।। সৈয়দ আনিছুর রহমান।।
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাক হানাদার বাহিনীর পক্ষে এ.এ.কে. নিয়াজী ভারতীয় কমান্ডের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরােরার কাছে অস্ত্রসমর্পণ করেন। আমরা মুক্ত হই। দেশ স্বাধীন হয়। কিন্তু বিজয় দিবসের আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানী অনুপস্থিত ছিলেন। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কেন তিনি অনুপস্থিত ছিলেন, ইতিহাসের আলােকে ঘটনাটি জেনে নেয়া যেতে পারে।
জেনারেল এম.এ.জি. ওসমানী ১৩ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে কলকাতা থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পরিদর্শনে আসেন। তাঁর সফর সঙ্গীদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল ওসমানীর এডিসি শেখ কামাল, মুক্তিবাহিনীর চীফ অব স্টাফ জেনারেল এম.এ. রব (এম.এন.এ), ব্রিগেডিয়ার গুপ্ত, ভারতীয় দু’জন পাইলট, ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং রিপাের্টার আল্লামা।।
ভারতীয় হেলিকপ্টার M-8 এ চড়ে সফর সঙ্গীদের নিয়ে কলকাতা থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট পরিদর্শনে আসেন জেনারেল ওসমানী।
ব্রিগেডিয়ার গুপ্তের তত্ত্বাবধানে হেলিকপ্টারটি জেনারেল ওসমানী ও তাঁর সফর সঙ্গীদের জন্য বরাদ্দ দিয়েছিলেন প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ। এ হেলিকপ্টার যােগে কুমিল্লা ও সিলেট যাবেন বলে স্থির করলেন জেনারেল ওসমানী। ১৩ই ডিসেম্বর বিকেলে তিনি কলকাতা থেকে কুমিল্লা এলেন। সেখানে ওয়াপদা গেষ্ট হাউজে রাত কাটালেন । ক্যান্টনমেন্ট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলেন।
তখনও কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে যুদ্ধ চলছিল। ১৪ই ডিসেম্বর ক্যান্টনমেন্ট পরিদর্শনে বিভিন্ন পথে গেরিলাদের পাঠালেন এবং বেঙ্গল রেজিমেন্ট ইপিআর সেনাদের সম্মুখ আক্রমনে উৎসাহিত করলেন। ফলে পাক সেনাদের মনােবল ভেঙ্গে পড়ল। ১৫ই ডিসেম্বর ওরা আত্মসমর্পণ করল।
এদিকে ১৬ই ডিসেম্বর সকালে সবার কাছে এ বিষয়টি পরিষ্কার হল যে, আজ বিকেলে ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে। মানসিকভাবে সবাই ঢাকার পথে রওনা হবার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত, অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান।
কিন্তু যৌথ কমান্ড বাহিনীর প্রধান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এ মর্মে একেবারেই চুপ। তাঁর ক্রিয়াও নেই, প্রতিক্রিয়াও নেই। জেনারেল ওসমানীর এডিসি আমাদের প্রিয় নেতা শেখ মুজিবের বড় ছেলে শেখ কামাল এবং ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করায় তিনি যা বললেন, তার মর্মার্থ হলাে-
তিনি বিষয়টি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত। তবে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ তাঁকে এখন ঢাকায় না যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। পরে প্রবাসী সরকারের সাথে একযােগে যেতে বলেছেন। দিনক্ষণ তাজউদ্দিন সাহেব জানাবেন। যুদ্ধ ক্ষেত্রে তিনি সর্বেসর্বা হলেও মূল আদেশ আসে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের বরাতে। গণতন্ত্রের আচরণে যুদ্ধের সেনাপতি প্রধানমন্ত্রীর অধীন। এটাই সঠিক বিধান। ওসমানী সাহেব।
বললেন, I have not yet received order to move to Dhaka. I decide tacties. My order is final for firing. But I receive orders from the cabinet through PM Mr. Tajudding Ahmed.
পরে জেনারেল ওসমানী ব্রিগেডিয়ার গুপ্তের কাছে সিলেটের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জানালেন, “Sylhet is clear.” ওসমানী সাহেব সফর সঙ্গীদের বললেন, “তাহলে চলুন, আমরা সিলেট যাই। সেখানে গিয়ে আমার পিতা মাতার কবর জিয়ারত করি। শাহ জালালের পুণ্য মাজারে আমার পূর্ব পুরুষগণ ঘুমিয়ে আছেন।” ওসমানী সাহেব শেখ কামালকে ডেকে সবাইকে তৈরী হতে বললেন।
আধা ঘন্টার মধ্যে সবাই ভারতীয় হেলিকপ্টার M-8 যােগে আকাশ পথে সিলেট পানে এগিয়ে। চলছিলেন। আকাশ নিরাপদ। পাক শত্রু বিমান তাে কয়েক দিন আগেই ধবংস হয়েছে।
কিন্তু অতর্কিতে একটি প্লেন এসে চক্কর দিয়ে চলে গেল। হঠাৎ গােলা বিস্ফোরণের আওয়াজ। ভেতরে জেনারেল রবের আর্তনাদ। জেনারেল রবের উরুতে আঘাতের পরপরই তাঁর কার্ডিয়াক এরেস্ট হল। মানে হার্ট প্রায় অচল।
ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী এক্সটার্নাল কার্ডিয়াক ম্যাসাজ দিতে শুরু করলেন। (যে প্রক্রিয়ায় হাট সচল হয়)। উল্লেখ্য যে, শেখ কামাল ও ব্রিগেডিয়ার গুপ্তও সামান্য আহত হয়েছিলেন। অন্যদিকে পাইলট চিৎকার করে বললেন, “We have been attacked, অয়েল ট্যাংক হিট হয়েছে। তেল বেরিয়ে যাচ্ছে। অল্প কিছুক্ষনের মধ্যে সবার চোখের সামনে হেলিকপ্টারটি দাউ দাউ করে আগুনে পুড়তে শুরু করলাে।
প্রথম প্রথম গ্রামবাসীরা বিমানটিকে শত্রু বিমান মনে করল। মুহুর্তেই তারা আসল ব্যাপার বুঝল। তাই হঠাৎ চিৎকার করে বলে উঠল, “আমাদের কর্ণেল সাৰ বারে।” তারপর তাকে নিয়ে নাচতে শুরু করল। জনতার বিজয় উল্লাসে জেনারেল রবের যেন হুশ ফিরে এল। উনি চোখ মেলে তাকালেন।
পরবর্তী জীবনে জেনারেল রব প্রায়ই বলতেন যে, ডা: জাফরুল্লাহ তাকে দ্বিতীয় জীবন দিয়েছেন। ভারত সরকার কখনাে এ ঘটনার তদন্ত রিপাের্ট প্রকাশ করে নি। স্বাধীনতার বিজয় উল্লাস এবং প্রাণ প্রিয়।
নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের প্রতি আশংকা এ দ্বিবিধ কারণে জাতীয় পর্যায়ে ঘটনাটি চাপা পড়ে যায়। কারণ, সে সময় তিনি পাকিস্তানের কারাগারে আটক ছিলেন।
আমার মনে হয়, বিষয়টি অনেক আগেই পরিষ্কার হওয়া উচিত ছিল। অনেক দেরি হয়ে গেছে। আজ আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পালন করছি। এ উপলক্ষে অবিলম্বে জাতীয় পর্যায়ে ঘটনাটি খােলসা হবার দাবি রাখে।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
