ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী।।
লালন ফকিরের এই বিখ্যাত গানটি নিশ্চয়ই অনেকে শুনেছেন। “মন সহজে কি সই হবা/চিরদিন ইচ্ছা মনে আল ডেঙ্গায়ে ঘাষ খাবা/মন সহজে কি সই হবা। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাংলাদেশে মন কখনো সই হয় না, আর এখানে প্রত্যেকের চিরদিনের ইচ্ছা, আল ডিঙ্গিয়ে ঘাস খাওয়া।
অর্থাৎ তার নির্ধারিত সীমারেখা অবিরাম অতিক্রম করে যাওয়া। সেই কারণে পুকুর কাটা শিখতে, খিচুড়ি রান্না করা শিখতে, বিদ্যুতায়ন শিখতে, মাছ চাষ শিখতে দলে দলে লোক বিদেশ ভ্রমণে যায়। তবে চুরি বিদ্যা শিখতে এ পর্যন্ত কোনো দল বিদেশ ভ্রমণে যায়নি। কারণ চুরি বিদ্যায় আমরা বিশ্বখ্যাত ওস্তাদ। এমন কি এক্ষেত্রে আমাদের দক্ষতা এতোটাই প্রকট যে ইটালিয়ানরাও আমাদের কাছে হার মেনে গেছে।
এ সম্পর্কে মরহুম সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী একটি গল্প বলেছিলেন। গল্পটি এমন যে আওয়ামী শাসনের ধারাবাহিকতার ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইটালিয়ান এম্বাসিতে একটা পার্টি হয়েছিলো। তাতে এম্বাসেডর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, তোমরা কিভাবে আমাদেরকে ডিঙ্গিয়ে পৃথিবীর সেরা দুর্নীতিবাজ রাষ্ট্রে পরিণত হলে।
চোর-ছ্যাচ্চোর, পকেটমার থেকে শুরু করে হেন কোনো দুর্নীতি, বড় অপরাধ নেই যে বিষয়ে আমাদের দক্ষতা ও সুনাম নেই। তারপরও তোমরা আমাদের ছাড়িয়ে গেলে কিভাবে? সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী জানতে চাইলেন, কীভাবে? ইটালিয়ান রাষ্ট্রদূত তাকে জানান যে, আসলে তোমরা সিঁদেল চোর
। চুরি যে কর, তার বহু রকম প্রমাণ আশপাশে রেখে যাও। সেটাই তোমাদের কাল হয়েছে। সবাই বলতে পারছে, এই যে দেখো, বাংলাদেশ দুর্নীতির শীর্ষে উঠে গেছে। কিন্তু আমি মনে করি আমরাই আছি দুর্নীতির শীর্ষে। কিন্তু সেটা দেখা যায় না। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী জানতে চেয়েছিলেন, কেমন করে লুকাও।
রাষ্ট্রদূত বলেছিলেন, আমরা দুর্নীতি করে ভাগেযোগে খাই। নিজেরাও খাই অপজিশনকে তার খানিকটা ভাগ দেই। ফলে আমাদের দুর্নীতি নিয়ে তেমন একটা শোরগোল উঠে না। কিন্তু তোমাদের অসুবিধা হলো, তোমরা যখন দুর্নীতি কর, তখন পুরোটাই নিজেরা খেয়ে ফেল।
অপজিশনকে কিছুই দাও না। ফলে অপজিশনওয়ালারা রাস্তাঘাটে সভা, সমিতি করে, বেতার-টিভিতে কান ফাটিয়ে বলতে থাকে, গলি গলিমে শোর হ্যায়, এই সরকার চোর হ্যায়। ফলে তোমরা সেরা চোরে পরিণত হও।
বাংলাদেশে ক্ষমতা মানেই চুরি। যে ক্ষমতায় আছে, সে চোর না হয়েই যায় না। দশ টাকা খেলেও চোর, দশ হাজার কোটি টাকা খেলেও চোর। এদিকে আবার চোরে চোরে মাসতুতো ভাই। একজন আর একজনকে রক্ষা করার প্রাণান্ত চেষ্টা করে। ফলে চুরিতে সয়লাব।
পি.কে. হালদার সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা চুরি করেছে। তাকে সহায়তা করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস. কে. সুর। পি. কে. হালদার কানাডায় পলাতক। এস. কে. সুর দিব্যি আছেন। গ্রেফতার হননি। সাত লাখ টাকায় পর্দা কিনেছেন, বালিশ কিনেছেন পাঁচ হাজার টাকায়।
প্রতিটি বালিশ নিচ থেকে উপরে তুলেছেন প্রায় হাজার টাকা ব্যয়ে। শতকোটি টাকার চিকিৎসাসামগ্রী কেনা হয়েছে। কিন্তু সরঞ্জাম ডেলিভারি পাওয়া যায়নি। খালি কার্টন জমা দিয়ে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন। তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। কোনো একটি প্রকল্পে দুই-তিনশ কোটি টাকা খরচ করার পর প্রকল্পে ত্রুটি ধরা পড়েছে। এই প্রকল্প যারা প্রণয়ন করেছিলেন, অনুমোদন করেছিলেন, দেশের সম্পদ অপচয়ের জন্য তাদের ফাঁসিতে ঝোলোনা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ডুবে গেছে পানির নিচে। ভেঙে-ফেটে চৌচির হয়ে গেছে। আমলারা প্রধানমন্ত্রীকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছে যে, এগুলো শাবল, হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। ক্যাসিনো কিং সম্রাটকে মাসের পর মাস হাসপাতালে জামাই আদরে রাখা হয়েছে। কোর্টে হাজির করা যাচ্ছে না। কার ইঙ্গিতে কিংবা কার প্রশ্রয়ে এই যুবলীগ নেতা এ রকম হাসপাতাল সুবিধা পাচ্ছেন, সেটি জানা যাচ্ছে না। এই হলো বাংলাদেশে চোরের কাহিনীর কিয়দংশ।
এবার ধান ভানতে খানিকটা শিবিরে গীত গাইছি। সেটি ঢাকা শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে। জানি না, এ কাজের জন্য যে কোথায় ট্রেনিং নিয়েছেন, কোন দেশে ডজন ডজন সরকারি কর্মচারী প্রশিক্ষণ নিতে গিয়েছিলেন। কিন্তু পুরানো ট্রাফিক ব্যবস্থা কেন অচল হয়ে পড়লো, সেটি বোঝা যাচ্ছিল না। তারপর অনেক টাকা খরচ করে অনেক শোরগোল তুলে এক নতুন জিনিস এলো ঢাকায়- ইউলুপ। আমার মতো আনাড়ি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণকারী ব্যক্তিও প্রথমে বুঝতে পারিনি।
তারপর দেখলাম এয়ারপোর্ট রোড ও রামপুরা রোডে ঢুকে দেখলাম, বেশ চমৎকার। হাতিঝিল থেকে আগে সরাসরি রামপুরা রোডে ঢোকা যেত। ওই ইউলুপ নামক ওভারব্রিজ পার হতে এখন তিন কিলোমিটার ঘুরতে হয়। তাতে কি যে সুবিধা হলো, বুঝে উঠতে পারলাম না। এতে না সময় বেঁচেছে, না ট্রাফিক জ্যাম কমেছে। কারও কাছে কোনো চোর কর্মকর্তা শুনেছিলেন যে, এরকম ইউলুপ বসালে ট্রাফিক অনেক সহজ হবে। আর হতে পারে, এটা দেখার জন্য ডজন ডজন লোক বিদেশে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। ফলে হয়ে গেল জায়গায় জায়গায় ইউলুপ। কী চমৎকার দেখা গেলো।
একটা সামান্য উদহারণ, তেজগাঁও-নাবিস্কো থেকে সাত রাস্তার মোড় পর্যন্ত খুব এটা ইউটার্নের ব্যবস্থা আগে ছিল না। রেওয়ের ওভারব্রিজ থেকে নেমে সোজা চলে যাওয়া যেত তেজগাঁয়ের ভেতরে। কিংবা ঐ পথে ডানে মোড় নিয়ে গাড়ি যেতে পারতো সোজা রেওয়ের ওভারব্রিজে। এ ব্যবস্থা বন্ধ করে পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ নতুন ব্যবস্থা চালু করলো।
ব্রিজ বরাবর রাস্তাটি বন্ধ করে দিয়ে সামনে সরু একটি ইউলুপ বসানো হলো। এখন সমস্যা হচ্ছে, নাবিস্কো থেকে একটি যানবাহন এলে অনেক আগে ডানে টার্ন নিয়ে ব্রিজে উঠতে পারতো। আর ব্রিজ পার হতে ২০ থেকে ৩০ মিনিট তো লাগেই। এর জবাব কে দেবে? কিন্তু এখন অধিকাংশ সময় ঐ পথে ডানে টার্ন নিয়ে কোনো যানবাহন ব্রিজের দিয়ে যেতে পারে না। প্রায় অর্ধডজন পুলিশ কনস্টেবল সকলকে দক্ষিণ দিকে যেতে নির্দেশ করে। সামনে একটা সরু ইউলুপ।
যানবাহনগুলো যখন ইউলুপ ধরে পশ্চিমের সড়ক লেন ধরতে যায়, তখন এক বিরাট যানজট লেগে যায। ট্রাফিক হয়ে যায় ধীর। ওঃ, যারা ঐ পথে চলেন, তারা সে যানজটের বেদনা জানেন।
এখন নতুন বিড়ম্বনা চলছে। হামেশাই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে ব্রিজ বরাবর রাইট টার্ন। সামনে যাও। গেলাম। কিন্তু সামনের ইউলুপের প্রবেশপথ বন্ধ। তাহলে? কেউ যদি নাবিস্কো থেকে এসে ডানে টার্ন নিতে চান, তাহলে তাকে যেতে হবে সাত রাস্তার মোড় পর্যন্ত। তারপর ঘুরে আসতে হবে সেখানে ইউটার্ন নিয়ে।
আবার সাতরাস্তা থেকে ডানে টার্ন নিয়ে এক নরক যন্ত্রণা। রাস্তা কাটা। ট্রাফিক স্লো, ধুলো, গর্ত। গাড়ি চলে না, গাড়ি চলে না। কিন্তু যদি মাঝখানের ইউলুপ দিয়ে পার না হয়ে যাওয়া যায়, তাহলে এত ঢাকঢোল পিটিয়ে এগুলো তৈরি কেন করা হলো?
এগুলো সবই আল ডিঙ্গিয়ে খাস খাওয়ার গল্প। শুধু ইউলুপের কাহিনী নয়, কাহিনী ইলেকট্রনিক সিগনাল ব্যবস্থা কার্যকর করারও। ঢাকা শহরে মোট চার-পাঁচটা সিগনাল ছাড়া কোথায়ও ইলেকট্রনিক সিগনাল কার্যকর নয়। কেন? কেউ জানে না। দুর্নীতি এতটাই পরিব্যাপ্ত যে, মন কখনও সই হবে না। চিরদিন ইচ্ছা মনে সীমানা লঙ্ঘন করে এরা সবাই আল ডিঙ্গিয়ে খাস খাবে।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
