নিউজ ডেস্ক।।
পালা যেন ফুরাচ্ছেই না। আন্দোলন, সংগ্রাম, মানববন্ধন, আদালত পাড়ায় ধরনা দেয়ার পরও শিক্ষক পদে যোগদান করতে পারছেন না ৩৮ হাজার চাকরিপ্রার্থী। ২০১৮ সালের ২৮শে নভেম্বর শুরু হয় তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তির কার্যক্রম। দীর্ঘ তিন বছর পেরোলেও দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে নিয়োগ প্রক্রিয়া। বর্তমানে চলছে পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ। এই ৩৮ হাজার ২৬৮ চাকরিপ্রার্থী অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় দুর্বিষহ সময় পার করছেন। শিক্ষক নিয়োগে মন্ত্রণালয়ের দুই রকম নিয়মে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। সারা দেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’র শিক্ষকরা যোগদানের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
সারা দেশের বেসরকারি পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ৫০ হাজারের অধিক পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য ৩য় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ৩৮ হাজার ২৬৮টি পদে প্রাথমিক সুপারিশ প্রদান করেছে এনটিআরসিএ।
গত ৩০শে মার্চ গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে আবেদন নিয়ে ১৫ই জুলাই প্রার্থীদের প্রাথমিকভাবে সুপারিশ করে এনটিআরসিএ। ৫৪ হাজার ৩০৪টি শূন্যপদের বিপরীতে ৪ঠা এপ্রিল থেকে আবেদন নেয়া হয়। ১ থেকে ১২তম নিবন্ধনের রিটকারীদের জন্য দুই হাজার ২০০টি পদ সংরক্ষণ করে ৫১ হাজার শিক্ষক নিয়োগের উদ্যোগ নেয় এনটিআরসিএ। তবে ৮ হাজার ৪৪৮টি পদে কোনো আবেদন না পাওয়ায় এবং ৬ হাজার ৭৭৭টি নারী কোটা পদে প্রার্থী না থাকায় মোট ১৫ হাজার ৩২৫টি পদে বাকি রেখে ৩৮ হাজার ২৮৬ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্যে ৬ হাজার ৩ জন ‘ভি’ রোল ফরম পূরণ করে না পাঠানোয় ৩২ হাজার ২৮৩ জনের পুলিশ ভেরিফিকেশন চলমান। তবে, তিন মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও এখন পর্যন্ত পুলিশ ভেরিফিকেশনই শুরু করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তাই বর্তমানে পুলিশ ভেরিফিকেশন পর্যন্ত আটকে আছে বৃহৎ এই নিয়োগ প্রক্রিয়া।
নিয়োগ প্রত্যাশীরা জানান, প্রার্থীরা হতাশা ও অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন। একেকজন প্রার্থী একাধিক আবেদন করেছেন। প্রতিটি আবেদন বাবদ ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। কেউ কেউ ধার-দেনা করে ২০-৩০টি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করেছেন। তাদের ধার-দেনা ও ঋণ পরিশোধ করার সময়ও হয়ে গেছে। অথচ তারা এখনো চূড়ান্ত নিয়োগপ্রাপ্ত হতে পারেননি। নিয়োগ প্রত্যাশীরা মানবিক, আর্থিক ও সামাজিকভাবে প্রতিনিয়ত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। তাছাড়া অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান প্রাথমিক সুপারিশপ্রাপ্তদের যোগদানের জন্য চাপও দিচ্ছেন। অনেকেই প্রাথমিক সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় কর্মরত চাকরি ছেড়ে দিয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে আছেন।
নিয়োগ প্রত্যাশীরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের শিক্ষক নিয়োগে দ্বৈতনীতি বা বৈষম্যমূলক নীতি চলমান। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর গত ১৪ই অক্টোবর ২০২১ তারিখের প্রজ্ঞাপনের আলোকে অধিদপ্তরাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে জুনিয়র ইন্সট্রাক্টর পদে দুই শতাধিক প্রার্থীকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করে। ওই প্রার্থীদের আগাম কোনো পুলিশ ভেরিফিকেশন করা হয়নি।
তাছাড়া, ৩৮তম বিসিএস নন-ক্যাডার থেকেও অনেক প্রার্থীকে নন-টেক ইন্সট্রাক্টর পদে চূড়ান্ত নিয়োগ দিয়েছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর। এ ছাড়া ক্রাফট ইন্সট্রাক্টরসহ বিভিন্ন পদে আগাম ভেরিফিকেশন ছাড়াও অনেক নিয়োগ সম্পন্ন করেছে দপ্তরটি। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এনটিআরসিএ এর ৩য় গণবিজ্ঞপ্তির এই ৩৮ হাজার শিক্ষকের আগাম পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ করেই চূড়ান্ত নিয়োগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ। যা এসব নিয়োগ প্রত্যাশী শিক্ষকদের মাঝে যথেষ্ট ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। তাদের প্রশ্ন পুরোপুরি সরকারি নিয়োগে ভেরিফিকেশন ছাড়াই নিয়োগ হচ্ছে অথচ এসব শিক্ষকরা বেসরকারি এদেরকে ভেরিফিকেশন ছাড়া নিয়োগ দিচ্ছে না। এটা একরকম আমাদের ওপর প্রহসন। একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুই রকম নীতি কীভাবে সম্ভব?
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো দ্রুত নিয়োগ চান নিয়োগ প্রত্যাশীরা। তারা দাবি তুলে বলছেন, ভেরিফিকেশন ও নিয়োগ দুটোই একসঙ্গে চলতে তো কোনো বাধা নেই। ৩৮ হাজার শিক্ষকের ভেরিফিকেশন দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। তাছাড়া ভেরিফিকেশনের বিষয়ে তাড়াহুড়াও সম্ভব না। তাই আগে চূড়ান্ত যোগদান দিয়ে পরবর্তীতে ধীরে ধীরে নিখুঁতভাবে ভেরিফিকেশন করা হোক।
অন্যদিকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় লক্ষাধিক শূন্যপদ থাকায় প্রতিষ্ঠান খোলার পরও পাঠদানের ধারাবাহিকতা রক্ষা ও দক্ষতার সঙ্গে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়ে (গণিত, ইংরেজি, বাংলা, আইসিটি ও বিজ্ঞান) শিক্ষক না থাকায় প্রতিষ্ঠান প্রধানরাও বেশ উৎকণ্ঠায় আছেন। আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় খণ্ডকালীন শিক্ষকও নিয়োগ দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান। নিয়োগ প্রত্যাশী শিক্ষকদের পাঠদানে সহায়তা করার জন্য অনেক প্রতিষ্ঠান প্রধানও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। কিন্তু, চূড়ান্ত সুপারিশ বা যোগদানপত্র না থাকায় হবু শিক্ষকরাও এ পরিস্থিতিতে কোনো কিছুই করতে পারছেন না।
নিয়োগ প্রত্যাশী শান্ত আলী বলেন, শিক্ষক নিয়োগের স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে অনুরোধ থাকবে, ৩৮ হাজার শিক্ষককে দ্রুত যোগদান করার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করুন। যোগদান ও পুলিশ ভেরিফিকেশন একসঙ্গেই করা হোক, যদি সেটা সম্ভব হয়। বেকারদের কষ্ট লাঘব ও শিক্ষা সংকট উত্তরণে অতি দ্রুত যথাযথ কর্তৃপক্ষের সদয় দৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
এ বিষয়ে ২৭শে অক্টোবর শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনেক দিন কোনো নিয়োগ হচ্ছে না। সেটি বিবেচনায় রেখে ৫৪ হাজারের বৃহৎ নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছি। এর মধ্য থেকে ৩৮ হাজার যোগ্যপ্রার্থীকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। আমরা চাই যোগ্যতা ও নিখুঁত প্রক্রিয়ায় শিক্ষকরা এ পেশায় আসুক। তাই তাদের ভেরিফিকেশন করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। যেহেতু এটি অন্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি কাজ সেটা তাদের বিষয়। তবে আমরা তাড়াতাড়ি এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার তাগিদ দেবো। ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন পেলে দ্রুত সময়ে নিয়োগ দেয়া হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেসরকারি শিক্ষকদের পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুতই শেষ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। মুজিব শতবর্ষের মধ্যেই ভেরিফিকেশন কার্যক্রম শেষ করার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে এনটিআরসিএ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
