ক্রমেই বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই শনাক্ত হচ্ছে নতুন রোগী। হাসপাতালে বাড়ছে ভিড়। এবছর আক্রান্তদের মধ্যে অর্ধেকের বেশি শিশু। করোনা মহামারির মধ্যে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ায় দুশ্চিন্তায় নগরবাসী। চলতি বছরে মৃত্যুর তালিকা ক্রমেই বাড়ছে। এডিস মশার বিস্তার রয়েছে সিটি করপোরেশনের প্রতিটি ওয়ার্ডের বিভিন্ন বাসা-বাড়ি ও পাড়া-মহল্লায়। মশার লার্ভা ধ্বংসে দুই সিটি করপোরেশনের নানা কার্যক্রম নেয়া হলেও কোনো অবস্থাতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু।
এরই মধ্যে গত দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান ও পার্শ্ববর্তী স্থানে বেড়েছে এডিসের বংশবিস্তার। দুই সিটিতে সহস্রাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ডেঙ্গুর এই সময়ে কীটনাশক প্রয়োগ করতে পারেনি সিটি করপোরেশন। এমন অবস্থায় স্কুল-কলেজ খুলে দেয়ার পর শিক্ষার্থীরাও ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদ ও বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে ডেঙ্গু রোগী আরও বাড়তে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে সিটি করপোরেশন এসব স্থানে এডিস মশানিধনে অভিযান চালাতে পারেনি। চলতি বছরে ডেঙ্গু রোগী বাড়ার কারণ হিসেবে দুই সিটি করপোরেশনের কাজে সমন্বয়হীনতাকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের কার্যকরী কোনো উদ্যোগ না থাকায় এডিস মশার বিস্তার কমছে না।
এদিকে করোনার কারণে দেড় বছরের বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। ক্লাসরুম, টয়লেট, খেলার মাঠ ও ছাদসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চারপাশে জমে থাকা পানিতে বিস্তার ঘটেছে এডিস মশার। এসব স্থান থেকেও এডিস মশা নগরীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়েছে। এরই মধ্যে আগামী ১২ই সেপ্টেম্বর থেকে খুলবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
সংশ্লিষ্টরা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও ডেঙ্গু রোগী বেড়েছে। এখনো অনেকেই আক্রান্ত হচ্ছেন। অনেক শিক্ষার্থী বাসায় থাকার কারণে ডেঙ্গুতে তেমন একটা আক্রান্ত হননি। তবে স্কুল-কলেজ খুললে সেখানে শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ দীর্ঘদিন যাবৎ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রুম, ছাদ, টয়লেট ও আশপাশ পরিষ্কার করা হয়নি। এসব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও মশার কীটনাশক প্রয়োগ না করে স্কুল খুললে শিক্ষার্থীরা ঝুঁকিতে থাকবে। এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত আগস্ট মাসে এই মৌসুমের সর্বোচ্চ সংখ্যক ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
গত মাসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ৬৯৮ জন রোগী। মৃত্যু হয়েছে ৩৪ জনের। তবে সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। চলতি মাসের প্রথম ছয়দিনে হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৮ জন। একই সময়ে ৬ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ডেঙ্গুতে কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি। তবে জুলাই থেকে সোয়া দুই মাসেই ৫২ জন মারা গেছেন ডেঙ্গুতে। সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্ট্যাডিজের (সিজিএস) চেয়ারম্যান ও কীটতত্ত্ববিদ ড. মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, এই মুহূর্তে রাজধানীর স্কুলগুলো হচ্ছে ডেঙ্গু সংক্রমণের স্থান। সেখানে মশা থাকলে বাচ্চারা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হতে পারে।
বাচ্চারা এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে পারে না। ফলে ভাইরাসবাহিত কোনো মশার কামড়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে পারে। অনেক স্কুল-কলেজ ও পার্শ্ববর্তী স্থানে পানি জমে থাকে। এতে এডিসের বিস্তার রয়েছে। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি স্কুল কলেজ কর্তৃপক্ষ ও অভিভাবকরা সচেতন হতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললে প্রথমত লার্ভিসাইডিং করতে হবে। এডাল্টিসাইটিং করতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আমাদের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। করোনাকালীন সময়েও আমরা অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লার্ভিসাইডিং ও এডাল্টিসাইটিং করেছি। এখন যেহেতু সব স্কুল-কলেজ খুলছে, এসব স্থানে নিয়মিত তদারকি করা হবে। যাতে শিক্ষার্থীদের কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত না হন। তিনি বলেন, ২০১৯ সালের আগস্টে ডেঙ্গু রোগী ছিল ৫২ হাজার। এ বছর ১০ হাজারের চাইতে কম। সিটি করপোরেশনের নিয়মিত অভিযানও কীটনাশক প্রয়োগের কারণে ডেঙ্গু কমেছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বলেছেন, ডিএনসিসি’র পক্ষ থেকে ৪৪৩টি সরকারি, বেসরকারি ও আধা-সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজের প্রত্যেকটা শ্রেণিকক্ষে ফগিং ও স্প্রে করা হবে। খেলার মাঠ ও ছাদসহ প্রতিষ্ঠানগুলোর চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ ছাড়াও টয়লেট কিংবা অন্য কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে লার্ভিসাইডিং করা হবে। এ ছাড়া আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানানো হলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতাসহ ফগিং ও লার্ভিসাইডিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সুস্থ ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য সুন্দর ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ খুবই জরুরি। তাই প্রত্যেকটি বাসাবাড়ি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা প্রয়োজন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
