।। ফিরোজ আলম।।
দেশে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭কোটি ।জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে প্রতি মিনিটে জনসংখ্যা বাড়ছে ৪.২ জন।
প্রতি ঘণ্টায় বৃদ্ধি পাচ্ছে ২৫৩ জন। মাসে বাড়ছে ১ লাখ ৮২ হাজার ১০০ জন। বছর শেষে মোট জনসংখ্যা বাড়ছে প্রায় ২২ লাখ শিশু।চলমান বাজেট গবেষণায় দেখা যায় দেশে প্রতিটি শিশু ৬০ হাজার টাকা বাজেট ঘাটতি নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বছর শেষে প্রতি শিশুর মাথার ওপর ঋণের বোঝা চাপছে এক লাখ টাকা।এই সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘ উন্নয়ন সংস্থার (ইউএনডিপি) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানব উন্নয়ন সূচক প্রতিবেদনে বলা হয় ২০৩০ সালে বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ৯৮ লাখে পৌঁছাবে, যা হবে জনগোষ্ঠীর ৭০ শতাংশ।
কিন্তু এই সুফল কাজে লাগাতে হলে ২ টি বিষয় প্রয়োজন।এক. প্রত্যেক নাগরিককে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা।দুই. তাদের উপযুক্ত কাজের সংস্থান করা।এখানে ই আমরা ব্যর্থ।কে দক্ষ শিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করবে এবং কিসের বিনিময়ে করবে।
সারা পৃথিবী যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছাত্র–শিক্ষক সবাইকেই নানা সূচকে র্যাঙ্ক করছে।সেখানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম বরাদ্দ পাওয়া আমাদের এবারের শিক্ষা বাজেট জাতীয় বাজেটে সামগ্রিক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মাত্র ০.৯২ শতাংশ এবং উচ্চশিক্ষা উপখাতে বরাদ্দ মাত্র ০.১২ শতাংশ।তদুপরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো র্যাঙ্কিং তো নাই ই।উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে বর্তমান জাতীয় বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে ২০২২ সালের মধ্যে ২ শতাংশে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ৬ শতাংশে উন্নীত করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০৩০ ব্যর্থ হয়ে যাবে।মনে রাখতে হবে অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষায়ও পুরস্কার, প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ এবং বাজেটে বরাদ্দ দেওয়া সময়ের দাবি।
শিক্ষকদের এবং শিক্ষায় মেধাবীদের প্রতি অবহেলায় শিক্ষার মান নিয়ে উচ্চকণ্ঠে আজ গর্ব করে আমাদের বলার মত কিছু নেই।আমেরিকায় সারা পৃথিবীর ৫ শতাংশ মানুষের বাস অথচ শ্রেষ্ঠ ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০টিই তাদের। রাশিয়ার সারা পৃথিবীর প্রায় ২ শতাংশ মানুষের বাস অথচ শ্রেষ্ঠ ৩০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭টিই তাদের।অথচ বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় জায়গাই পায়নি।এর পরে গিয়ে ৪ টি স্থান পেয়েছে।
তার মানে কি বোঝা গেল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা একদিকে বেকারত্ব তৈরি করছে অন্যদিকে বিদেশীদের নিয়োগ দিয়ে আমাদের দক্ষতা ভিত্তিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।এখন প্রশ্ন হল তাহলে কি আমাদের শিক্ষকরা গভেষনাধর্মী মানসম্মত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে?যদি বলি শিক্ষকরা কিসের বিনিময়ে এত বেশি শ্রম দিবেন? ৩০ পার হওয়ার আগেই একজন সাকিব আল হাসান কোটি কোটি টাকা কিংবা একজন মেসি কয়েক শ মিলিয়ন ইউরো উপার্জন করে। আর তার দ্বিগুণ বয়সে পৌঁছেও একজন পাকা চুলের মেধাবী শিক্ষক,বিজ্ঞানী কিংবা আইনস্টাইনের যোগ্য উত্তরসূরী শিক্ষক তাদের ১ শতাংশ কিংবা ঢের কম ও আয় করতে পারে না।
এমতাবস্থায় একজন মেধাবী শিক্ষক,গবেষক,বিজ্ঞানী কোনোরকম আর্থিক নিরাপত্তা এবং প্রনোদনা ছাড়াই কেন জ্ঞান নিয়ে ধ্যান করবে? এমন রসিকতা হয়ত পাগলে ও করবেনা।যার ফলাফল হল কর্মোপযোগী মানুষের মাঝেই বেকারত্ব তৈরি হচ্ছে।যেমন দেশে মোট কর্মোপযোগী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ। এর মধ্যে কর্মে নিয়োজিত ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ। বাকি ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ কর্মক্ষম, তবে শ্রমশক্তির বাইরে।মানে বেকার।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে বর্তমান অশিক্ষিত বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। আর শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ।কয়েক বছর আগে ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে বলা হয়েছিল, বিশ্বে বাংলাদেশেই শিক্ষিত বেকারের হার সর্বোচ্চ।
প্রতিবেদন বলছে, দেশে প্রাথমিক পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ লাখ, মাধ্যমিক পাস করা যুবকের সংখ্যা ৯ লাখের বেশি, উচ্চমাধ্যমিক পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ লাখ আর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস করা বেকার যুবকের সংখ্যা ৪ লাখ ১০ হাজারের বেশি।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ৩ কোটি। যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ ।
সরকারি উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের গবেষণায় দেশে মাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ পুরোপুরি বেকার বলে জানা যায়। এটি আমাদের নি:সন্দেহে উদ্বিগ্ন করে।এই গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বেকার ৩৩ দশমিক ৩২ শতাংশ। বাকিদের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ।
এই যখন বেকারত্বের হার তখন দুটি বিষয় আমাদের বিস্মিত করে।
এক.দেশে সরকারি চাকরিতে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৫৫টি পদ শূন্য। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি পদ শূন্য। এই স্তরে প্রায় দুই লাখ পদ শূন্য রয়েছে।সরকারি চাকরিজীবীদের তথ্য সংক্রান্ত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফস, ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা যায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় সরকারি চাকরিতে মোট অনুমোদিত পদ ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬৮ জন।
এর মধ্যে কর্মরত ১৫ লাখ ৪ হাজার ৯১৩ জন। এর মধ্যে নারী ৪ লাখ ১৪ হাজার ৪১২ জন।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, শূন্য পদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির পদ ৪৬ হাজার ৬০৩টি, দ্বিতীয় শ্রেণির পদ ৩৯ হাজার ২৮টি, তৃতীয় শ্রেণির পদ ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯০২টি এবং চতুর্থ শ্রেণির পদ ৯৯ হাজার ৪২২টি। প্রতিবেদনে কর্মকর্তা ও কর্মচারী সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্যও রয়েছে। দুই•
বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বেকার থাকা সত্ত্বেও অনেক খাতে উচ্চ বেতন দিয়ে বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
টিআইবি বলছে, বাংলাদেশে প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করে। তাদের পিছনে বছরে ২৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।
নিয়োগ দাতাদের যুক্তি দেশে দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে। অথচ বিদেশী শ্রমিকরা কর্মে দক্ষ।এর অর্থ দাঁড়ায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের চাহিদা মেটাতে পারছে না।যোগ্য ও দক্ষতা ভিত্তিক জাতি তৈরিতে আমরা ব্যর্থ।
উপরের দুটি কারন বিশ্লেষনে বলা যায় আমাদের শিক্ষিত স্নাতকধারীরা চাকুরি পরীক্ষায় উত্তীর্ন হতে পারছেনা।কিংবা তারা দক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থার ছোঁয়াই পাননি।এখন প্রশ্ন তাহলে কোন যোগ্যতায় তারা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক শেষ করল? তারা কি প্রকৃত দক্ষ শিক্ষায় শিক্ষিত? নাকি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ই মানহীন?তাই বলব উপরিউক্ত সমস্যা থেকে পরিত্রান পেতে হলে এবং উপযুক্ত জাতী ও দক্ষ মানুষ তৈরী করতে হলে শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা,গভেষনায় প্রনোদনা-পুরস্কার,এমপিওভুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করনের বিকল্প নাই।দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে, এটি সুখবর। কিন্তু চাকরী বিহীন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা অর্জনের অভাবে বেকারত্ব নামক অভিশাপ সেই আনন্দকে ম্লান করে দেয় ।শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা। এই শিক্ষার পেছনে শুধু ব্যক্তি বা পরিবার নয়, রাষ্ট্রেকেও বিপুল বিনিয়োগ করতেই হবে। শিক্ষিত তরুণদের এক-তৃতীয়াংশ যদি বেকার থাকে, তাহলে আমরা ওই শিক্ষাকে কীভাবে মানসম্মত বা যুগোপযোগী মানসম্মত শিক্ষা বলবো?
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ জরিপে দেশে মোট শ্রমশক্তির ৪ দশমিক ২ শতাংশ বেকার বলে জানা যায়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বেকারত্বের সংখ্যা খুঁজতে জরিপ আর জরিপ হয় কিন্তু বেকারত্বের ভয়াবহতা জানতে কোনো জরিপের প্রয়োজন হয় না। বিসিএস ক্যাডার সার্ভিস কিংবা অন্য কোনো খাতে একটি শূন্য পদে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা দেখলেই আমরা বেকারত্ব কি তা অনুমান করি মাত্র।
আমাদের সরকারকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে , উন্নত জাতি গড়ে তোলার জন্য সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষা খাতে অধিক বরাদ্দ ও বিনিয়োগ। অথচ এ খাতে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়,দেওয়া হচ্ছে,এবার দেওয়া হয়েছে তাতে শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করা আদৌ সম্ভব নয়।বরং শিক্ষার দেশীয় মানটাও ধরে রাখা যাবে কিনা তা নিয়ে ও রয়েছে শঙ্কা। ইউনেস্কো যেখানে মত দিয়েছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৭ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ রাখা না হলে শিক্ষার গুনগত মান হুমকির মুখে পড়বে।ইউনেস্কো গঠিত ‘একবিংশ শতাব্দীর জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষা কমিশন ’দেলরস’ এর প্রতিবেদনে বলা হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রাপ্ত বৈদেশিক সহায়তার ২৫ শতাংশ শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করা উচিৎ। অথচ সার্কভুক্ত অঞ্চলে বর্তমানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু বার্ষিক বিনিয়োগের পরিমাণ বাংলাদেশে ৫ ডলার, শ্রীলংকায় ১০ ডলার, ভারতে ১৪ ডলার, মালয়েশিয়ায় ১৫০ ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৬০ ডলার।
তাই শিক্ষা ব্যবস্থা জাতীয়করন করে দেশের সকল স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এবং শিক্ষকদের পদ মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করতেই হবে। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার পথ নিশ্চিত করলেই তাঁরা দক্ষ শিক্ষিত জাতি গঠন করবে।না হলে ক্ষুধার্ত শিক্ষকরা পরিবার পরিজনের প্রয়োজন মেটাতে শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশার সাথে যুক্ত হবে এবং তাতে দক্ষতা ভিত্তিক জাতি গঠন স্বপ্নেই থেকে যাবে ।বেকারত্বের অভিশাপ আরো প্রলম্বিত হবে। নির্বিশেষে সবার ঘরই পুড়ে ছারখার হয়ে যাবে। কোনোভাবেই সে আগুন নেভানো সম্ভব হবে না।
লেখক-
ফিরোজ আলম,বিভাগীয় প্রধান অনার্স,এম.এ শাখা,
আয়েশা (রা:)মহিলা অনার্স কামিল মাদ্রাসা, সদর, লক্ষীপুর।মেম্বার কেন্দ্রীয় স্থায়ী কমিটি এবং সিনিয়র সাংগঠনিক সম্পাদক,কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি,বিএমজিটিএ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
