এইমাত্র পাওয়া

সরকার ও বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা

মোঃআবু জাফর সেক।।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে সুনাগরিক নির্মানের কারখানা আর শিক্ষকগণ হচ্ছে সেই কারখানার কারিগর। শিক্ষা ছাড়া কোন দেশ বা জাতি উন্নতির শিখরে আরোহণ করতে পারেনি । যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। দেশটি স্বাধীনের পূর্বে বিদেশি শাসক ব্রিটিশ ও পাকিস্তান দ্ধারা বহু বছর নিয়ন্ত্রিত ছিল। যে কারণে জাতি শিক্ষা-দীক্ষায় মোটেই উন্নতি করতে পারেনি । শাসক গোষ্ঠীরা মনে করতো বাঙালী জাতি শিক্ষায় উন্নতি করতে পারলে তারা এক সময় আমাদেরকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে। তাই তারা শিক্ষাকে পঙ্গু করে রাখার জন্য বাংলায় তেমন কোন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে নি।

শাসক গোষ্ঠীদের একদিকে যেমন দেশীয় সম্পদ লুটপাট ও অন্যদিকে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ কোনভাবেই থেমে থাকলো না। তাই বাঙ্গালী জাতি আর পরনির্ভরশীল হয়ে থাকতে চায় নি। তৎকালীন পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাঙ্গালী জাতি অসীম ধৈর্য্যে এবং সহিষ্ণুতার সাথে মোকাবিলা করে জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও মুক্তি যুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং লক্ষ লক্ষ লোকের প্রাণহানির মধ্যে দিয়ে ১৯৭১ সালে ১৬ ই ডিসেম্বর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র “বাংলাদেশ “হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে ঠাঁই করে নেয়।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত স্বাধীন বাংলাদেশ নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত ছিল। তারপরেও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও সরকার প্রধান বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গ বন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে প্রথমে কৃষি ও শিক্ষা কে অগ্রাধিকার স্বরূপ দৃঢ়চিত্তে ব্যক্ত করে হাল ধরেছিলেন। বাঙ্গালী জাতির জনক বুঝতে পেরেছিলেন বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার উন্নয়নের কোন বিকল্প নেই। তাই তিনি শিক্ষার ভিত শক্ত করার লক্ষ্যে দ্রুত সময়ে প্রথমেই প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করেছিলেন। ঘাতকরা বঙ্গ বন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা করলে সকল স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণের পথ রহিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করার সুযোগ পেলেও বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ বিষয় নিয়ে চিন্তা করে নি।

বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা এবং উচ্চ শিক্ষা এই তিন স্তর বিশিষ্ট শিক্ষা। এর সমমানে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা দেশে বিদ্যমান।
দেশে প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে তিন ভাগ সরকারিকরণ। আর বাকি ৯৭ভাগ বেসরকারি ও প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ ও আর্থিক সুবিধার কারণে শিক্ষার্থীদের ভর্তির প্রতিযোগিতা বেশী থাকে। যে কারণে অসহায়, দরিদ্র ও সাধারণ জনগোষ্ঠীর সন্তানদের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করার সুযোগ হয় না। সেখানে পড়াশোনা করে দেশের বিত্তশালী, বড় বড় ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তা, আমলা, রাজনীতিবিদ ও বিশিষ্ট জনের সন্তানেরা। ফলে সাধারণ জনগোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক সুবিধা না পাওয়ার কারণে শিক্ষা লাভ থেকে বঞ্চিত হয়।
দেশে আশি ভাগ জনগোষ্ঠী বাস করে গ্রামে। সেখানে দারিদ্র শ্রেণি জনসংখ্যাই বেশি। স্বাধীনতার পরবর্তী ৫০ বছরে সরকারি প্রাইমারি স্কুল ছাড়া মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে গ্রাম অঞ্চলে তেমন প্রতিষ্ঠিত হয় নি।

যে কারণে তারা বেসরকারি ও প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়তে বাধ্য হয়। এতে সিংহভাগ সাধারণ শ্রেণির সন্তানেরা পড়ার সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত থাকে। উচ্চ শিক্ষা লাভের আশা নিয়ে যখন সরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না হয় তখন গরীব সাধারণ মেধাবী শিক্ষার্থীরা অর্থের অভাবে বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ে পড়া থেকে বঞ্চিত হয়।

এদিকে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা উপকরণ, ব্যবহারিক সরঞ্জামাদি, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, খেলাধুলার সামগ্রী ইত্যাদি পর্যাপ্ত পরিমাণ না থাকায় মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ গড়ে উঠছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরাই হচ্ছে মূল চালিকাশক্তি। তাদেরকে বিষয় ভিক্তিক উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার না করতে পারলে বাস্তবসম্মত পাঠদানের সুফল থেকে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হতেই থাকবে।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়া সবচেয়ে অবহেলিত। বর্তমান সরকার বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় NTRCA এর মাধ্যমে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করায় মেধাবীদের শিক্ষাগত পেশায় আসার সুযোগ হয়েছে। তাদের কর্মক্ষেত্র দেশের বিভিন্ন জেলায় হওয়ায় সরকারি চাকুরেদের মত উৎসব ভাতা, বাড়ি ভাড়া ও মেডিকেল ভাতা প্রদান করা জুরুরি। প্রধান শিক্ষক, সহ প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ, সুপার তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সহ বিভিন্ন পদের নিয়োগও NTRCA এর মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মানে একটি নিদিষ্ট সীমানা ও নিদিষ্ট জনগোষ্ঠীর উপর নির্মাণ আইন থাকলেও তা উপেক্ষা করে থেমে থাকছে না বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ। শিক্ষার্থী ভর্তি আইন থাকলেও তা অমান্য করে শ্রেণি শাখা অনুমোদন ছাড়াই অতিরিক্ত ছাত্র ভর্তি করে সারাদেশে অনেক প্রতিষ্ঠান করছে শিক্ষা বাণিজ্য। শিফট খোলা আইন থাকলেও তা মানছে না অনেক বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এদিকে বিভাগীয় শহরে খ্যাতিমান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলো স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানের নামে শাখা প্রশাখা খুলে বাণিজ্য করার জন্য শিক্ষাকে ব্যবহার করছে।

সরকার বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সরকারি নিয়ম বিধির উপর প্রাতিষ্ঠানিক কাজের সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়ন করার জন্য ম্যানেজিং /গভর্নিং বোর্ডকে সর্বাধিক ক্ষমতা প্রদান করেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় শিক্ষক ও কমিটির মধ্যে একটু সমন্বয়হীনতার ঘাটতি হলে তাদের মধ্যে অনেক দূরত্ব বেড়ে যায়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক কাজকর্ম ও সিদ্ধান্ত নিতে প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনেকটাই বাধাগ্রস্ত হতে হয়। সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা, শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষানুরাগী মনোভব, প্রাতিষ্ঠানিক পরিকল্পনার দিক গুলো তুলে ধরা, সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তা বাস্তবায়ন করার দক্ষতা ইত্যাদি থাকার জন্য বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ও অন্যান্য সদস্যদের নিদিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতার মাপকাঠি সীমাবদ্ধ রাখা অতীব জরুরি।
বর্তমান সরকার কোচিং বানিজ্য বন্ধে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তা কোন ভাবেই রোধ করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীক বিষয় ভিক্তিক শিক্ষক দ্ধারা উৎসাহী দূর্বল শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ ক্লাস ও বাইরে প্রতিষ্ঠানের ১০ জন শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশেষ কোচিং আইন চালু করায় তারই সুযোগ নিয়ে একশ্রেণী শিক্ষকগণ ব্যাপকভাবে কোচিং বানিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চলাকালীন সময়ে সারাদেশে কোচিং সেন্টার গুলো খুলে কোচিং কার্যক্রম চালু রাখার কারণে মূল শিক্ষা কেন্দ্রীক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ হ্রাস পেতে থাকে।

বাংলাদেশ বিশ্বের একটি অন্যতম জনবহুল দেশ। এই জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রুপান্তরিত করার একমাত্র মাধ্যম শিক্ষা। কিন্তু বরাবর দেখা যায় সব সরকারই শিক্ষা খাতে বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিতে কেন যেন অনীহা প্রকাশ করে? যে জাতি শিক্ষা লাভের জন্য শিক্ষা সামগ্রী ও প্রাতিষ্ঠানিক বেতন ও ফি দিয়ে পড়তে হয় তার চেয়ে হতভাগা জাতি আর হতে পারে না।

শিক্ষা হচ্ছে জ্ঞান অর্জনের কারখানা। সেখানে বেসরকারি শিক্ষকদের সরকার কর্তৃক ১০০০টাকা বাড়ি ভাড়া, ৫০০টাকা চিকিৎসা ভাতা ও ২৫% উৎসব ভাতা প্রদান করে বেসরকারি শিক্ষকদের একদিকে যেমন পদমর্যাদাতে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হচ্ছে অপরদিকে তাদের জীবনধারণ হয়ে পড়েছে দুরূহ।
এদিকে বেসরকারি শিক্ষক কর্মচারী চাকুরী জীবনে কর্ম শেষ করে অবসর গ্রহণ করলে এককালীন কিছু কল্যাণ ও অবসর সুবিধা ভাতা পেয়ে থাকেন। যদিও উক্ত সুবিধা ভাতা প্রাপ্তি টাকা শিক্ষক-কর্মচারীর মূল বেতন থেকে নিয়মিত মাসিক ১০% হিসেবে সরকার কেটে নেয়। অবসর গ্রহণের ৫/৬ বছরেও উক্ত টাকা না পাওয়ার কারণে তাদের জীবনধারণের জন্য কঠিন হওয়ায় অনেকে এ সময়ের মধ্যে মৃত্যুবরণ করে।
দেশে সরকার কর্তৃক একই সিলেবাস, একই কারিকুলাম, একই পরীক্ষা পদ্ধতি, একই কর্মকাল, পাঠদান পদ্ধতি সহ শিক্ষা আইনে সব কিছু একই নিয়মে পরিচালিত হলেও সরকারের আর্থিক সুবিধা থেকে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে বঞ্চিত হতেই চলেছে বেসরকারি শিক্ষকরা।

তাই তাদের সম্মানজনক আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করে সৃজনশীল, দায়িত্বশীল এবং দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত মেধাবীদের এই পেশায় আকৃষ্ট করার জন্য এখনিই সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উপরোক্ত বিষয়াদি সহ আরো অন্যান্য সমস্যাবলী নিরসন করে শিক্ষা বৈষম্য দূর করে এই মহান পেশায় দায়িত্বে নিয়োজিত শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।
বর্তমান সরকার দেশ গড়ার লক্ষে সুদূর প্রসারী পরিকল্পনায় ২০২১ সালে উন্নয়নশীল এবং ২০৪১ সালে উন্নত রাষ্ট্র নির্মানে স্বপ্ন নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । তারই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে বাংলাদেশ কে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে রূপান্তরিত করতে সক্ষমতা অর্জন করেছে। সরকারের উন্নত রাষ্ট্র ভিশন ২০৪১ সাল লকক্ষে সীমান্তে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণে বেসরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করণ করা এখনিই উপযুক্ত সময়।

লেখক-
প্রধান শিক্ষক
আনছার উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়
অম্বিকাপুর, ফরিদপুর সদর,ফরিদপুর।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.