এইমাত্র পাওয়া

নগরীয় জলাভূমি সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি

।। মো. শহিদুল ইসলাম।। 

রামসার কনভেনশন অনুযায়ী জলাভূমি হলো নিচু ভূমি; যেটির পানির উৎস হতে পারে প্রাকৃতিক কিংবা কৃত্রিম; পানির স্থায়িত্বকাল সারাবছর কিংবা মৌসুমভিত্তিক; পানি স্থির কিংবা গতিশীল; স্বাদু, আধা-লবনাক্ত বা লবনাক্ত, এছাড়াও কম গভীরতাসম্পন্ন সামুদ্রিক এলাকা যেটির গভীরতা ৬ মিটারের কম ও অল্প স্রোতযুক্ত। জলাভূমির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য হল; জলাভূমিতে বছরের বেশিরভাগ সময়ে পানির উপস্থিতি থাকা, পানির গভীরতা ও স্থায়ীত্বের তারতম্য ঘটা, জলাভূমির এবং আশেপাশের মাটির বৈশিষ্ট্যের মাঝে পার্থক্য থাকা, জলাভূমিতে বা জলাভূমির জলাশয়ে জলজ উদ্ভিদের প্রাচুর্য থাকা, জলাভূমির তলদেশের মাটিতে বাতাসের অভাব থাকা সত্ত্বেও কম অক্সিজেনে অভ্যস্ত এমন কিছু উদ্ভিদ জন্মাতে পারা, সময় ও স্থান অনুসারে জলাভূমির আয়তনে এবং অবস্থানে ব্যাপক তারতম্য ঘটা ইত্যাদি।

পৃথিবীতে বিভিন্ন ধরনের জলাভূমি বিদ্যমান, যেমন; মোহনা, কাদা চর, ফেন্স, পকোসিন্স, সোয়াম্পস, ডেলটাস, প্রবাল দ্বীপ, বিলাবঙ্গস, লেগুন, অগভীর সমুদ্র, বগ, হ্রদ ইত্যাদি। আমাদের দেশে জলাভূমিগুলোকে ভাগ করলে দেখতে পাওয়া যায়; প্লাবনভূমি, নিচু জলা, বিল, হাওর, বাওর, জল নিমজ্জিত এলাকা, উন্মুক্ত জলাশয়, নদীতীরের কাদাময় জলা, জোয়ারভাটায় প্লাবিত নিচু সমতলভূমি এবং লবনাক্ত জলাধার ইত্যাদি।

সৃষ্টিগত প্রক্রিয়ায় জলাভূমির গুরুত্ব অপরিসীম। জলাভূমিকে বলা হয় “kidneys of the landscape” । পরিবেশগত সুরক্ষায় জলাভূমির কোন বিকল্প নেই। কোন পরিবেশে জলাভূমির অবদান হিসাব করে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়। সাধারণত জলাভূমির পানির মধ্যেই জলজ বাস্তুসংস্থানের প্রাথমিক খাদ্য উৎপাদক তৈরি হয়ে থাকে যা ধারাবাহিকভাবে অন্যান্য খাদ্য শৃঙ্খল বা খাদ্য জালিকার সৃষ্টি করে থাকে। পৃথিবীর মোট খাদ্য উৎপাদনের ২৪% নিয়ন্ত্রণ করে থাকে জলাভূমি যেখান থেকে মানুষ, পশুপাখি, মাছ, জলজ প্রাণী ইত্যাদি প্রয়োজনীয় খাদ্য পেয়ে থাকে।

পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ সভ্যতা ও সংস্কৃতিগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সেগুলোর প্রায় সবই জলাভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল/ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মেসোপটেমীয় সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, মিশরীয় সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা, ইত্যাদির কথা। বর্তমান বিশ্বে বাসযোগ্যের তালিকায় সেরা নগরসমূহের স্থানিক বিশ্লেষণ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এসব নগরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জলাভূমি বিদ্যমান এবং জলাভূমিগুলো অত্যন্ত সুরক্ষিত অর্থাৎ দূষণ ও দখল মুক্ত।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় জলাভূমির অবদান সীমাহীন। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে, ধুলোবালি দূষণ রোধে জলাভূমির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। শুধু কি তাই? বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভূগর্ভস্থ পানির পরিমাণ বৃদ্ধির উৎস হিসেবে জলাভূমি কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বলে শেষ করা সম্ভব নয়। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে, পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধিতে, মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি করতে, ভালো ও সুস্থ উদ্ভিদ জন্মাতে, পশু-পাখির খাদ্য উৎপাদনে, বর্জ্য পরিশোধনে জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। পরিযায়ী পাখিদের আশ্রয়স্থল হিসেবেও জলাভূমির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।

মানুষের খাদ্য তালিকার অন্যতম মাছ, কাঁকড়া ইত্যাদির উৎস হলো জলাভূমি। অর্থনৈতিক দিক থেকেও জলাভূমির অনেক গুরুত্ব রয়েছে। পরিসংখ্যান অনুসারে সমগ্র বিশ্বের জলাভূমি থেকে আয়ের পরিমাণ বছরে হেক্টর প্রতি প্রায় পনেরো হাজার ডলার। জলাভূমির গুরুত্ব ও উপকারিতা অল্প পরিসরে তুলে ধরা খুবই দুরূহ বিষয়।

জলাভূমিগুলো পর্যটন শিল্প ও চিত্তবিনোদনের ক্ষেত্রেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। জলাভূমির জলাশয়ে নৌকাভ্রমণ করে, বড়শি দ্বারা মাছ ধরে অপরিসীম মানসিক প্রশান্তি পাওয়া সম্ভব। সকালে কিংবা সন্ধ্যায় পরিষ্কার ও মনোরম জলাভূমির জলাশয়ের পাশে হাঁটলে কিংবা বসে থাকলে কার না ভালো লাগে। মাথার উপরে নীলাকাশ, সামনে পরিষ্কার বিশুদ্ধ জলরাশির সৌন্দর্য্য এমন দৃশ্য ভাবতেই মন চনমনে হয়ে ওঠে যেন। নগরীয় ব্যস্ত নাগরিক জীবনে বিভিন্নভাবে অনাবিল প্রশান্তির এক অফুরন্ত উৎস হতে পারে জলাভূমিগুলো। ঢাকার হাতিরঝিল সেটিরই অন্যতম দৃষ্টান্ত।

নগরীয় সভ্যতায় জলাভূমির গুরুত্ব অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। আমরা জানি নগর বলতে; ইট-পাথর ও অন্যান্য তাপ শোষণকারী বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত একটি সিস্টেম। হিট আইল্যান্ড এই নগর সিস্টেম থেকেই সৃষ্ট একটি বিষয় যার ফলে পারিপার্শ্বিকের তুলনায় নগরসমূহে অনেক বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করে যা যেকোনো নগরীয় পরিবেশকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে সক্ষম। জলাভূমি এই হিট আইল্যান্ডের প্রতিরোধক হিসেবে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।

জলাভূমি ব্যতীত আদর্শ নগর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের দেশে অধিকাংশ নগরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে জলাভূমি নেই। যেসব নগরীতে আছে সেগুলোও নানামাত্রিক উন্নয়নের নামে ক্রমাগত ধ্বংস করে ফেলছি। অবৈধ দখল, ভরাট, বর্জ্য নিক্ষেপ ইত্যাদি কারণে জলাভূমিগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে দিনদিন যা সার্বিক নগরীয় সিস্টেমকে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিবে।

ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের অন্যান্য নগরগুলোতে জলাভূমি অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতিনিয়ত অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যা, জলাবদ্ধতাসহ অন্যান্য সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে যা থেকে নানা ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব ছড়াচ্ছে। কোন নগরীয় অঞ্চলের জন্য সঠিক জলাভূমি ব্যবস্থাপনা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা উন্নত বিশ্বের নগরীগুলোর প্রতি তাকালেই বোঝা যায়। আদর্শ ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনায় জলাভূমির উপস্থিতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনই গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা।

জলাভূমি আমাদের জন্য মহামূল্যবান প্রাকৃতিক আশীর্বাদ। পৃথিবীর মোট আয়তনের ছয় শতাংশই হলো জলাভূমি। জলাভূমির গুরুত্ব বিবেচনায় জাতিসংঘ ২ ফেব্রুয়ারি দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক জলাভূমি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পৃথিবীব্যাপী জলাভূমি সংরক্ষণের জন্য নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় ও কোন অঞ্চলকে মরুকরণ হতে রক্ষায় জলাভূমির প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। জলাভূমি ব্যতীত শুধু কংক্রিট দ্বারা সজ্জিত নগরসমূহ বসবাসের জন্য কখনোই আদর্শ স্থান হতে পারে না। দেশের বড় নগরসমূহের অধিবাসীগণ ইতোমধ্যেই সেটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন। জীববৈচিত্রের জন্য আদর্শ স্থল হওয়ায় জলাভূমিকে বলা হয় “biological supermarkets”। আদর্শ ও নান্দনিক নগর গঠনে জলাভূমিগুলোর সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি।

লেখক- প্রভাষক (ভূগোল)
রংপুর ক্যাডেট কলেজ, রংপুর । 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.