চলন্ত ট্রেনে সিন্দুক থেকে টিকিটের টাকা চুরি

নিউজ ডেস্ক।।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বলছেন, দেশের রেলের ইতিহাসে এ এক নজিরবিহীন কাণ্ড। চলন্ত ট্রেনে গার্ডের (ট্রেন পরিচালক) তত্ত্বাবধানে থাকা ক্যাশ সেইফ বা ভ্রাম্যমাণ সিন্দুক থেকে খোয়া গেছে টিকিট বিক্রির ৯২ হাজার টাকা। তবে ক্যাশ সেইফের ভেতরে স্টেশন থেকে দেওয়া টাকার ব্যাগ ও টাকা আদায়ের রশিদ অক্ষত রয়েছে।

দুই স্তরে নিরাপত্তার তালা ভেঙে সিন্দুক থেকে তিনটি স্টেশনের টিকিট বিক্রি বাবদ প্রাপ্ত টাকা খোয়া গেলেও ট্রেনটিতে দায়িত্ব পালনকারীদের কেউই এ সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। চট্টগ্রামের ক্যাশ অফিসে টাকা হিসাবের সময় চুরির বিষয়টি ধরা পড়ে। এ কাণ্ড গত ২৯ ডিসেম্বরের। এটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে চার সদস্যের।

জানা গেছে, ঢাকা-নোয়াখালী রুটের মাইজদী, মাইজদী কোর্ট স্টেশন ও নাথেরপেটুয়া স্টেশনে টিকিট বিক্রির ৯২ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছে না। গত ২৯ ডিসেম্বর নোয়াখালী থেকে ঢাকাগামী নোয়াখালী এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট বিক্রির এসব টাকা ওইদিনের সমতট এক্সপ্রেস ট্রেনে পাঠানো হয়। ওই ট্রেনের গার্ড শামসুল আলমের নিরাপত্তা হেফাজতে ১৬৯ নম্বর ক্যাশ সেইফ পাঠানো হয় লাকসাম স্টেশনে। নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্যকে রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সেই ট্রেনে কোনো নিরাপত্তা সদস্য ছিল না। লাকসাম স্টেশন মাস্টার শাহাবুদ্দিনকে অক্ষত অবস্থায় বুঝিয়ে দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন শামসুল আলম। তবে শাহাবুদ্দিন বলছেন, একটি সিল ছেঁড়া থাকার কথা তাকে জানানো হয়েছিল। তখন তিনি আরেকটি প্রকেটশন সিল দিয়েছিলেন।

জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসনামল ১৯৬২ সালে ইন্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি প্রথম বাংলায় রেলপথ স্থাপন করে। ব্রিটিশ আইনে পরিচালিত হতো ট্রেন। আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে, পাকিস্তান ইন্টার্ন রেলওয়ে এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে হওয়ার পরও কিছু সংশোধন ছাড়া ব্রিটিশ আইনে পরিচালিত হচ্ছে রেল। বর্তমানে বড় স্টেশনগুলোর টাকা ব্যাংকে জমা হলেও মফস্বল এলাকার স্টেশনের টাকা পুরনো নিয়মে ক্যাশ সেইফের মাধ্যমে ক্যাশ অফিসে আনা হয়। ব্রিটিশ নিয়ম অনুসরণ করে কাজ করলে চুরি বা হারানোর আশঙ্কা নেই বলছেন রেল সংশ্লিষ্টরা। দায়িত্ব অবহেলার কারণে অথবা চোরের সঙ্গে যোগসাজশ ছাড়া ট্রেনের গার্ডরুম থেকে টাকা চুরির কোনো সুযোগ নেই।

সূত্র চানায়, চামড়ার ক্যাশ ব্যাগে করে টাকা ও আয়ের ডকুমেন্ট সিলগালা করেন স্টেশন মাস্টার। তারপর গার্ডের তত্ত্বাবধানে ক্যাশ সেইফে বুঝিয়ে দেন। ছোট স্টেশনের টাকা ক্যাশ ভ্রাম্যমাণ ক্যাশ চেইফে ট্রেন পরিচালকের নিরাপত্তা হেফাজতে পাঠানো হয়। থাকেন নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য। অনেকটা সিন্দুকের মতো দেখতে ক্যাশ চেইফে দুই স্তরে তালা থাকে। বক্সটি এমনভাবে বানানো যাতে তালা খোলা ছাড়া টাকার ব্যাগটি ঢুকানোর ব্যবস্থা আছে। কিন্তু বের করার সুযোগ নেই। ক্যাশ অফিস থেকে সিলগালা করে তালা দিয়ে চাবি রেখে দেওয়া হয়। বাক্সটি আসার পর তিন বিভাগের তিনজন কর্মকর্তার উপস্থিতিতে ক্যাশ খোলা হয়। যে স্টেশন থেকে বক্সে টাকার ব্যাগ দেওয়া শুরু হবে সেই স্টেশন মাস্টার নিচের কার্ড লেবেল বন্ধ করে দিবেন। আর শেষ স্টেশন মাস্টার ওপরের মুখ কার্ড লেবেল দিয়ে সিলগালা করে দিবে। স্টেশন থেকে টাকার ব্যাগ ঢুকানোর সময় গাইডেন্সে স্টেশন মাস্টার স্বাক্ষর করেন। সেখানে কোন স্টেশন থেকে কয়টি ব্যাগ নিয়েছে তা উল্লেখ থাকবে। আর স্টেশনে থাকা গাইডেন্সে গার্ড স্বাক্ষর করেন। গার্ড ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য চট্টগ্রাম স্টেশনের পিএসএম-এর কাছে জমা দিবেন। পরদিন ক্যাশ অফিসে তিনজনের উপস্থিতিতে খোলা হয়। এরপর কোন স্টেশন থেকে দেওয়া তথ্যের সাথে মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট স্টেশনের অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়।

নোয়াখালী থেকে আসা সমতট এক্সপ্রেসে ১৬৯ ক্যাশে ছয়টি স্টেশনের টাকা ছিল। কিন্তু তিনটি স্টেশনের ব্যাগ ও রশিদ অক্ষত থাকলেও টাকা পাওয়া যায়নি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং গার্ডের দায়িত্ব অবহেলার কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে। ক্যাশ সেইফটি গার্ডের কক্ষে থাকার কথা কিন্তু তোলা হয়েছে মালামালের বাগি লাগেজ ভ্যানে।

তদন্ত কমিটির গঠন করা হয়েছে জানিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা আনসার আলী গণমাধ্যমকে বলেন, কমিটির তদন্তে কারও গাফিলতি থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.