সেনাবাহিনীতে ভর্তি: প্রতারক হতে সাবধান

কর্নেল সৈয়দ মো. রফিকুল ইসলাম।।

সেনাবাহিনী তথা সশস্ত্র বাহিনীতে সৈনিক পদে ভর্তির প্রক্রিয়াকে রিক্রুটিং বলা হয়। একসময় সৈনিক পদে ভর্তির জন্য নির্দিষ্ট দিনে বিভিন্ন জেলা স্টেডিয়ামে রিক্রুটিং কার্যক্রম পরিচালিত হতো। এই প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের মধ্য হতে সীমিতসংখ্যক আসনের জন্য প্রার্থী নির্বাচন করা ছিল অত্যন্ত দুরূহ। তাছাড়া এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে দালাল চক্রও সক্রিয় হয়ে ওঠে। সাধারণ প্রার্থীদের দালাল চক্রের প্রতারণার ফাঁদ থেকে রক্ষা ও এই চক্রকে প্রতিহত করতে এবং নিয়োগপ্রক্রিয়া সহজীকরণের লক্ষ্যে স্টেডিয়ামে পরিচালিত ভর্তি কার্যক্রম পরিবর্তন করে বিভিন্ন সেনানিবাসে ‘ব্রাঞ্চ রিক্রুটিং ইউনিট’ গঠন করা হয়।

প্রার্থীদের কাছ থেকে অনলাইনে প্রাপ্ত আবেদনপত্র যাচাই-বাছাই করে নির্ধারিত তারিখে সেনানিবাসের অভ্যন্তরে ভর্তি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এতে করে দালাল চক্রের অপতৎপরতা ও প্রতারণা থেকে সাধারণ প্রার্থীরা অনেকটাই রেহাই পেয়েছে। তবে এই প্রতারক চক্রের অপতৎপরতা সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়নি। সাধারণ মানুষ নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অর্থ লেনদেনকে আবশ্যিক ও স্বাভাবিক মনে করে বিধায় সেনাবাহিনীর স্বচ্ছ নিয়োগকেও অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না। তাই সাধারণ মানুষ এবং ভর্তি ইচ্ছুক প্রার্থীদের এ বিষয়ে সচেতন করতে সেনাবাহিনী প্রতিনিয়ত বিভিন্নভাবে সচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে।

প্রতারক চক্র সাধারণত প্রার্থীর সঙ্গে কিংবা তার অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অনলাইনে আবেদনের জন্য প্রার্থীকে সব রকম সহযোগিতা করে এবং দ্রুত মোবাইলে এসএমএস প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি দেয়। তারা নিজেদেরকে সেনাবাহিনীর রিক্রুটিং কাজে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের একান্ত পরিচিত, তাদের কেউ কেউ রাজনীতিবিদ/বেসামরিক বা সামরিক কর্মকর্তাদের আত্মীয়, কাছের বড় ভাই ইত্যাদি ভুয়া পরিচয় দেয়। নিজেদের সঙ্গে ওপরমহলের যোগাযোগ এবং চাকরি প্রদানের ক্ষমতা আছে বলে প্রার্থীদের বিভিন্ন প্রলোভন দেখায়।

প্রতারকরা বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের অজান্তে তাদের নাম উল্লেখ করে এবং ‘তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, কোনো সমস্যা হবে না, তারাই ডেকে নেবে, রিক্রুটিং মেডিক্যাল অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে’ ইত্যাদি মিথ্যা কথার ছলে প্রার্থীদের উদ্বুদ্ধ করে, আশ্বস্ত করে এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়। কারো কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর চাকরি না হলে টাকা ফেরতের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং ক্ষেত্রবিশেষে টাকা ফেরত দিয়ে অন্যদের নিকট আস্থা অর্জন করে।

অনেক সময় গৃহীত অর্থের নিশ্চয়তার জন্য সাদা স্ট্যাম্প বা কাগজে স্বাক্ষর করে। তাছাড়া প্রার্থীর চাকরি হলে কত টাকা প্রদান করতে হবে এই মর্মে সরকারি স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা নেয়, এমনকি ব্ল্যাংক চেক গ্রহণের মাধ্যমেও প্রতারণা করে। আস্থা অর্জনের জন্য অনেক সময় চিকিত্সকের মাধ্যমে তাদের শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন করে ভুয়া মেডিক্যাল যোগ্যতা সনদপত্র প্রদান করে। তাছাড়া অন্যান্য ভুয়া সনদপত্র, যেমন—মুক্তিযোদ্ধার সন্তান/নাতি/নাতনি, সেনাসন্তান, ড্রাইভার, খেলোয়াড় ইত্যাদি তৈরি করে প্রার্থীদের আস্থা অর্জন করে। কখনো কখনো দালাল-প্রতারকরা প্রার্থীকে প্রভাবিত করতে নিজেরা পরীক্ষার দিন পরীক্ষার কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। কোনো প্রার্থী নির্বাচিত হলে প্রতারক চক্র নানাভাবে তাদের কৃতিত্ব ও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের চেষ্টা করে এবং অর্থ দাবি করে।

অনেক সময় প্রার্থীদের কাছ থেকে শিক্ষাগত যোগ্যতার মূল সনদপত্র, মার্কশিট, প্রবেশপত্র ইত্যাদি নিজের কাছে নিয়ে নেয় এবং প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পর ঐ সকল কাগজপত্র জিম্মি করে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়। প্রতারক চক্র অনেক ক্ষেত্রে নির্বাচিত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভুয়া কেস দেখিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশনে সমস্যা সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থ আদায় করে। তাছাড়া এরা লিখিত পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্ন ও উত্তরপত্র প্রদানের মাধ্যমেও প্রতারণা করে থাকে।

সেনাবাহিনীতে ভর্তি ইচ্ছুক প্রার্থীদের প্রাথমিক ও চূড়ান্ত ডাক্তারি পরীক্ষায় যোগ্যতা অর্জনসাপেক্ষে, শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় প্রতিযোগিতাপূর্ণ ফলাফল অর্জন, বোর্ড পরীক্ষায় অর্জিত জিপিএ এবং মেধার ভিত্তিতে শূন্য আসনের বিপরীতে নির্বাচিত হয়ে থাকেন। এখানে টাকা-ঘুষ লেনদেনের কোনো সুযোগ নেই; নিজ যোগ্যতাই নির্বাচনের একমাত্র উপায়।

তবে যদি কোনো নির্বাচিত প্রার্থী প্রতারককে টাকা দিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি হয়তো মনে করেন, এটা বোধহয় টাকার বিনিময়ই সম্ভব হয়েছে। অথচ সেনাবাহিনীর নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ টাকা লেনদেনের বিষয়ে অবগত নয়। দালাল চক্রকে টাকা দিয়ে ঐ প্রার্থী কিংবা তার পরিবারটি কিন্তু সেনাবাহিনীর নিয়োগকে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। তাই প্রার্থী-অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, দালাল-প্রতারক চক্রের ফাঁদে পা বাড়াবেন না।

মনে রাখবেন, প্রতারক চক্র আপনাকে ফাঁদে ফেলার জন্য অপেক্ষা করছে, তাদের চটকদার কথায় প্রলুব্ধ হবেন না, বিশ্বাস করবেন না। বরং দালাল চক্রকে চিহ্নিত করে সেনাবাহিনী তথা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করুন; তাদের ধরিয়ে দিয়ে পুরস্কৃত হোন।

যে কোনো সন্দেহ দূরীকরণের জন্য নিকটস্থ রিক্রুটিং ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করুন। সেনাবাহিনী কর্তৃক দেওয়া প্রচারপত্র ভালোভাবে পড়ুন এবং নির্দেশাবলি অনুসরণ করুন।

এখানে উল্লেখ্য, রিক্রুটিং বা নিয়োগ কার্যক্রমের সঙ্গে সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য নিয়োজিত থাকেন তাদের কেউ যদি কোনোভাবে নিয়োগের স্বচ্ছতা ভঙ্গ করে কিংবা অনৈতিক পথ অবলম্বন করে, তাহলে তিনি দ্রুত চিহ্নিত এবং এই ধরনের অপরাধে কেউ জড়িত প্রমাণিত হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিস্বরূপ চাকরিচ্যুতসহ জেল ও জরিমানা হয়।

লেখক: কর্নেল অ্যাডমিন, এএসসি সেন্টার অ্যান্ড স্কুল


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.