এইমাত্র পাওয়া

বছরের প্রথম বিনামূল্যের সকল বই পাওয়া অনিশ্চিত

অনলাইন ডেস্ক।।
আগামী শিক্ষাবর্ষের (২০২২) বিনামূল্যে পাঠ্যবইয়ের বড় এক অংশের ছাপার আদেশ এখনো দিতে পারেনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ৬ষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইয়ের ছাপার আদেশ দেওয়া হবে আগামী ৯ নভেম্বর। টেন্ডারের শর্তানুসারে মুদ্রণকারীদের বই স্কুলে স্কুলে পৌঁছে দিতে হবে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারীর মধ্যে। ফলে ১ জানুয়ারি ‘বই উৎসবে’র দিনে ওই শ্রেণিগুলোর সব শিক্ষার্থী নতুন বই হাতে পাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এদিকে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা শনিবার বলেছেন, ‘বই ছাপার কাজ চলছে। হাতে আছে এখনো ৫৫ দিন, প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ করে ছাপা হচ্ছে। প্রতিদিনই বই যাচ্ছে উপজেলা পর্যায়ে। ফলে সমস্যা হবে না।’
অপরদিকে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জাতীয় সংগঠন মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘নানা তথ্য ধামাচাপা দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক দেখানো হচ্ছে। আসলে আগামী শিক্ষাবর্ষে বিনামূল্যে পাঠ্যবইয়ের মুদ্রণ-বাঁধাই-বিতরণ কোনটিই স্বাভাবিক নয়। সময়মতো শিক্ষার্থীরা বই হাতে পাবে না। আগামী এক মাসের মধ্যে চেয়ারম্যান অবসরে যাচ্ছেন, ফলে তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে তাকে (চেয়ারম্যানকে) পাওয়া যাবে না। ‘
২০২২ সালের ১ জানুয়ারি নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে আর মাত্র ৫৫ দিন। নতুন শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ নিয়ে এনসিটিবিতে চলছে এক ধরনের হ-য-ব-র-ল অবস্থা। কখনো বলা হচ্ছে করোনার প্রভাব, কখনো বলা হচ্ছে কারিকুলামের অনুমোদন দেয়নি মন্ত্রণালয়। আবার দফায় দফায় টেন্ডার ও রি-টেন্ডার করে টেন্ডারের শর্ত লঙ্ঘন ও বিধিমতো টেন্ডারের শর্ত সংশোধন না করে সময়ক্ষেপণ করার কারণেই বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
এনসিটিবি ও মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতি এবং মুদ্রণকারীদের একাধিক সূত্রের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে জানা গেছে, প্রাথমিকের ১ম ও ২য় শ্রেণির বই ছাপার কাজ শেষ পর্যায়ে। ১ম ও ২য় শ্রেণির কিছু বই ছাপা হচ্ছে ভারতের কোলকাতায়। এ বইগুলো হয়ত সময়মতো শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাবে। কিন্তু প্রাক-প্রাথমিকের বইয়ের ছাপার কাগজই শনিবার পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি এনসিটিবি। কারণ, যে কাগজে বই ছাপার জন্য টেন্ডার দেওয়া হয়েছে, সে মানের কাগজ দেশে তো নয়ই, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো প্রতিষ্ঠানই উৎপাদন করে না। ফলে কাগজ সংকটে দফায় দফায় বদলানো হচ্ছে ‘স্পেসিফিকেশন’। ফলে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে আর চূড়ান্ত কার্যাদেশ পাচ্ছে না ছাপাখানাগুলো। কাগজ সম্পর্কে এনসিটিবির এ ধরনের অজ্ঞতায় ক্ষুব্ধ মুদ্রণকারীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রি-প্রাইমারি থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত সোয়া ২ কোটি শিক্ষার্থীর জন্য সাড়ে ৩৫ কোটি বই ছাপা-বাঁধাই এবং স্কুলে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে
বিতরণ করতে অবশিষ্ট আছে মাত্র ৫৫ দিন। ছাপার ব্যাপারে পিছিয়ে আছে সবচেয়ে বেশি মাধ্যমিক স্তরের (সাধারণ-মাদ্রাসা-কারিগরি) বইগুলো। অর্থাৎ ৬ষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বই। এ বই ছাপার জন্য প্রাথমিকে ১৯৮টি এবং মাধ্যমিকের জন্য ৪০০ প্যাকেজে কার্যাদেশ দিয়ে টেন্ডার হয়েছে। এর মধ্যে কোলকাতার কৃষ্ণা ট্রেডার্স প্রাথমিকের (১ম ও ২য়) শ্রেণির ৫ লাখ বই ছাপার আদেশ পেয়েছে। এ প্রতিষ্ঠান একটি ট্রেডিং কোম্পানি। তারা অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বই ছাপাবে। এ সুবিধা বাংলাদেশের কোনো কোম্পানিকে দেওয়া হয় না বলে অভিযোগ দেশীয় মুদ্রণকারীদের। তারা বলেন, ‘এমন হলে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির টেন্ডারেই অংশ নেওয়ার সুযোগ পেত না।’
বই ছাপার অন্য প্যাকেজগুলোর সব কয়টি দেশীয় মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠান পেয়েছে। মুদ্রণকারীদের এনসিটিবি সময়মতো কাগজ দিতে না পারা, দফায় দফায় টেন্ডারের শর্ত সংশোধন, কারিকুলামের অনুমোদন না পাওয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতায় দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এতদিন চূড়ান্ত কার্যাদেশ পায়নি। জানা গেছে, আগামী ৯ নভেম্বর দেশীয় বেশ কিছু মুদ্রণকারীর সঙ্গে এনসিটিবির কার্যাদেশের চুক্তি হবে। তারা ৮ম ও নবম শ্রেণি এবং ৬ষ্ঠ ও ৭ম শ্রেণির বই ছাপাবে। টেন্ডারের শর্তনুসারে ৮৪ এবং ৭০ দিন সময় পাবে। অর্থাৎ আগামী ৩ ফেব্রম্নয়ারির মধ্যে বই দিতে বাধ্য থাকবে। ফলে ১ জানুয়ারির মধ্যে ওই বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাবে না। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এনসিটিবির চেয়ারম্যান বলেন, টেন্ডারের পরপরই যারা সাড়া দিয়েছিল, তারা এরই মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছে। এখন যা হচ্ছে বা হবে, তা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
এদিকে এসব সংকটসহ নানা বিষয় নিয়ে আজ রোববার দেশীয় সব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধারদের এনসিটিবিতে মতবিনিময়ের জন্য ডাকা হয়েছে। এ বৈঠক এনসিটিবির চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। আগামী শিক্ষাবর্ষের বই ছাপানোই এ সভার একমাত্র এজেন্ডা।
অপরদিকে যারা কার্যাদেশ পেয়েছেন, তাদের মধ্যে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠান ‘অগ্রণী প্রিন্টার্স’। এটির ছাপাখানা হচ্ছে নোয়াখালীতে। তারা সর্বাধিক ১০০ কোটির অধিক বই ছাপার আদেশ পেয়েছে। এত বই ছাপার মতো অবকাঠামো না থাকার পরও এ কার্যাদেশ পাওয়ায় তারা বই ছাপা সংকটে রয়েছে বলে মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে। তাদের বই ছাপা ও কাগজের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে এনসিটিবির কাছে মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ করেছে মুদ্রণ শিল্প মালিক সমিতি। সমিতির উপদেষ্টা তোফায়েল আহমেদ  এ তথ্য জানিয়ে বলেন, ‘রোববার (আজ) মতবিনিময় সভায়ও আমরা বিষয়টি এনসিটিবির নজরে আনব।’ এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা বলেন, ‘আমরা কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। প্রমাণ ছাড়া এসব অভিযোগ করার কোনো অর্থ নেই।’
উপরোক্ত কারণগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে আগামী শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের নতুন ও মানসম্মত বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছানো নিয়ে শুধু শঙ্কা নয়, অনেকটাই অসম্ভব বলে জানিয়েছে মুদ্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, আগামী শিক্ষাবর্ষের সাড়ে ৩৫ কোটি বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপার জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে মাধ্যমিক স্তরের প্রায় ২৪ কোটি ৮০ লাখ ৫৯ হাজার এবং প্রাথমিক স্তরের ১০ কোটি ২৫ লাখ বই ছাপার কাজ পরিচালনা করছে এনসিটিবি। এই ৭০০ কোটি টাকার বই ছাপা ও বিতরণ নিয়ে নানা অভিযোগ এনসিটিবির বিরুদ্ধে প্রতিবছরই ওঠে। প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তকের কারিকুলাম প্রণয়ন-সংশোধন-পরিমার্জনের জন্য বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান এনসিটিবি হলেও বিগত কয়েক বছর থেকে এনসিটিবিই হয়ে উঠেছে বই ছাপা ও বিতরণের মতো বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের নিয়ন্ত্রক-পরিচালক সংস্থা।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.