শাহাবুদ্দীন।।
প্রাথমিক শিক্ষাকে বলা হয় সকল শিক্ষার ভিত্তিভূমি। এই বিষয় টা গুরুত্বের সঙ্গে অনুধাবন করে বর্তমান শিক্ষা বান্ধব সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী এবং আধুনিক করতে বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।প্রাথমিকে মানসন্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে মানসন্মত শিক্ষক প্রয়োজন। মানসন্মত শিক্ষক তৈরি করতে পারলে এসডিজি র লক্ষমাত্রা অর্জন করা সহজ হবে।
প্রাথমিক শিক্ষায় এমডিজি অর্জনের এই সাফল্য আমাদের নির্ধারিত সময়ে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজি) এর লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ আত্মবিশ্বাসী করে তুলে। বিশ্বের আরো ১৯৩ টি দেশের সাথে বাংলাদেশ জাতিসংঘ ঘোষিত ২০১৬-২০৩০ মেয়াদে ১৭ টি লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডা (এসডিজি) বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। এসডিজি’র অন্যতম প্রধান লক্ষ্যমাত্রা হল অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সকলের জন্য শেখার সুযোগ নিশ্চিতকরণ ( এসডিজি-৪)। এসডিজি-৪ লক্ষ্যমাত্রার সাতটি টার্গেট নির্ধারন করা হয়েছে যার মধ্যে জেন্ডার সমতাকে আবারো বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং সমতাভিত্তিক ও মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে।
মানসম্মত শিক্ষাকে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। এসকল সংজ্ঞা হতে বলা যায়- মানসম্মত শিক্ষা হচ্ছে মূলত একগুচ্ছ বিষয় যার মধ্যে পরীক্ষার গ্রেড একটি অংশমাত্র। পরীক্ষার ভাল গ্রেডের পাশাপাশি যে শিক্ষা শিক্ষার্থীর শারিরিক, মানসিক, আত্মীক উন্নয়নসহ চিন্তন দক্ষতা ও বিশ্লেষন ক্ষমতা বাড়াবে তাই মানসম্মত শিক্ষা। তাই মানসম্মত শিক্ষার কর্মসূচী বাস্তবায়ন অর্জন একটি চলমান প্রক্রিয়া। এসডিজি’র এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আমাদের ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন দূরদর্শী নীতি এবং উদ্ভাবনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী।
মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রথমেই প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক। এসডিজি-৪ এর ৪(গ) তে বলা আছে-‘By 2030, substantially increase the supply of qualified teachers, including through international cooperation for teacher training in developing countries, especially least developed countries and small island developing States’ পেশাগতভাবে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষক পেতে হলে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী। মাঠ প্রশাসনে দীর্ঘসময় শিক্ষা নিয়ে সরেজমিন কাজ করতে গিয়ে পেশাগতভাবে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকপুল তৈরীতে যে সকল সমস্যা আমাদের পর্যবেক্ষনে এসেছে তা সমাধানের সুপারিশসহ তুলে ধরা হল:
ক)প্রথমেই শিক্ষকতা পেশায় যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে হবে।এর কোন বিকল্প নেই,এজন্য সম্মানজনক বেতন ভাতার বিষয় টি সুবিবেচনা করতে হবে। বর্তমান সরকার সকল সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন দ্বিগুনেরও বেশী বৃদ্ধি করেছে যা খুবই উৎসাহব্যঞ্জক।কিন্তু প্রাথমিকের শিক্ষকেরা তাদের বেতন ভাতার বিষয়টা নিয়ে হতাশায় আছে, যেটি আশু সমাধান প্রয়োজন। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা বাড়াতে হবে।এছাড়া আরো যা করা যেতে পারে, মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে শিক্ষকদের বিভিন্ন পদের বেতন স্কেল উচ্চধাপে উন্নীতকরণের দাবী সহানুভূতিসহকারে বিবেচনা করা। সেই সাথে শিক্ষকতা পেশায় বিশেষ প্রণোদনাও দেয়া যেতে পারে। যেমন, শিক্ষকতা বা প্রশিক্ষণকালিন যেসকল শিক্ষক নির্ধারিত সাফল্য দেখাতে পারবেন তাদের বিদেশ প্রশিক্ষনসহ অন্যান্য প্রেষনাদান, ডাবল শিফট বা অতিরিক্ত খাটুনীর জন্য ভাতা প্রদান ইত্যাদি।
খ)প্রাথমিকে শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে অনুপাত তা মান সম্মত শিক্ষার জন্য মোটেও অনুকূল নয়। প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫০ এরও বেশী। বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে এই অনুপাত আরো ভয়াবহ। এখানে রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকট। গ্রাম পর্যায়ে এমনও স্কুল পাওয়া যায় যেখানে ২০০-২৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য ২-৩ জন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এই সমস্যা সমাধানে জরুরী ভিত্তিতে যে সকল স্থানে শিক্ষক সংকট রয়েছে সেখানে নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ডাবল শিফট স্কুল চালু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত স্বল্পমেয়াদে ১:৪০ এবং র্দীর্ঘমেয়াদে এই অনুপাত ১:২৫ এ নিয়ে আসা।
গ) শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরা। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সকল পর্যায়ের শিক্ষকগণ যাতে নিয়মিত প্রশিক্ষন পান তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সরকার উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে অনেকগুলো প্রশিক্ষন কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারী দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকগণ তাদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রয়োগের উদ্যেগ খুব কম চোখে পড়ে। অন্যান্য সেক্টরের সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মত শিক্ষকগণও পেশাগত জ্ঞান বৃদ্ধি বা প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান অর্জন বা প্রয়োগ কোনটাতেই প্রয়োজনীয় আগ্রহ দেখান না। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরনে শিক্ষকগণ যেন তাদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ক্লাশে শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রয়োগ করেন, এজন্য প্রয়োজনীয় প্রেষণা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষনলব্ধ জ্ঞান ক্লাশরুমে প্রয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের জবাবদিহিতা থাকা প্রয়োজন।
ঘ)মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ সকল বিদ্যালয়ে চালু করা।এটা বর্তমান সরকারের একটা বিশেষ পদক্ষেপ। সরকার এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে শিক্ষকদের ১২ দিনের জন্য আইসিটি ট্রেনিং দিচ্ছে।কিন্তু অনেক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা প্রশিক্ষণের বাইরে আছে। ট্রেনিং টা যত দ্রুত দেওয়া যাবে এবং বিদ্যালয়ে মাল্টিমিডিয়া শ্রেণি কক্ষ নিশ্চিত করা যাবে,ততদ্রুত মানসম্মত শিক্ষক তৈরি করা সম্ভব হবে।আর মানসম্মত শিক্ষকই পারে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে।
ঙ)শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষকদের সুযোগ সুবিধা প্রদান করার পর তাদের কাছে থেকে মানসম্মত শিক্ষা পেতে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং এ যেসকল দূর্বলতা পরিলক্ষিত হবে তার সমাধান দ্রুত করতে হবে।
বর্তমানে প্রাথমিকে পাসের হার সন্তোষজনক। কিন্তু এর পিছনে আর একটি হতাশা কাজ করছে শিক্ষার্থীরা সাবলীল ভাবে বাংলা ইংরেজি পড়তে না পারা।জাতিসংঘের তথ্যটা অনেক হতাশাব্যঞ্জক।এই হতাশার জায়গা থেকে আমরা উত্তোরণ হতে পারি মানসম্মত শিক্ষকদের মাধ্যমে। মানসম্মত শিক্ষকই পারে প্রাথমিকে আমূল পরিবর্তন আনতে।যখনই আমাদের মানসম্মত শিক্ষক পাওয়া যাবে তখনই বলতে পারবো এসডিজি লক্ষমাত্রা অর্জন করা সহজতর হবে।
লেখক,
সহকারী শিক্ষক
ইসলামপুর সঃপ্রাঃবিঃ
যশোর সদর, যশোর।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
