জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত সাতক্ষীরার ৬ উপজেলার শতাধিক গ্রাম

নিজস্ব প্রতিবেদক।।

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সাতক্ষীরার সাত উপজেলার মধ্যে ৬টি উপজেলার শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাবিত হয়েছে সাতক্ষীরার সুন্দরবন সংলগ্ন শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলা। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ও বাঁধ উপচে জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে ওইসব গ্রাম।

এসব গ্রামের বিপুলসংখ্যক কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে ছয়টি উপজেলার কয়েকশত চিংড়ি ঘের ও ফসলী ক্ষেত। নষ্ট হয়েছে সুপেয় পানির পুকুরগুলো। পানির তোড়ে সাতক্ষীরার সঙ্গে শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার প্রধান প্রধান সড়কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে না উঠলেও গবাদি পশু ও হাঁস মুরগি নিয়ে বহু মানুষ বাড়ির নিকটবর্তী উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।

বুধবার (২৬ মে) সকালে জোয়ারের চাপে শ্যামনগর উপজেলার পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ঝাপা গ্রামে বেড়িবাঁধের চারটি পয়েন্ট, পাতাখালির দুটি পয়েন্ট, রমজান নগরের দুটি পয়েন্ট, গাবুরার তিনটি পয়েন্ট, কৈখালির দুটি পয়েন্ট, ভেটখালি জামে মসজিদের সামনে একটি পয়েন্ট, বুড়িগোয়ালিনীর তিনটি পয়েন্ট ও নূরনগর ইউনিয়নের একটি পয়েন্ট সহ অন্তত ১৭টি স্থানে পানি বেড়িবাঁধ উপচে গ্রামে ঢুকে পড়েছে। এসব বেড়িবাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ায় সয়লাব হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম।

এদিকে কালিগঞ্জের পূর্ব নারায়নপুর গ্রামের জব্বারের মাছের ঘের সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ ভেঙে উপজেলা হাসপাতাল, আব্দুস সামাদ স্মৃৃতি মাঠ, বাস টার্মিনাল সহ বেশ কয়েকটি গ্রামকাঁকশিয়ালী নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে।
এছাড়া কালীগঞ্জ সোহরাওয়ার্দী পার্কের পাশে কাঁকশিয়ালী নদীর পানি উপচে উপজেলা সদরের বেশ কিছু এলাকা তলিয়ে গেছে।

উপজেলা পরিষদের কাছে যমুনা নদীর উপর নির্মিত স্লুইস গেটের পাটাতন বন্ধ থাকায় সেখান থেকে পানি উপচে নাজিমগঞ্জ বাজার ও উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে একাকার হয়ে গেছে। উপজেলার ঘোজাডাঙা এলাকায় কাঁকশিয়ালী নদীর বাঁধ উপচে উত্তর শ্রীপুর ও দক্ষিণ শ্রীপুরসহ তিনটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

ভাঙনের ফলে কপোতাক্ষের পানিতে আশাশুনি উপজেলার কুড়িকাহুনিয়া লঞ্চঘাট, হরিশখালি, চাকলা, রুইয়ার বিল, সুভদ্রকাটি, দিঘলারআইটসহ কয়েক পয়েন্টের বেড়িবাঁধ উপচে ও ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে।

এছাড়াও আশাশুনি সদরের দয়ারঘাট ও বলাবাড়িয়ায় বেড়িবাঁধ উপচে পানি বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলার খাজরা ইউনিয়নের পিরোজপুরের রাজবংশীপাড়ায় কপোতাক্ষ নদের বাঁধ উপচে বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আশাশুনির দয়ারঘাট ও বলাবাড়িয়ায় খোলপেটুয়ানদীর বাঁধ উপচে পানি এলাকায় ঢুকে কয়েক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। বড়দল ইউনিয়নের বামনডাঙ্গা বেড়িবাঁধ উপচে জোয়ারের পানি লোকালয়ে ঢুকছে।

এদিকে শ্যামনগরের গাবুরার জেলেখালি, নেবুবুনিয়া, চাঁদনীমুখা, গাগড়ামারি, পদ্মপুকুরের উত্তর ও দক্ষিণ পাতাখালি, কামালকাটি, ঝাঁপা ও সোনাখালিসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম উপচে পড়া নদীর জোয়ারের পানিতে ভাসছে। গ্রামবাসী ও জনপ্রতিনিধিরা বালির বস্তা এবং মাটি ফেলে বাঁধ সংস্কারের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন।

এদিকে দেবহাটা উপজেলার ইছামতী নদীর কোমরপুর নামকস্থানে বেড়িবাঁধ উপচে বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার হাড়দ্দহ মসজিদের পাশে ও তালা উপজেলার পাখিমারা বিলেটি আর এম এর বাঁধ ভেঙে কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া বিভিন্নস্থানে কালভার্ট ধ্বসে নদীর পানি ছড়িয়ে পড়েছে। শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নের সেতু উপচে চুনা নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে এলাকা। এখন পর্যন্ত কোন প্রাণহানির কোন খবর পাওয়া যায়নি। তবে গ্রামবাসী গবাদিপশু ও তাদের সহায়-সম্পদ নিয়ে আতংকিত হয়ে পড়েছেন। সাতক্ষীরায় দিনভর বৃষ্টি হয়েছে সেইসাথে ঝড়ো হাওয়া ছিল প্রবল।

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে সাতক্ষীরার নদীগুলোতে পানি বেড়েগাবুরা, বুড়িগোয়ালিনি, কৈখালী, পদ্মপুকুরসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বেড়িবাধ ভেঙে প্লাবিতহয়েছে। এছাড়া নদীর পানি বেড়ে বেড়ি ছাপিয়েও পানি প্রবেশ করেছে। কিছু মানুষ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। তাদের আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে। এছাড়া রাতে আবারো জোয়ারে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে। সেকারণে পানিবন্দি মানুষজনকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও চেয়ারম্যানগণ সক্রিয় রয়েছেন ভাটা নেমেযাওয়ার সাথে সাথে পানি বের করতে কাজ করবেন।

গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জিএম মাছুদুল আলম,পদ্মপুকুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান এড. আতাউর রহমান, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নপরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বাবু ভবতোষ মন্ডল, মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি)চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আবুল কামেশ মোড়ল, কৈখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান শেখআঃ রহিমসহ স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আ. ন. ম. আবুজরগিফারী বলেন, তাৎক্ষনিকভাবে সরকারী সাহায্য হিসেবে প্রতিটি ইউনিয়নে নগত ২৫ হাজার টাকাও ২ মে. টন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া শুকনা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।
সাতক্ষীরা-৪ শ্যামনগরও কালীগঞ্জ (আংশিক) এর সাংসদ জিএম জগলুল হায়দার বলেন, এক বছর আগে আঘাত হানা আম্পানের ক্ষত শুকানোর আগেই আবারও ইয়াসের ছোবল মানুষকে নতুন করে বিপদে ফেলেছে। সকলে মিলে একসাথে কাজ করে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল গণমাধ্যমে বলেছেন, তার কাছে শ্যামনগরের ১২টিপয়েন্টে ভাঙন ও বাঁধ উপচে এলাকা প্লাবিত হওয়ার খবর রয়েছে। ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ পানি নেমে যাওয়ার পরে নিরূপন করা সম্ভব হবে এবং ক্ষত দৃশ্যমান হবে বলে জানান তিনি। আপতত জেলার ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.