এইমাত্র পাওয়া

বেসরকারী শিক্ষকদের অবসর সুবিধা পেতে কেনো এতো বিড়ম্বনা

মো. আশরাফুজ্জামান শাওণ।।
আমি ভবঘুরে নই, আমি এক রাজা। নিরীহ সৈনিকের মতো ঘুরাঘুরি করে নিজেকে নাম লিখেয়েছি প্রজার খাতায়। দিগ্্বেদিক ছুটাছুটি অশান্ত মনকে শান্তনা দেয়ার শক্তি জোগায়। হাতে গড়া সম্পাদের সমাহারে আমি এক বঞ্চিত ভিখারি, এই সম্পাদ এই সমাহার আজ নতুন দিগন্তের সৃষ্টি করেছে রঙ্গিন হয়েছে বিশ্ব ধরণী। তবুও আজ ভিখারির মতো আকাশে চেয়ে থাকি নতুন ভাবে বাঁচার অনুপ্রেরণা খুঁজি। আমি বাঁচতে চেয়েছি যৌবনের গান খুঁজে হাতে হাত রেখে যেখানে শান্তি নীড় ঘুরে-ফিরে। খালি চোখে দেখিনা বইয়ের পাতা তবুও ঝাপসা আলোই যত দেখা, চশমাটা ভেঙে গেছে আজ ছয় মাস, হাতলে লাগিয়েছি সুতার লমাট। চোখের কোনায় অশ্রু এসেও হারিয়ে যায় কষ্টে খোরাক বইতে পারবে না সেই ভয়ে।
সকালে পাখি ডাকে শিশির পড়ে সূর্য ওঠে, শুধু ওঠে না মুখ থুপড়ে পড়ে থাকা আমার ফাইলের হিসাব। কত পুষ্প ভরা রাতে আমি বিদায় নিলাম এই সংঘাতে ভিক্ষার ঝুলিটা ঘাড়ে, সবাই বিদায় জানালো আবারও দেখা হবে কোন এক সন্ধা তারা রাতে। আমার সাহস নেই ফিরে দেখা আমার ফেলে আসা নীড়ে, তবুও আমার ফাইলটাতে ধুইলি কণা জমে। মাঝেমাঝে মনে হয় আমার শরীর ঢাকার পোশাক দিয়ে ওটা পরিষ্কার করি। কিন্তু আমি অক্ষম এমন অসাধ্য সাধনের ক্ষমতা আমার নেই। সারাদিন নীড় হারা পখির মতো ঘুরাঘুরি করে যখন খাবারের ডালা সাজিয়ে বসি সেই স্বাদ আর পাই না। তবুও ফাইলটাই ধুলাবালির জমে ওরা দেখে না। তাহলে কি আমি বেসরকারি শিক্ষক এটাই পরিচয়। চাকরি জীবনের শেষে এসে আমার অধিকারের জন্য লড়তে হয় ২ থেকে ৩ বছর, তাহলে জিবনের সাদ কি, আমি না খেয়ে থাকি এই বছরগুলো! আর আমারত রোগ বলতে কিছু সমান্য চিকিৎসা ভাতা। আমি দেখছি আমার মাজার বেথাটা বেড়েছে। ঠিকমতো হাঁটতে পারি না, আমি মনের কষ্টে দুঃখে চিকিৎসা করতে পারি না। জীবনের শেষ সময় এসেও বঞ্চনার শিকার। আমরা বেসরকারি শিক্ষক!
আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি আমারা দেশের জন্য কিছু করিনি কোনো সূর্য সন্তান তৈরি করিনি? যদি করে থাকি তাহলে আমাদের শেষ জীবনে শান্তির খোরাকটুকু নষ্ট করছেন কেন? একজন শিক্ষক সে সরকারি বা বেসরকারি হক না কেন তিনি একজন অধিক সম্মানিত ব্যক্তি এবং পিতার সমতুল্য। তার পরিবার চেয়ে থাকে তার দিকে। এই পিতার কাছ থেকে সমাজ শিক্ষা নেয়। তৈরি হয় সমাজের মানুষ গড়ার ভিত্তি। তার পরিবার তার সন্তান আদর্শ নীতিতে বেড়ে ওঠে। লেখার মাঝে একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল, রাহাত স্যার (ছদ্মনাম) নামের এক শিক্ষক অবসরে গেছেন অনেক দিন হলো। সময় যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা ঝিমিয়ে পড়ছে, দিনের অধিক সময় কাটান বিভিন্ন পড়াশোনা করে, মাঝে মধ্যে আকাশের দিকে চেয়ে থাকেন নীরবে, মনে হয় মেঘের খেলা দেখে একটা মুচকি হেসে পড়ায় মননিবেশ করেন। রাহাত সাহাবের বন্ধু একটা স্মার্ট ফোন কিনেছে, শখের বশে নিয়ে উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখে সেটা তার হাতে দিয়ে দেন। কিছু সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন, কি জানি মনে হয় চোখের কোনায় এক ফুটা জ্বলের আগমন ঘটেছিলো। রাহাত সাবের ছেলেটা এখন চাকরি পাইনি মেয়েটা বিয়ের বয়স হয়েছে, কপালে চিন্তার ভাজ কি করবেন। সেই কবে অবসর ভাতার জন্য আবেদন করেছেন কিন্তু কোন সুসংবাদ এখনো পেয়ে উঠা হয়নি। তার পাশের বন্ধু সরকারি চাকরি করেন, সে তার অবসারের পাওনা টুকু অনেক আগে পেয়ে গেছে। কিন্তু রাহাত সাহেবের কি অপরাধ বুঝে উঠা দায়, সংসারটা খুব টানাটানির মধ্যে পাশের মানুষগুলো এখন আর উঁকিঝুকি দেয় না। হয়ত তার সংকট ময় সময়ের কারণে। হঠাৎ একদিন রাহাত সাহেব খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন কিন্তু ভালো জায়গায় চিকিৎসা হওয়ার মতো সাধ্য তার নেই। অথচ নিজের হাতে তৈরি করেছেন কত শত সূর্য সন্তান। হাসপাতালের বেড়ে শুয়ে ভাবছেন ফাইলে হয়তো ধুলো কণা জমেছে। এই ভাবাটা ছিল তার জীবনের শেষ ভাবনা।
বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার যেসব অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর ভাতা ও কল্যাণ সুবিধার টাকা না পেয়ে বছরের পর বছর সংকটময় দিন যাপন করছে। তাদের ব্যথা সরকার আদৌ উপলব্ধি করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সূর্য সন্তান তৈরি করা কারিগরদের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারলে বাস্তবোচিত্র ও কার্যকর উদ্যোগ নিশ্চয়ই এত দিনে গৃহীত হতো। যে মানুষগুলো জাতির জন্য এত কিছু করলো এখন তাদের কষ্টে দিন যাপন করতে হচ্ছে। এটি জাতির জন্য অনেক লজ্জার।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কষ্টের কথা বিবেচনা করে করোনা মহামারীসহ শত প্রতিকূলতার মধ্যেও কল্যাণ ট্রাস্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের সঞ্চিত অর্থ হাতে তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া অতিব জরুরি।
বর্তমান সময়ে যে সব শিক্ষক অবসর গেছেন জীবনে তিনি সবচেয়ে কষ্টে পড়েছেন করোনা সংক্রমণ শুরুর পর। অনেক পরিবার করোনা আক্রান্ত হয়েছে চিকিৎসায় বেরিয়ে গেছে অনেক টাকা। নিদারুণ অর্থকষ্টে পড়েছেন তারপর। অবসর ও কল্যাণের প্রাপ্য টাকার আশায় তাই ব্যানবেইস ভবনে এসে ঘুরছেন। এমন দুর্দশায় সময় পার করছে শিক্ষকরা। অনেক শিক্ষক ভাতা পাওয়ার আগেই মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবন কাটাচ্ছেন। তবু ভাতা মিলছে না। এ জীবনে আদৌ মিলবে কি না সেটাও জানেন না তারা।
অবসর ও কল্যাণ সুবিধা বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী, এমপিওভুক্ত (বেতন বাবদ মাসে সরকারি অনুদান) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরের পর দুই ধরনের সুবিধা পান। একটি অবসর সুবিধা, আরেকটি কল্যাণ সুবিধা।
পরিমাণে অবসর সুবিধার টাকা বেশি। চাকরির নিয়মানুযায়ী বয়স ৬০ বছর অথবা চাকরির মেয়াদ ২৫ বছর পূর্ণ হলে বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীরা অবসরে যান। তবে কেউ মারা গেলে তার পরিবার নির্ধারিত পরিমাণে টাকা পায়। আবার অন্তত ১০ বছর পূর্ণ করে স্বেচ্ছায় অবসরে গেলে জমার টাকা সুদসহ পাওয়া যায়।
আগে অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জন্য মাসে মূল বেতনের যথাক্রমে ৪ ও ২ শতাংশ টাকা কেটে রাখা হতো। পরে তা বাড়িয়ে যথাক্রমে ৬ শতাংশ ও ৪ শতাংশ করা হয়। অবসর সুবিধার জন্য ৬ শতাংশ হারে টাকা কাটার পর বর্তমানে মাসে প্রায় ৬০ কোটি টাকা আদায় হয়। কিন্তু অবসর সুবিধা দিতে মাসে প্রয়োজন ৮০ কোটি টাকা। তার মানে বছরে ২৪০ কোটি টাকা ঘাটতি থাকছে। এখন আবেদনপত্র জমা দেয়া সব শিক্ষক-কর্মচারীকে অবসর সুবিধার টাকা দিতে এককালীন আরো প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা দরকার।
অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে, কল্যাণ সুবিধা খাতে বর্তমানে মাসে জমা হয় ৪০ কোটি টাকা। কিন্তু মাসে প্রয়োজন ৫০ কোটি টাকা। বছরে ঘাটতি ১২০ কোটি টাকা। সরকারে উচিত বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য পর্যপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়া। এখানে শুধুমাত্র সরকারের উপর নির্ভরশীল হলে হবে না না। নিজস্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আয়ের ধারা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন লাভজনক জায়গায় অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব অর্থের মাধ্যমে কিছু কার্য পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। যেটা মধ্যমে মাসিক আয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে ‘শিক্ষা ব্যাংক’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানো যেতে পারে। যেখানে শিক্ষকদের অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে এবং তাদের ছেলেমেয়েদের চাকরির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তাছাড়া আমেরিকায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন সুবিধা দিতে বিভিন্ন বিনিয়োগ স্কিম নেয়া হয়। এইসব অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে চালু করা যেতে পারে। যাতে ভবিষ্যতে এই আর্থিক সংকট মোকাবিলা করা যায়।
২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৬ লাখ কোটি টাকা। সেই দিক বিবেচনা করলে অবসরপ্রাপ্ত এসব বেসরকারি শিক্ষকের এই তহবিলের জোগান দেয়া মোটেও কঠিন হওয়ার কথা নয়। তাই সরকার আবেদনকারী সব শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ভাতা দ্রুত মিটিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেবে, সেটাই প্রত্যাশিত।

মো. আশরাফুজ্জামান শাওন : লেখক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.