ড. নাদিম মাহমুদ।।
বিশ্বের অন্যন্য দেশের মতো বাংলাদেশও কভিড-১৯ মোকাবিলা করছে। বেশ সাহসিকতার সঙ্গে সরকার অর্থনীতি চাঙ্গার চেষ্টা করছে, ঠিক তেমনি অনেকেই করোনায় স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করে মহামারিকে দীর্ঘায়িত করছে। দেশের বিভিন্ন সেক্টর করোনাকালীন কমবেশি সংক্রিয় হলেও একমাত্র শিক্ষা ব্যবস্থাকে সচল করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এই ব্যর্থতা কেবল সরকারের বলা যাবে না, এটার দায় সমগ্র দেশবাসীকে নিতে হবে।
ঘরে ঘরে শিক্ষার্থীরা দিনের পর দিন অলস সময় পার করছে। উপযুক্ত দিকনির্দেশনা না থাকায়, অনুশীলনের তাগাদা না পাওয়ায় দেশের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ভোগান্তিতে পড়ছে। অভিভাবকরা যেমন দুশ্চিন্তায়, তেমনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা সময়মতো কর্মজীবনে পদার্পণ করতে না পারায় পিছিয়ে পড়ছে তাদের স্বপ্নের চাকা।
এরই মধ্যে সরকার অটোপাসের ব্যবস্থা করেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে কবে এই পরীক্ষা নেওয়া হবে, তার কোনো নির্দেশনা এখন পর্যন্ত নেই। এরই মধ্যে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে পর্যায়ে স্থগিত হয়ে যাওয়া পরীক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করার নোটিশ জারি করেছে।
সবকিছু মোটামুটি স্বাভাবিক গতিতে চললেও শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফেরানোর অভিপ্রায় এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়। আগামী দিনে মহামারিকে কোলে নিয়ে শিক্ষার মডেল কী হবে, শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষার ধরন কেমন হবে, তা পরিস্কার নয়। ফলে, এক অনিশ্চিত যাত্রায় দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা।
বিশ্বের কোনো কোনো দেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিয়মিত ক্লাস-পরীক্ষা, সেমিনার চলছে। গবেষকদের গবেষণা কার্যক্রমও থেমে নেই। ডিসেম্বরের শুরুতে বিশ্বের ধনী দেশগুলোতে কভিড-১৯ ভ্যাকসিন নেওয়া শুরু হয়েছে। দুই দফায় নেওয়া এই ভ্যাকসিনের কার্যকারিতায় কভিড-১৯ সংক্রমণ কমিয়ে ধনী রাষ্ট্রগুলো স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে। ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা যদি ৯৫ ভাগও সফল হয়, তাহলে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে এইসব রাষ্ট্রের অন্তত সামনের বছরের মাঝামাঝি সময় লাগতে পারে।
বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভ্যাকসিন প্রাপ্যতায় যে সম্ভাবনা তা নিশ্চিত না হলেও ধনী দেশগুলোর চাহিদা পূরণ শেষে অনুন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভ্যাকসিন প্রাপ্যতা সহজতর হতে পারে। সেই হিসাব কষে বলা যেতে পারে, আগামী বছরের মার্চ কিংবা মাঝামাঝিতে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হলেও ২০২২ সালের মাঝামাঝি লেগে যেতে পারে।
এসব সম্ভাবনা মাথায় রেখে আগামী শিক্ষাবর্ষের শিক্ষা কার্যক্রম ঢেলে সাজানোর বিষয়টি যে সরকারকে নজরে আনতে হবে। আমরা যদি মনে করি, আগামী বছরের মাঝামাঝিতে দেশের ৮০ শতাংশ মানুষকে ভ্যাকসিন দিয়ে স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে ফেরাব, তাহলে আমাদের শিক্ষার্থীরা আরও একটি বছর ভোগান্তির কবলে পড়তে যাচ্ছে। তাই ভ্যাকসিনের প্রাপ্যতার দিকে না চেয়ে সময় থাকতে আমাদের সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।
আগামী বছরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে কিনা, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মহামারির সময়ে শিক্ষা কার্যক্রম কেমন হবে এ বিষয়ের সুরাহা করতে হবে। প্রচলিত সিলেবাসের আদলে নতুন সিলেবাস কেমন করা যেতে পারে, সেটা নিয়ে দেশের শিক্ষাবিদ ও ভিনদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যেতে পারে। সিলেবাসে শিক্ষার্থীদের মৌলিক জানার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে কাটাছেঁড়া করা কিছুতেই অযৌক্তিক হতে পারে না।
তবে সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তৈরি করতে গিয়ে যেন আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের পিছিয়ে না দিই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু করা যেতে পারে কিছু নিয়ম মেনে। ধরুন একটি বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ৩০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। মহামারির আগে একটি কক্ষে যেখানে ৪০ জন শিক্ষার্থী বসতে পারত, কভিডকালীন সেখানে বসবে ২০ জন করে। যে শিক্ষক প্রতিদিন তিনটি বা চারটি করে ক্লাস নিত, সেই শিক্ষক কেবল একটি শ্রেণিতে তিনটি ক্লাস নেবেন। ধরুন, ৪০ জন শিক্ষার্থীকে আমরা যদি তিনটি গ্রুপে ভাগ করি, তাহলে ১৩ জন করে গ্রুপ ক্লাস করবে। এক গ্রুপের ক্লাস শেষ হলে অন্য গ্রুপ ক্লাসে যোগ দেবে।
এভাবে পরবর্তী ঘণ্টায় ফের নতুন করে আরও একটি বিষয়ে ক্লাস শুরু হবে একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশের স্মার্টফোন ব্যবহার করার সুযোগ আছে। যদিও গ্রামের প্রান্তিক অঞ্চলে এই হার কম হতে পারে। যেসব শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস মিস করবে, তাদের জন্য ক্লাসের প্রেজেন্টশন ফাইল ক্লাউডে জমা রাখা যেতে পারে, যা থেকে ওইসব শিক্ষার্থীরা পড়ার সুযোগ পাবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় দক্ষিণ কোরিয়া যেসব কৌশল অবলম্বন করেছিল, এর মধ্যে ছিল পরীক্ষার ১৫ দিন আগে আইসোলেশন, শিক্ষার্থীদের অবস্থান ট্র্যাক, প্লাস্টিকের উইন্ডোতে প্রতিটি শিক্ষার্থীর আসন ঘেরা। বাস্তবতার নিরিখে আমাদের দেশে এসব কতটা কার্যকর করা যেতে পারে, তা বলা মুশকিল। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বছরে দুই সেশনে নেওয়া যায় কিনা ভাবতে হবে।
বিশ্বের সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্প্রিং ও অটাম সেশন চালু রয়েছে। ফলে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা বছরে দু’বার ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পায়। দেশের অর্থনীতির ক্ষতি পুষিয়ে আমরা এগিয়ে গেলেও শিক্ষাকে ফেলে আমরা কতদূর এগিয়ে যেতে পারব এ নিয়ে আশঙ্কা আছে। আমাদের উচিত হবে, আমাদের ছেলেমেয়েদের উপযুক্ত দিকনির্দেশনা দেওয়া। আগামী শিক্ষাবর্ষ সেভাবেই হোক রিভাইভ করা। তা করতে না পারলে আমাদের কয়েকটি প্রজন্ম পক্ষাঘাতের কবলে পড়বে। আমরা চাই মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্বশীলরা যৌথ উদ্যোগে এই করোনাদুর্যোগে দূরদর্শী ভাবনার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে।
গবেষক, ওসাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
