নিউজ ডেস্ক।।
কিছু ব্যাংক কর্মকর্তার যোগসাজশেই ফাঁস হচ্ছিল ব্যাংকে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। একবার দুইবার নয়, পরপর চারটি নিয়োগ পরীক্ষাতেই তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে।
প্রশ্নœপত্র ফাঁসে জড়িত চক্রের পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। তাদের মধ্যে তিনজনই সরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। গোয়েন্দা বিভাগের তেজগাঁও জোনাল টিম ৬ নভেম্বর থেকে গতকাল বুধবার ভোর পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে পাঁচজনকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতাররা হলোÑ আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির আইসিটি টেকনিশিয়ান মোক্তারুজ্জামান রয়েল, জনতা ব্যাংক গুলশান শাখার অফিসার শামসুল হক শ্যামল, রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার জানে আলম মিলন, পূবালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার মোস্তাফিজুর রহমান মিলন এবং চাকরিপ্রার্থী স্বপন।
আহছানউল্লাহর কাছে ব্যাখ্যা তলব : এ দিকে ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের ভিত্তিতে আহছানউল্লাহ ইউনির্ভাসিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিকে এ বিষয়ে কৈফিয়ত তলব করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১৪ নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে। ব্যাখ্যা পাওয়ার পরই বাংলাদেশ ব্যাংক আইনি ব্যবস্থা নেবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র এবং নির্বাহী পরিচালক মো: সিরাজুল ইসলাম গতকাল নয়া দিগন্তকে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, ‘প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি আমরা গণমাধ্যমে জেনেছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ জন্য কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে। তবে প্রশ্নফাঁস বা এ বিষয়ে আমরা আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটির কাছে কৈফিয়ত তলব করেছি। তাদের মতামত জানতে চেয়েছি।
মাঝখানে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় আগামী ১৪ নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জবাব দিতে বলা হয়েছে।’ মুখপাত্র বলেন, ‘যেহেতু কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতামতও নিতে হবে। এসব কৈফিয়ত পাওয়ার পরই বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
চাঞ্চল্যকর তথ্য : প্রশ্নপত্র ফাঁস সম্পর্কে ডিবির প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জড়িত সরকারি ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে প্রশ্নপত্র প্রণয়নসহ পরীক্ষা আয়োজনে দায়িত্বপ্রাপ্ত আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজির আইসিটি বিভাগ থেকে প্রশ্নফাঁস হয়েছে বলে জানায় ডিবি।
চক্রটি এ পর্যন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
গতকাল বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) এ কে এম হাফিজ আক্তার।
তিনি বলেন, পাঁচটি ব্যাংকে অফিসার ক্যাশ পদে এক হাজার ৫১১ জনকে নিয়োগ দিতে ৬ নভেম্বর বিকেলে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। বিকেল ৩টা থেকে ৪টা পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন কেন্দ্রে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার সিলেকশন কমিটির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র তৈরি ও পুরো পরীক্ষা সম্পাদনের দায়িত্বে ছিল আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস হবেÑ ৫ নভেম্বর রাতে এমন তথ্য আসে ডিবির কাছে।
ডিবি টিমের সদস্যরা ছদ্মবেশে পরীক্ষার্থী সেজে ৬ নভেম্বর সকাল ৭টার দিকে প্রশ্নপত্রসহ উত্তর পাওয়ার জন্য চক্রের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করেন। অগ্রিম টাকা পরিশোধের পর প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ফাঁস চক্রের অন্যতম হোতা রাইসুল ইসলাম স্বপন পরীক্ষার্থীকে নিয়ে যান। এরপর পরীক্ষার উত্তরপত্রসহ স্বপনকে হাতেনাতে আটক করা হয়।
৬ নভেম্বর পরীক্ষায় আসা প্রশ্নের সাথে সকালে পাওয়া প্রশ্ন ও উত্তর হুবহু মিলে গেলে স্বপনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে রূপালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার জানে আলম মিলনকে সাভারের শ্রীনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়। মিলনের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে অভিযান চালানো হয়। তবে জানা যায়, প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র সরবরাহকারী শামসুল হক শ্যামল ঢাকায় অবস্থান করছেন। পরে ঢাকার দক্ষিণ বাড্ডা থেকে শামসুল হক শ্যামলকে গ্রেফতার করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে প্রশ্নপত্রসহ উত্তরপত্র ফাঁস করার কথা স্বীকার করেন শামসুল হক শ্যামল। তার দেয়া তথ্যে চক্রের মূল হোতা মুক্তারুজ্জামান রয়েলকে বাড্ডার আলিফনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়। মুক্তারুজ্জামান আহছানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে আইসিটি টেকনিশিয়ান (হ্যার্ডওয়ার ও সফটওয়্যার) হিসেবে কাজ করতেন। আহছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অন্য সহযোগীদের সহায়তায় প্রশ্ন ও উত্তরপত্র সংগ্রহ করার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।
পুলিশ কর্মকর্তা এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, পরীক্ষার আগে চক্রের সদস্যরা রাজধানীর বাড্ডা, বসুন্ধরা, উত্তরা, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, রূপনগর, মিরপুর, মাতুয়াইল, শেওড়াপাড়া, শেরেবাংলানগর, পল্লবী এলাকায় বুথ বসায়। এসব বুথে পরীক্ষার পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা আগে নিজস্ব লোকের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের ফাঁস করা প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানো হয়। চক্রের সদস্যদের তত্ত্বাবধানে প্রত্যেক বুথ থেকে ২০ থেকে ৩০ জন পরীক্ষার্থীকে উত্তর মুখস্থ করিয়ে কেন্দ্রে পাঠানো হয়।
ডিবি প্রধান বলেন, এ পর্যন্ত ১১টি বুথের তথ্য, চক্রের ২৫ থেকে ৩০ জন এবং প্রায় ২০০ জন পরীক্ষার্থীর নাম পেয়েছি। মোক্তারুজ্জামান রয়েল প্রশ্ন ও উত্তর ফাঁসের মূল হোতা। মোক্তারের কাছ থেকে প্রশ্ন নিয়ে শামসুল হক শ্যামল বিভিন্ন বুথে সরবরাহ করেন। জানে আলম ও মোস্তাফিজুর রহমান মিলন পরীক্ষার্থী সংগ্রহ ও বুথ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন ও উত্তর মুখস্থ করান। অর্থের বিনিময়ে প্রশ্ন ও উত্তরও দেন তিনি।
জিজ্ঞাসাবাদে মুক্তারুজ্জামান ও শ্যামল ডিবিকে জানান, এর আগে আরো তিনটি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ও উত্তর ফাঁস করেছেন তারা। পরীক্ষার পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা আগেই বিভিন্ন সোস্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে প্রায় দুই হাজার পরীক্ষার্থীর মাঝে তারা প্রশ্ন ও উত্তর সরবরাহ করেছেন।
নিয়োগ পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীর কাছ ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। এমসিকিউ পরীক্ষার আগে ২০ শতাংশ, লিখিত পরীক্ষার আগে আরো ২০ শতাংশ এবং নিয়োগ পাওয়ার পর বাকি ৬০ শতাংশ টাকা পরিশোধের শর্তে পরীক্ষার্থীদের সাথে চুক্তি হতো তাদের।
ডিবি কর্মকর্তা বলেন, প্রশ্নফাঁস চক্রের সাথে আহছানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকার্স সিলেকশন কমিটির কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ চক্রে আরো যারা জড়িত তাদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
