন দিয়ে উপর-ক্লাসে ওঠার ব্যবস্থা। আছে অলীক কল্পনা, সার্টিফিকেট প্রাপ্তির তৃপ্ত ঢেঁকুর, বেকারত্ব, দলবাজির উদগ্র শ্লোগান, মনোবৈকল্য, মিথ্যার বেসাতি, ভোগবাদী মানসিকতা।
বর্তমান অধিকাংশ স্কুল-কলেজ, অন্য বড় নামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লেখাপড়া নামের সার্টিফিকেট সর্বস্ব পণ্য কেনাবেচার বাজার। এসব দোষ তো আর ছেলে-মেয়েদেরকে দিয়ে পার পাওয়া যাবে না! বাপ-মায়ের দিকে, শিক্ষকদের দিকে, পরিবেশ-পারিপার্শি¦কতার দিকে চোখ তুলে তাকাতে হবে। হাতে-গোনা অল্প কিছু ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া শেখে, কিংবা জ্ঞানার্জন করে তা শেখে তার নিজের আগ্রহের কারণে, সচেতন বাপ-মায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত¡¡াবধান, উপদেশ ও প্রেরণার কারণে। এগুলোতে আত্মপ্রসাদে তৃপ্তির ঢেঁকুর না তোলাই ভালো। ছেলে-মেয়েকে স্কুল-কলেজে পড়তে হয়, আবার শহর-গ্রাম নির্বিশেষে বাসায় টিউটর রেখে আলাদা তালিম নিতে হয়। লেখাপড়াটা আনন্দময় না হয়ে দুর্বিসহ ও ভীতিকর হয়ে ওঠে।
বর্তমান শিক্ষকদের সামাজিক অবস্থান ও শিক্ষকসুলভ অবস্থাও বেশ নাজুক। এটা তাঁদের অপকর্ম ও অপচিন্তার ফসল। শিক্ষকদের ইস্পাতকঠিন নৈতিকতা, ন্যায়নিষ্ঠা ও কর্তব্যপরায়ণতা আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। নিজেদের আত্মমর্যাদা বিসর্জন দিয়ে দুর্নীতি, ফাঁকিবাজী, অব্যবস্থা বাতিল মতামতের প্রতি আনুগত্য, মোসাহেবি করে শিক্ষকতা পেশাকে সামাজিক অবস্থানের নিন্ম পর্যায়ে নিয়ে গেছে এবং আত্মবিস্মৃত হয়ে জাত্যভিমানী শিক্ষাগুরুর মর্যাদা হারিয়েছে। এর প্রভাব সমগ্র জাতি ও শিক্ষাব্যস্থার উপর পড়েছে । শিক্ষকদের আবার বেতনও কম, তাতে পেট চলে না। মেধাবীরা তাই শিক্ষকতা পেশায় আসতেও চান না। এ দেশে আদর্শ বৈশিষ্ট্যের শিক্ষকই-বা বর্তমানে ক-জন! এ প্রজাতির শিক্ষক ক্রমশই বিলুপ্তির পথে।
শিক্ষার মান নি¤œমুখী, নৈতিকতার মান আরো নিম্নমুখী। মানবিকতা ও সততার স্তর সর্বনিম্ন পর্যায়ে; বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। তাহলে শিক্ষার চিকিৎসকরা কি ভুল ব্যবস্থাপত্র বাতলাচ্ছেন ? চিকিৎসা কি ব্যর্থ হতে চলেছে? আমরা কি দিগ্ভ্রান্ত হয়ে গেছি? এক্ষেত্রে জাতির ভবিষ্যৎ কী? এ জাতি কি তাহলে অন্য কোনো সম্প্রসারণবাদী ভিনদেশী গোষ্ঠীর গোলামি করে খাবে? শিক্ষার আলো না থাকলে বুনো গাঢ় আঁধারে চারদিক ছেয়ে যাবে, এটাই প্রকৃতির অবশ্যম্ভাবী নিয়ম।
মাদ্রাসা শিক্ষায়ও কয়েকটা ভাগ। কওমি মাদ্রাসা, আলিয়া মাদ্রাসা এবং মক্তব/নূরানি ও ফুরকানিয়া/হাফেজিয়া মাদ্রাসা। এখানে সমগ্র জীবনে সৃষ্টি-স্রষ্টার চিন্তাধারা, উদ্দেশ্য ও জীবন-কর্ম শুধু পরকালের বেহেশত নসিবের সরু গলিতে আটকে গেছে। ধর্মটাকেই পুরো পেশা বানিয়ে ছেড়েছে। উ”চশিক্ষা ও কর্মজীবনের শিক্ষা নেই বললেই চলে।
ভিন্ন কোনো উ”চমানের পেশায় যাবারও প্রচেষ্টা নেই। মাদ্রাসা শিক্ষা মুসলমানদের সভ্যতা, ঈমান, বৈশিষ্ট্য, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ঐতিহ্যকে প্রাগ্রসর প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রগতিশীল না করে অজ্ঞতা ও চিন্তার বিকলতা দিয়ে পিছনের দিকে ফিরিয়ে আদিম যুগে নিয়ে যেতে চায়।অথচ সেখানেও অবিকশিত প্রতিভাবান ছেলে-মেয়ে রয়ে গেছে। কোনো ছাত্রছাত্রীই এ দেশের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, জীববিজ্ঞানী, পদার্থবিদ, হিসাববিদ, অর্থনীতিবিদ, ব্যবস্থাপক, ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট, বিমানচালক ইত্যাদি শতেক পেশায় জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখে না।
ইহকালের স্রষ্টা-সৃষ্টিসেবার ইবাদত ছাড়া পরকাল যে অচল, তা জানে না, বোঝে না বা বুঝতেও চায় না, কেউ বোঝায়ও না। দুনিয়া সৃষ্টি না হলে আখেরাত থাকে কী করে? কর্ম আছে বলেই কর্মফল আছে। কর্মের অস্তিত্ব না থাকলে ফল লাভ দুঃসাধ্য এসব চিন্তা তাদের কাছে কল্পনাতীত। লেখাপড়ায় গণিত, বাংলা, বিজ্ঞান, ইতিহাস, আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যবসায় শিক্ষা বিষয় পুরোপুরি অনুপস্থিত ।
চলবে===
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
