নিজস্ব প্রতিবেদক।।
বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর অবশেষে খুলতে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আবাসিক হলগুলো। মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখিয়ে নিজ নিজ হলে উঠতে পারবেন শিক্ষার্থীরা। ইতোমধ্যে হল খোলার সব সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খুললেও সব বর্ষের শিক্ষার্থীরা এতে আপাতত উঠতে পারছেন না। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার্থীদের হলে তোলা হবে। হল খোলার দিন (৫ অক্টোবর) সব হলে শুধু অনার্স ৪র্থ বর্ষ এবং মাস্টার্সের আবাসিক শিক্ষার্থীরা হলে উঠতে পারবেন।
জানা যায়, আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা অন্তত ‘কোভিড-১৯’-এর প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছে, তারা স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে টিকা গ্রহণের কার্ড/সনদ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈধ পরিচয়পত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে হলে উঠতে পারবেন। এরপর পরিস্থিতি পর্যালোচনা সাপেক্ষে একই শর্তে যত দ্রুত সম্ভব অন্যান্য বর্ষের শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ আবাসিক হলে উঠানো হবে।
সোমবার (৪ অক্টোবর) সরেজমিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের হলে তোলার জন্য ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যবর্ধন এবং ভবনে রং করাসহ আরো নানাবিধ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। হলের পয়েন্টে পয়েন্টে স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বেসিন বসানো হয়েছে। ক্যান্টিনকেও পরিষ্কার করে প্রস্তুত করা হয়েছে। হলের শিক্ষার্থীদের হল থেকে ফোন করে ডেকে এনে তাদের উপস্থিতিতে হলের রুমগুলোকেও পরিষ্কার করেছে হলের কর্মচারীরা।
শুধু তাই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য করোনার টিকা প্রদানের জন্য বিশেষ অস্থায়ী ক্যাম্পের উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার (৪ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শহিদ বুদ্ধিজীবী ডা. মোহাম্মদ মোর্তজা মেডিকেল সেন্টারে ক্যাম্পের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জান।
টিকাকেন্দ্র উদ্বোধনের পর উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী টিকা কার্যক্রমের আওতায় আসতে পারেননি। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের অন্য সদস্যদেরও সুরক্ষা দরকার, কারণ তারাও শিক্ষার্থীদের সংস্পর্শে আসবেন। এ কারণে সবাইকে মাথায় রেখেই আমরা চিন্তা করেছি যে ক্যাম্পাসে একটি টিকাকেন্দ্র স্থাপন করা গেলে সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে টিকা দিতে পারবেন এবং দ্রুততম সময়ে টিকা নিতে পারবেন। যত দ্রুত আমরা শতভাগ শিক্ষার্থীকে টিকার আওতায় আনতে পারব, তত দ্রুত সশরীর স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারবো।
হল খোলার প্রস্তুতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আকরাম হোসেন বলেন, আমরা হল খোলার জন্য পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুত সম্পন্ন করেছি। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় সব কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে। আগামীকাল সকালে আমরা শিক্ষার্থীদের মাস্ক ও হ্যাণ্ড স্যানিটাইজার দিয়ে বরণ করবো।
তিনি আরো বলেন, টিকা কার্ড ও হলের আইডি কার্ড দেখে শুধুমাত্র মাস্টার্স ও ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে তোলা হবে।
দীর্ঘ দেড় বছর পর হল খোলার ঘটনায় শিক্ষার্থীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করলেও রয়েছে তাদের মাঝে ক্ষোভও। তাদের এ ক্ষোভের কারণ হলো, দাবি জানানো সত্ত্বেও সেপ্টেম্বরের শেষে কিংবা ১ লা অক্টোবর হল না খোলা। ৫ অক্টোবর থেকে হল খোলায় মেসে কিংবা বাসায় থাকা শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত এক মাসের ভাড়া গুণতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হাসানুজ্জামান প্রশাসনের হল খোলার সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবারের মেধাবী সন্তান। এটা তো সবারই জানা। সেই শিক্ষার্থীরা করোনাকালীন সঙ্কটে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়েছি। আমাদের অনেকে ইতোপূর্বে টিউশনি ও পার্ট টাইম জব করে নিজে চলে পরিবারের হালও ধরেছেন। কিন্তু অনেকের আয়ের ব্যবস্থা করোনার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এরপরেও আমরা শিক্ষার্থীরা নানা টানাপোড়েনের মধ্যে পরীক্ষা শুরু হওয়ায় ঢাকায় আসতে বাধ্য হয়েছি।
তিনি আরো বলেন, আমাদেরকে মেস, হোস্টেল কিংবা বাসা ভাড়া করতে হয়েছে। তাই আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, কবে খুলবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল? কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল আগামী ৫ অক্টোবর থেকে খোলার ঘোষণা দেয়া হলেও মেস কিংবা বাসা ভাড়া করে থাকা শিক্ষার্থীদের কথা একটুও ভাবা হলো না। সেপ্টেম্বরের শেষে কিংবা ১ অক্টোবর হল খুললে আমাদের ১ মাসের ভাড়া দেয়ার প্রয়োজন হতো না। এখন মাত্র ৫ দিনের জন্য শিক্ষার্থীদের গুনতে হচ্ছে এক মাসের ভাড়া। এ যেনো মরার উপর খাড়ার ঘা।
এ শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষকদের কাছ থেকে অভিভাবকসুলভ সিদ্ধান্ত আশা করেছিলাম। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত আমাদের মর্মাহত করেছে।
পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মশিউর রহমান বিবার্তাকে বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষে হল খোলার কথা শুনেছিলাম। তাই মেস ছেড়ে দিয়েছি।পরে শুনলাম ৫ অক্টোবর হল খুলবে। খুব কষ্ট করে এ ৫ দিন থাকতে হয়েছে। কোথাও উঠলে পুরো মাসের ভাড়া দিতে হবে। পরিবারের যা অবস্থা তাতে আরেক মাসের বাসা ভাড়া চাইতে বিবেকের কাছে দংশিত হয়ে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তগুলো শিক্ষার্থীবান্ধব হওয়া উচিত ছিল বলে মনে করেন এ শিক্ষার্থী। মাহফুজুর রহমান নামের বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, দীর্ঘদিন পরে হলে উঠবো। ভালো লাগা কাজ করছে। হলের ফোন পেয়ে গিয়ে রুম পরিষ্কার করে এসেছি। এখন কালকে উঠার পালা।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫ অক্টোবর থেকে হল খোলার সিদ্ধান্ত প্রত্যাখান করে শিক্ষার্থীরা তালা ভেঙে হলেও প্রবেশ করেছে। শুক্রবার (১ অক্টোবর)অমর একুশে হলে তালা ভেঙে কক্ষে উঠে পড়েন শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যায় ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলেও কিছু শিক্ষার্থী উঠে পড়েন। হলে উঠা শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই এতদিন ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকছিলেন। ৫ অক্টোবর হল খোলা হলে এই পাঁচ দিনের জন্য তাদের পুরো মাসের বাসা ভাড়া দিতে হবে। তারা বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ না হওয়ায় নিজেরাই হলে উঠতে বাধ্য হয়েছেন।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ১৮ মার্চ থেকে এখন অবধি বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আবাসিক হলগুলো বন্ধ রয়েছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
