এইমাত্র পাওয়া

ডিজিটাল শিক্ষা ও রোবোটিক্সের পথে

মোস্তাফা জব্বার ।। 

বিদেশের কোন মেলায় বাংলাদেশের স্টল দেখার অতীত অভিজ্ঞতা আমার খুব ভাল নয়। ২০০৩ সালে আমি জার্মানির সিবিটে গিয়েছিলাম কম্পিউটার মেলা দেখতে। তখনকার দিনে তথ্যপ্রযুক্তি মানেই কেবল কম্পিউটারের কথা ভাবা হতো। এর এক পাশে থাকত হার্ডওয়্যার এবং অন্য পাশে থাকত সফটওয়্যার। আমাদের নিজেদের কোন হার্ডওয়্যার ছিল না। তাই আমরা সফটওয়্যার, সেবা এবং আউটসোর্সিং নিয়ে হাজির হতাম। সিবিট ও কমডেক্স আমাদের নিজেদের উপস্থিতি উপস্থাপনের ক্ষেত্র ছিল। কিন্তু আমার দেখা সিবিটের অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিল না। টয়লেটের পাশে এক কোণে থাকা পুরো স্টল ছিল খালি। কদাচিৎ কোন দর্শক আসত। জাপানে কিন্তু ভিন্ন চিত্র দেখলাম। সবকটি বুথে কেবল বাংলাদেশীদের উপস্থিতি নয়, প্রচুর জাপানীর ভিড় ছিল। কেউ কেউ জাপানীদের সঙ্গে কথা বলার জন্য দোভাষীও নিয়োগ করেন। এতে বোঝা যায় যে, আমাদের পেশাদারিত্ব বেড়েছে। ১৯ সালে আমি যেতে পারিনি। শুনেছি এবার সেই পেশাদারিত্ব আরও উন্নত হয়েছে।

১০ এপ্রিল ১৮ বিকাল ৩.৩০টায় জাপান আইটি সপ্তাহ ২০১৮-এর মূল ভেন্যু টোকিও বিগ সাইটে অনুষ্ঠিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ বিষয়ক উন্মুক্ত সেমিনারে অংশ নিয়ে দেশের আইটি সেক্টরের বিদ্যমান অবস্থা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং এর বিপুল সম্ভাবনা, হাইটেক পার্ক স্থাপন, ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প : ২০২১ এবং জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক নিয়ে বক্তব্য প্রদান করি। ডিজিটাল বাংলাদেশ সেমিনারে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। তবে মজার বিষয় ছিল সেমিনারটি শেষ হয়েও শেষ হয়নি। সেমিনারের পর আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মুখোমুখি হতে হয় বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর। বাংলাদেশ নিয়ে তাদের নানা প্রশ্ন। হলি আর্টিজানের প্রসঙ্গসহ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পর্যন্ত আমাদের আলোচ্যসূচীতে থাকে। আমি এদের কারও কারও সঙ্গে জাপানের সোসাইটি ৫.০ নিয়েও আলোচনা করলাম। আমরা যে তাদের ভাবনা-চিন্তা সম্পর্কে এতটা খবর রাখি সেটি তাদের অবাক করে দেয়।

সেদিনই সন্ধ্যা ছয়টায় টোকিওর হোটেল হিলটনে LICT Project কর্তৃক আয়োজিত Presentation of Bangladessh Proposition শীর্ষক আলোচনায় আমাকে কথা বলতে হয় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে। আমি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেই যে, বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির দৃশ্যমান পরিবর্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাধ্যমে হয়েছে। কেবল দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলোই নয়, ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তিতে এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য সরকার দ্রুত কাজ করে যাচ্ছে বলে আমি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেই। একই ভেন্যুতে রাত ৯টায় Qualcomm-এর সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক সভায় তথ্যপ্রযুক্তি উৎপাদন এবং বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা করা হয়। কোয়ালকম বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করে।

১১ মে ২০১৮ তারিখ বেলা ১১টায় আমরা জাপানের জাইকা সদর দফতর পরিদর্শন করি। এ সময় জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। জাইকা বাংলাদেশের উন্নয়নে ব্যাপক আগ্রহ প্রকাশ করে। বিশেষ করে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মানুষের জাপানে কর্মসংস্থানের উপযোগী করার ক্ষেত্রে জাইকা ব্যাপক সহায়তার আশ্বাস প্রদান করে। ওইদিনই বেলা ১টায় জাপানের অন্যতম মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি রিক্রুট টেকনোলজিসের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়। তাদের আমরা আশ্বস্ত করি যে, বাংলাদেশ থেকে মানবসম্পদ আহরণে তাদের সকল প্রকার সহায়তা প্রদান করা হবে। আমাকে জানানো হয় যে, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের সফ্টওয়্যার খাতের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়াও জাপানে কাজ করার ক্ষেত্রে জাপানীজ ভাষা জ্ঞান ও সংস্কৃতি জানা আবশ্যক হওয়ায় বাংলাদেশে ৬৪টি জেলায় আইসিটি ল্যাংগুয়েজ ল্যাবে জাপানী ভাষা শিক্ষার কোর্স চালু করা হয়েছে এবং বাংলাদেশের তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে জাপানীজদের জন্য স্পেশাল কোন কাজ করারও সুযোগ রয়েছে। রিক্রুট কর্তৃপক্ষ মন্ত্রী পর্যায়ের কেউ তাদের সঙ্গে বৈঠক করায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

প্রোগ্রামিং ও রোবোটিক্স স্কুল : জাপান ভ্রমণের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব ছিল ১১ মে ২০১৮ তারিখ বিকাল ৫টায় Venturas Robotic School পরিদর্শন করা। পথে যেতে যেতে মনে হলো আমরা মূল শহর ছেড়ে শহরতলীতে একটা গলির ভেতরে প্রবেশ করেছি। কিন্তু যখন পাড়াটায় পৌঁছে গেলাম তখন মনটা ভরে গেল। অসাধারণ এক দৃশ্য দেখে আমি ও বিজয় দুজনেই স্তম্ভিত। আমার জন্য যাই হোক বিজয়ের জন্য সেই মুহূর্তটি ছিল অবিস্মরণীয়। জাপানী শিশুরা বিজয় (এবং তার বাবাকে) স্বাগত জানাতে রাস্তায় দাঁড়াবে এটি ভাবাই কেমন সুখময় অনুভূতির জন্ম দেয়। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠে ক্লাসরুম দেখে আমরা অবাক। হাতেগানা কয়েকটি শিশু এবং তাদের সামাল দেয়ার জন্য কিছু শিক্ষক ছোট একটি কামরাকে আলোকিত করে রেখেছে। ওদের সবার সামনে প্লাস্টিকের রোবোটিক্স কিট। রুবিকিউব খেলার মতো, বিল্ডিং ব্লক ব্যবহার করে তারা ইচ্ছেমতো যা খুশি বানাচ্ছে। শিশুরা তো দূরের কথা, শিক্ষকদেরও মাত্র একজন ইংরেজী জানেন। বিজয় তার সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করল। আমি দূর থেকে অনুভব করলাম বিষয়টির প্রতি বিজয়ের আগ্রহের পরিমাণ বাড়ছে। তারা জানাল যে, মাত্র দু’তিনটি বাড়ির পরেই ওদের আরও একটা স্কুল আছে। স্কুলটাতে এখন ছাত্র-ছাত্রী নেই। তবে পরিবেশটা দেখা যেতে পারে। আমরা আগ্রহ প্রকাশ করলাম ও আবারও সিঁড়ি বেয়ে স্কুল রুম দুটিতে শিশুদের প্রোগ্রামিং এবং রোবোটিক্স শেখার সরঞ্জামাদি দেখে বিস্মিত হলাম। ১৯ সালে এসে রোবোটিক্স স্কুল দেখার সেই আনন্দটা আরও বহুগুণ বেড়ে গেছে। কারণ জাপানের সেই স্কুলটির একটি শাখা এখন ঢাকায় আছে। এর সঙ্গে আমার ছেলে বিজয় জব্বারও যুক্ত।

টোকিও টাওয়ার, টোকিও বে সেতু ও বুলেট ট্রেন : জাপান সফরকালে আমরা সদলবলে বেশ কয়েকটি দর্শনীয় স্থান দেখি। টোকিও টাওয়ার এর মাঝে অন্যতম। টোকিওর প্রাণকেন্দ্রে চমৎকার একটি অবস্থানে স্থাপিত টাওয়ারটির প্রতি প্রধান আকর্ষণ বস্তুত ছাত্র-ছাত্রীদের। এর নিচতলায় স্মারক পণ্যের দোকান রয়েছে। তবে টোকিও শহর দেখার জন্য চলে যেতে হয় একেবারে ওপরের তলায়। শীর্ষ চূড়ার তলাটি চারদিক থেকে ঘুরে দেখা যায়। ওখানেই আমাদের সঙ্গে দেখা হয় জুলেখা নামের একটি মেয়ের, যার বাবা বাঙালী ও মা জাপানী। চেহারায় বাঙালিত্বের ছাপ নিয়ে মেয়েটি আমাদের দেখে এমন ভাব প্রকাশ করল যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেয়েছে। আমাদের পুরো টিমের সঙ্গেই জুলেখা কথা বলল। জাপান আইটি উইকের স্বল্পকালীন সফরের মাঝেই আমাদের দুটি ভ্রমণ অভিজ্ঞতার কথা মনে রাখতে হবে। টোকি বে পাড়ি দেয়ার জন্য যে অসাধারণ সেতুটি রয়েছে তা না দেখলে জাপান সফরের অভিজ্ঞতাই অপূর্ণ থেকে যায়। আমরা কেবল সেটি দিখিনি, মাঝপথের বিনোদন দ্বীপটিতে আহারাদিও করেছি এবং অনেকটা সময় কাটিয়েছি। আমাদের টিমের একটি ইচ্ছাও ছিল জাপানের বুলেট ট্রেনে চড়ে এর আমেজটা অনুভব করার। সেই কাজটিও আমরা করেছি। এক স্টেশন থেকে ওঠে অন্য স্টেশনে নেমে বুলেট ট্রেনে চড়ার মজাটাও অনুভব করে এলাম।

জাপান-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব ও রাধা বিনোদ পাল : সবাই জানেন স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কাল থেকে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অসাধারণ বন্ধুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক আছে। আমি এর ঐতিহাসিক কারণ জানতাম না। তবুও হলি আর্টিজানের ঘটনায় দুই নারীসহ ৯ জন জাপানী নিহত হয়েছিলেন বিধায় অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। এদের মধ্যে ৬ জনই ছিলেন মেট্রোরেল প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সদস্য। জাপান আইটি উইকে গিয়ে হলি আর্টিজান নিয়ে জাপানীদের হতাশার কথাও অনুভব করেছিলাম। নরম স্বভাবের জাপানীদের দেখে এখন ভাবা কঠিন যে, ওরাও এক সময় হত্যা-ধ্বংস-অত্যাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ওদের পরিবর্তন অনেকটাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সময়ে। সেই সূত্র ধরেই ভাবনা ছিল বাঙালীদের সঙ্গে তাদের গভীর বন্ধুত্ব কেমন করে দিনে দিনে গাঢ়তর হলো। এমনকি হলি আর্টিজানের পরও আমরা জাপানে আন্তরিকতার সঙ্গে সংবর্ধিত হয়েছি। ডিজিটাল যুগে গুগলের সহায়তায় ইতিহাস খুঁজে পাওয়াটা মোটেই কঠিন নয়। কেউ গুগলে ‘রাধা বিনোদ পাল’ অনুসন্ধান করলেই লিঙ্ক পাবেন। কেবল এই লিঙ্কটিই নয়, পাবেন অনেক লিঙ্ক এবং রাধা বিনোদ পালের অনেক ছবি। জাপানের বাংলাদেশকে এরূপ ভালবাসার পিছনে রয়েছে রাধা বিনোদ পালের অসাধারণ ইতিহাস। ঐতিহাসিকভাবে জাপান নানা সময় যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত ছিল। ফলে তারা নিজেরা মরেছে, অন্যদেরকেও মেরেছে। ওরা ১৯৩৭ সালে নানকিং (এখন নানজিং)-এ চাইনিজদের কচুকাটা করেছিল। খুন, ধর্ষণ মিলিয়ে এমন নৃশংসতা কমই দেখেছে বিশ্ব। শেষতক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জব্দ জাপান বাধ্য হয়ে রক্তের নেশা ছেড়ে জাতি গঠনে মনোযোগ দিয়েছিল বলেই আজ তারা পৃথিবীর অন্যতম সভ্য জাতিতে পরিণত হতে পেরেছে। এই জাতি গঠনের পিছনে জাপানীরা চিরকৃতজ্ঞ কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া একজন বাঙালীর কাছে। মিত্রপক্ষের চাপ সত্ত্বেও ইন্টারন্যাশনাল যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের ‘টোকিও ট্রায়াল’ ফেজে এই বাঙালী বিচারকের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই জাপান অনেক কম ক্ষতিপূরণের মধ্য দিয়ে বেঁচে গিয়েছিল। নয় তো যে ক্ষতিপূরণের বোঝা মিত্রপক্ষ ও অন্য বিচারকরা চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তার দায় এখন পর্যন্ত টানতে হতো জাপানকে। সেক্ষেত্রে ঋণের বোঝা টানতে টানতে জাতি গঠনের সুযোগই আর পাওয়া হতো না জাপানের। সেই সময়ই জাপানী সম্রাট হিরোহিতো কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, ‘যতদিন জাপান থাকবে বাঙালী খাদ্যাভাবে, অর্থকষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালীর চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু’। এটি যে শুধু কথার কথা ছিল না তার প্রমাণ আমরা এখন দেখতে পাই। জাপান এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নিঃস্বার্থ বন্ধু। জাপান তখনও পাশে ছিল, বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় জন্ম নেয়া সেই বাঙালী বিচারকের নাম এখনও জাপানী পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্য। তার নামে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু মেমোরিয়াল ও মনুমেন্ট। এই বিস্মৃত বাঙালীর নাম বিচারপতি রাধা বিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ছাড়াও জীবদ্দশায় অনেক বড় বড় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে তিনি কুষ্টিয়ায় নিজ গ্রামের স্কুল ও রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে প্রভাষক ছিলেন। কিছুদিন ময়মনসিংহ কোর্টে আইন ব্যবসাও করেছিলেন। রাধা বিনোদ পাল ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য খুলে দেয়া এক জানালার নাম। এই মেধাবী বাঙালীকে আমরা প্রায় কেউই মনে রাখিনি। বাঙালীর মেধাগত বীরত্বের এই চমৎকার অধ্যায়টা জানে খুব অল্প মানুষ। তবে জাপানীরা এখনও তাকে প্রদান করে অসাধারণ সম্মান।

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান-সাংবাদিক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যায়ের জনক


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.