আরবি মাসসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বরকতময় ও মর্যাদাপূর্ণ মাস হল রমযান। রমজানের আগমনে বিশ্বনবি (স:)অনেক আনন্দিত হতেন। সাহাবাদের উদ্দেশ্যে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন -أتاكم رمضان شهر مبارك‘তোমাদের দরজায় বরকতময় মাস রমজান এসেছে।
‘সাওম’ অর্থ বিরত থাকা।এর বহুবচন হলো ‘সিয়াম’। ফারসি, উর্দু, হিন্দি ও বাংলায় সাওমকে ‘রোজা’ বলা হয়। ইসলামি পরিভাষায় সাওম বা রোজা হলো সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ইবাদতের উদ্দেশ্যে পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৭ নং আয়াতে বলেন, ‘আর তোমরা পানাহার করো যতক্ষণ রাত্রির কৃষ্ণরেখা হতে উষার শুভ্ররেখা স্পষ্টরূপে তোমাদের নিকট প্রতিভাত না হয়। অতঃপর নিশাগম পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো।
প্রাপ্তবয়স্ক ,স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন, রোজা পালনে সক্ষম সুস্থ সকল নারী ও পুরুষের জন্য রমজান মাসে রোজা পালন করা ফরজ। ঋতুমতী নারী, সন্তান প্রসবকারী মা, অসুস্থ ব্যক্তিদের রোজা না রাখার অনুমতি আছে।তবে এই রোজা পরবর্তী সময়ে কাজা আদায় করতে হবে। কিন্তু এমন অক্ষম ব্যক্তি, যাঁদের আবার সুস্থ হয়ে রোজা পালনের সম্ভাবনা বিদ্যমান নেই, তাঁরা রোজার জন্য ফিদিয়া প্রদান করবেন। অর্থাৎ প্রতিটি রোজার জন্য একটি সদকাতুল ফিতরের সমান দান করবেন। জাকাত গ্রহণের উপযুক্তদেরই এই ফিদিয়া প্রদান করা যাবে।
আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদের সূরা-বাকারার ১৮৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য রোজা ফরজ করা হয়েছে , যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীগণের উপর তা ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।
সূরা-বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন-
— شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِيَ أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ
রমজান মাস-ই হল সেই মাস; যাতে নাজিল করা হয়েছে কুরআন। যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।
সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা এই মাস পাবে, তারা যেন এই মাসে রোজা পালন করে।
وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ – إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَশপথ সুস্পষ্ট (কুরআনের) কিতাবের। আমি একে নাজিল করেছি এক বরকতময় রাতে। নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী।’ (সুরা দুখান : আয়াত ২-৩) – إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ‘আমি একে (কুরআনকে) নাজিল করেছি শবে-কদরে।’ (সুরা কদর : আয়াত ১)
রমযান মাসের ফজিলত বিবেচনায় এটিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়।তা হলো রহমত, মাগফিরাত ও নাজাত। মাহে রমজানের ফজিলত নিয়ে সহীহ বুখারি, প্রথম খণ্ড, হাদিস নং ৩৪ থেকে জানা যায় ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে জেগে ইবাদত করবে, তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।
সহীহ বুখারি, প্রথম খণ্ড, হাদিস নং ৩৬ থেকে জানা যায়, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সহিত সওয়াবের আশায় রমজানে রাত জেগে ইবাদত করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’
সহীহ বুখারি, প্রথম খণ্ড, হাদিস নং ৩৭ থেকে জানা যায় , প্রিয় নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানসহ সওয়াবের নিয়তে রমজানে রোজা পালন করে, তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।’
রোজার ফজিলত নিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জান্নাতে রায়্যান নামক একটি দরজা আছে। এ দরজা দিয়ে কিয়ামতের দিন শুধু রোজাদারগনই প্রবেশ করবে। তাদের প্রবেশের পরে এই দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। তারা ছাড়া আর কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।’ (বুখারি, খণ্ড: ৩, হাদিস: ১,৭৭৫)।
রমজানে সঙ্গে দুটি কাজ গুরুত্বপূর্ন তথা ওয়াজিব হলো সদকাতুল ফিতর প্রদান করা এবং ঈদের নামাজ আদায় করা।
রমজানের গুরুত্বপূর্ন সুন্নাত কাজ সমূহ হলো রমজানের চাঁদ দেখা; সাহ্রি খাওয়া, তাহাজ্জুত নামাজ আদায় করা, ইফতার করা ও করানো, ২০ রাকাত তারাবিহ নামাজ আদায় করা, কোরআন মাজিদ বেশি বেশি তিলাওয়াত করা এবং ইতিকাফ করা,রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোয় শবে কদর অনুসন্ধান করা এবং ঈদের জন্য শাওয়াল মাসের চাঁদ দেখা।
তারাবিহ নামাজ রমজানের বিশেষ আমল। পুরুষদের তারাবিহর নামাজ মসজিদে জামাতে আদায় করা সুন্নাত। ওজরের কারণে মসজিদে যাওয়া সম্ভবপর না হলে এবং জামাত করা না গেলে তখন একা পড়লেও পূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে। অনুরূপ পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজও বিশেষ অবস্থায় একাকী আদায় করা যাবে। এতেও পরিপূর্ণ সওয়াব পাওয়া যাবে।
রমযানের বিশেষ একটি আমল সম্পর্কে হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের কাছে রমজান মাস আগমন করেছে। … এ মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যে ব্যক্তি এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো সে মূলত সব কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হল।’ (নাসাঈ)
রমযানকে ক্ষমা পাওয়ার মাস তথা মুক্তির মাস ও বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (৩ ব্যক্তির ব্যাপারে) বলেছেন– ‘ওই ব্যক্তির নাক ধূলায় ধুসরিত হোক, যার সামনে আমার আলোচনা হলো; কিন্তু সে আমার প্রতি দরূদ পড়লো না।- ওই ব্যক্তির নাম ধূলায় ধুসরিত হোক, যার কাছে রমজান মাস এসে চলে গেল; অথচ তার পাপগুলো ক্ষমা করিয়ে নিতে পারল না।- ওই ব্যক্তির নাক ধূলায় ধুসরিত হোক, যে তার বৃদ্ধ বাবা-মাকে পেল; কিন্তু তাদের মধ্যমে জান্নাত উপার্জন করতে পারল না।’ (তিরমিজি)
রমজান মাসে আল্লাহ তায়ালা ভালো কাজের প্রতিদান বহুগুণে বাড়িয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-‘যে ব্যক্তি রমজান মাসে কোনো একটি নফল ইবাদত করল, সে যেন অন্য মাসের একটি ফরজ আদায় করল। আর রমজানে যে ব্যক্তি একটি ফরজ আদায় করল, সে যেন অন্য মাসের ৭০টি ফরজ আদায় করল।’ (ইবনে খুজায়মা)
রমযানের ফজিলত সম্পর্কে রাসূল ( স:) আরও বলেন-
“যে কেউ রামাদ্বানের রোজা রাখে, ঈমান ও সওয়াবের আশায়, তার বিগত জীবনের সব পাপ মাফ করে দেওয়া হয়” (সহীহ বুখারী-৩৮)
“রোজা হলো (পাপাচার থেকে) রক্ষার ঢাল স্বরূপ। তাই তোমাদের কেউ রোজা রাখলে অশ্লীল কথা বলবে না, চিৎকার ঝগড়াঝাঁটি করবে না। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে মারামারি করে, তাকে বলবে – আমি তো রোজাদার! আমি তো রোজাদার!” (বুখারী-১৮৯৪)
‘‘আল্লাহ তা’য়ালা বলেন- মানুষের প্রতিটি ভাল কাজ নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু রোজা শুধুমাত্র আমার জন্য, অতএব আমি নিজেই এর প্রতিদান দিবো।” (বুখারী-১৯০৪)
‘‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন- মানব সন্তানের প্রতিটি নেক আমলের প্রতিদান দশ থেকে সাতশত গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়ে থাকে। কিন্তু রোজার বিষয়টি ভিন্ন। কেননা রোজা শুধুমাত্র আমার জন্য, আমিই এর প্রতিদান দিবো।” (মুসলিম-১১৫১)
‘‘রোজা ঢাল স্বরূপ। এ দ্বারা বান্দা তার নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করতে পারে।’’ (আহমাদ-১৫২৯৯)
‘‘যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় (অর্থাৎ শুধুমাত্র আল্লাহকে খুশী করার জন্য) একদিন রোজা পালন করবে, তাদ্বারা আল্লাহ তাকে জাহান্নামের অগ্নি থেকে সত্তর বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরবর্তীস্থানে রাখবেন” (বুখারী-২৮৪০; মুসলিম-১১৫৩)
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও নেকীর আশায় রামাদ্বান মাসে ক্বিয়াম করবে (তারাবীহ পড়বে) তার পূর্বেকার পাপ সমূহ মাফ করে দেয়া হবে” (বুখারী-৩৫; মুসলিম-৭৬০)
“যে ব্যক্তি মিথ্যা পরিত্যাগ করলো না, আল্লাহ তা’য়ালা তার পানাহার ত্যাগ কবুল করেন না” (বুখারী-১৯০৩)
“রোজা পালনকারীর জন্য দু’টো বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত রয়েছে – একটি হল ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হল তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়” (বুখারী-৭৪৯২)
লেখক- ফিরোজ আলম,বিভাগীয় প্রধান(অনার্স শাখা),আয়েশা (রা:)মহিলা অনার্স কামিল মাদ্রাসা, সদর,লক্ষীপুর।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
