নিজস্ব প্রতিবেদক।।
রাজধানীর মিরপুর কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নিয়োগ পান মো. গোলাম ওয়াদুদ। ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্বে এলেও একক কর্তৃত্ব কায়েমে সময় নেননি তিনি। অভিযোগ উঠেছে, কলেজের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে ব্যক্তিস্বার্থে তিনি অনিয়ম করেননি; এমনকি কাল্পনিক খরচের খাতও তৈরি করেছেন।
অধ্যক্ষ ওয়াদুদের বিষয়ে গত ৫ মে প্রধানমন্ত্রী বরাবর দেওয়া একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, অবৈধভাবে নিয়োগের পর থেকে তিনি কলেজ পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। আর্থিক, উন্নয়ন, ক্রয়, শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষাসহ কলেজের এমন কোনো খাত নেই, যেখানে তাঁর দুর্নীতির হাত লাগেনি। চিঠিতে আরো বলা হয়, অধ্যক্ষের সীমাহীন দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অযোগ্যতার কারণে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি রুগণ ও অচল হয়ে পড়েছে। উচ্চ মাধ্যমিকের ফল খারাপ হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওয়াদুদ বাস করেন জনতা হাউজিং মিরপুর-১- এর অরণী গার্ডেনের একটি ফ্ল্যাটে। মিরপুর কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এই ফ্ল্যাটের জন্য সংশ্লিষ্ট আবাসন কম্পানিকে কলেজ তহবিল থেকে তিনি পরিশোধ করেন ১৮ লাখ টাকা। তাঁর আরো দুটি ফ্ল্যাটের সন্ধান মিলেছে। তিনি মিরপুর সেকশন-৯-এর স্বপ্ননগর আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাট কেনেন ৭০ লাখ টাকায়। মিরপুর-২ নম্বরে একে উদয়ন হাউজিংয়ে তিনি আরেকটি ফ্ল্যাট কিনেছেন এক কোটি ৪৩ লাখ টাকায়। ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর এই ফ্ল্যাটের মূল্য বাবদ একে বিল্ডার্সকে নগদ ২৫ লাখ টাকা দেন ওয়াদুদ। ২৭ ডিসেম্বর দেন আরো পাঁচ লাখ টাকা। অভিযোগ উঠেছে, এসব ফ্ল্যাটের পুরো অর্থই তিনি কলেজ ফান্ড থেকে সরিয়েছেন।
এ ছাড়া অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদ নাটোরে নিজ বাড়িতে নতুন তিন তলাবিশিষ্ট ভবন করেছেন প্রায় ৭০ লাখ টাকায়। কয়েকটি ব্যাংক ও ডাকঘরে তিনি স্ত্রী ও সন্তানের নামে সঞ্চয় করেছেন প্রায় ৮০ লাখ টাকা। ডাকঘরে স্ত্রীর নামে তিনি কিনেছেন ৪০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। ২০১৭ সালে স্ত্রীর নামে শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করেন আট লাখ টাকা।
কলেজ তহবিলের টাকা দিয়ে কেনা দুটি গাড়ি (ঢাকা-মেট্রো-চ-০৩৮৪ ও ঢাকা মেট্রো-গ-২০-৩২৪৪) ওয়াদুদ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরাই ব্যবহার করেন। কলেজের ৩৬ লাখ টাকার একটি মাইক্রোবাস অধ্যক্ষ ভুয়া দরপত্রের মাধ্যমে নিজের নামে করে নেন। তবে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ওই গাড়ির সব ব্যয় কলেজ থেকেই বহন করা হতো।
গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ওয়াদুদের শাশুড়ি ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। ওই দিনই কলেজ ফান্ড থেকে তিনি এক লাখ টাকা তোলেন, যা দিয়ে হাসপাতালের বিল শোধ করা হয় বলে জানা যায়। তাঁর শ্বশুর ঢাকায় একটি হাসপাতালে মারা যান ২০১৮ সালে। তখনো চিকিৎসার জন্য তিনি কলেজ ফান্ড থেকে নগদ পাঁচ লাখ টাকা তুলে নেন। একই বছর রোজার ঈদে নাটোর যাওয়ার আগে গ্রামের বাড়ির কাজের জন্য কলেজ থেকে নগদ নিয়ে যান তিন লাখ টাকা। ওই বছরই স্বপ্ননগর আবাসিক এলাকার ফ্ল্যাটে টাইলস বসাতে সহকারী হিসাবরক্ষক লরেন্স পলাশ থেকে নেন দুই লাখ টাকা।
জানা গেছে, নিজের ফ্ল্যাটে বসবাস করলেও কলেজ ফান্ড থেকে প্রতি মাসে বাড়ি ভাড়া তুলে নেন অধ্যক্ষ ওয়াদুদ। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, নিজের স্ত্রী ও মেয়ের মোবাইল বিল বাবদও নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কলেজ তহবিল থেকে নেন তিনি। ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কলেজের পানির ফিল্টার কেনার ভাউচারের সঙ্গে নিজের বাসায় লাগানো ফিল্টারের ভাউচারও জমা দেন তিনি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কলেজ প্রাঙ্গণের ভেতর ২০১২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রাস্তার কোনো কাজই হয়নি। অথচ কলেজের ‘পশ্চিম পাশের রাস্তা মেরামত’ বাবদ ২০১৮ সালে তিন লাখ ৪৬ হাজার ১০০ টাকা খরচ দেখানো হয়। ২০১৪ সালে কলেজের পশ্চিম পাশের দেয়াল নির্মাণে অধ্যক্ষ ওয়াদুদ খরচ দেখান সাত লাখ ৪২ হাজার ৯১১ টাকা, যদিও এটি করতে খরচ হয়েছে তিন লাখ টাকা। ওই বছরই সীমানাপ্রাচীর রং করতে খরচ দেখান এক লাখ ৭১ হাজার ৩৯৫ টাকা। ওই বছর কলেজ পরিচালনা পর্ষদ গঠন করতেও ওয়াদুদ ব্যয় দেখান ৭৯ হাজার টাকা। সূত্র মতে, ওই সভায় ব্যয় হয় সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা।
এদিকে কলেজের উত্তর-পশ্চিম অংশে একটি সীমানাপ্রাচীর মেরামত করতে টিআর, কাবিখা থেকে স্থানীয় সংসদ সদস্য দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা দেন। কিন্তু তথ্যটি গোপন রেখে অধ্যক্ষ পুনরায় ২০১৮ সালে প্রাচীরটি পুনর্নির্মাণ বাবদ ১০ লাখ ১৭ হাজার ৫০ টাকা খরচ দেখান। একই সীমানাপ্রাচীর মেরামত, মাঠের ঘাস কাটা ও কয়েকটি লাইট মেরামত খাতে গত বছর আরো ৫৮ হাজার টাকা খরচ দেখান অধ্যক্ষ। ২০১৭ সালে কলেজের পুরনো ভবন ও সেই একই প্রাচীরের রং করা বাবদ ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ দেখান তিনি। অথচ তখন কোনো প্রাচীর রং করাই হয়নি।
২০১৩ সালে কলেজের পুরনো বাড়ি সংস্কারে ১৭ হাজার টাকা করে দুই লাখ ১৭ হাজার টাকা, ১০টি কক্ষে ক্লাস চালুর জন্য চার লাখ টাকার কাঠ ও স্টিলের আসবাব বাবদ ২০ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়। আবার বিল তোলার ১০ মাসের মাথায় এসব আসবাব মেরামত বাবদ অধ্যক্ষ খরচ দেখান আরো ১৫ লাখ চার হাজার টাকা। ২০২০ সালের ১৩ জানুয়ারি কোনো অভিভাবক সমাবেশ না করেই অধ্যক্ষ ওয়াদুদ তিন লাখ ৯৪ হাজার ৭২৫ টাকা খরচ দেখান। একই কৌশলে ২০১৮ সালে ৯৬ হাজার ৭৬০ টাকা খরচ দেখান তিনি। ছাত্র-ছাত্রীদের ১৫০ টাকায় প্রশংসাপত্র দিয়ে ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত অধ্যক্ষ কোটি টাকার ওপর আদায় করেছেন। আর তা কলেজ ফান্ডে জমা না দিয়ে তিনি পুরোটাই আত্মসাৎ করেন।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বলেন, সাক্ষাৎ করলে তিনি বিস্তারিত জানাবেন।
জানা গেছে, গোলাম ওয়াদুদকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রেও উপাধ্যক্ষ গিয়াসউদ্দিন আহমেদসহ আটজন সিনিয়র শিক্ষককে ডিঙানো হয়েছিল।
এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোবাইল ফোনে অধ্যক্ষ গোলাম ওয়াদুদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
