নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কক্সবাজারের টেকনাফ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশের পরিকল্পনা ও প্রত্যক্ষ মদদে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদকে খুন করা হয়। ওসি প্রদীপ টেকনাফজুড়ে অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভয়াশ্রম গড়ে তুলেছিলেন বৈধ অস্ত্র ও ক্ষমতা ব্যবহার করে। ইয়াবার কারবারসহ নানা অপকর্মেও জড়িয়ে পড়েন টেকনাফ থানার তৎকালীন এই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার স্বেচ্ছাচারিতা তো বটেই, ইয়াবা কারবারে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়েও কিছু তথ্য জেনে ফেলেছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সিনহা। তাই নিজের অপরাধ আড়াল করতে এবং গড়ে তোলা সাম্রাজ্য বাঁচাতে সিনহাকে হত্যার পথ বেছে নেন প্রদীপ।
মেজর সিনহাকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় টেকনাফ থানার বরখাস্ত ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামির বিরুদ্ধে গতকাল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে র্যাব। এর পর রাজধানীর কারওয়ানবাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশেষায়িত এ বাহিনীটির আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ এসব তথ্য জানান।
এদিন সকালে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহর আদালতে নিহত সিনহা মো. রাশেদ খানের বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌসের করা হত্যা মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন র্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) খায়রুল ইসলাম। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সিনহা হত্যার ঘটনায় মাদক ও পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা অন্য তিনটি মামলার সত্যতা পাওয়া যায়নি।
প্রসঙ্গত, এ তিনটি মামলা শুরু থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। একটি মামলায় সিনহার সঙ্গী সাহেদুল ইসলাম সিফাতকে; অন্যটিতে সিনহার সহকর্মী শিপ্রা দেবনাথকে এবং তৃতীয়টিতে নিহত সিনহাকে আসামি করা হয়। এই তিনটি মামলা শুরু থেকেই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এ মামলা তিনটির তদন্ত শেষে শিপ্রা ও সিফাতকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে গত বৃহস্পতিবার আদালতে ফাইনাল রিপোর্ট জমা দিয়েছেন র্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা।
সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার করা মামলাটির তদন্তভার র্যাবের হাতে তুলে দেওয়ার ৪ মাস ৭ দিন পর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হলো। গতকাল সকাল ১০টা ২০ মিনিটে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। ২৬ পৃষ্ঠার এ অভিযোগপত্রে মামলার নানা বিষয় তুলে ধরা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারপক্ষের আইনজীবী ফরিদুল আলম। এতে ওসি প্রদীপসহ যে ১৫ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৪ জন কারাগারে। মামলার চার্জশিটে আসামি করা হয়েছে পুলিশের সাবেক এসআই সাগর দেবনাথকে। তিনি পলাতক। অভিযুক্ত ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। দুই আসামি প্রদীপ ও তার দেহরক্ষী রুবেল শর্মা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। ১৪ জনের মধ্যে প্রদীপ চট্টগ্রাম কারাগারে, অবশিষ্ট সবাই কক্সবাজার কারাগারে বন্দি। তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার স্বার্থে ৮৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। চার্জশিটে সিনহা হত্যার জন্য ওসি প্রদীপকে দায়ী করা হয়েছে এবং এটি পূর্বপরিকল্পিত বলে জানিয়েছেন এ আইনজীবীও।
চলতি বছরের ৩ জুলাই একটি ডকুমেন্টারি করার জন্য কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ সড়কের নীলিমা রিসোর্টে ২ সহকর্মীসহ উঠে মেজর অবসরপ্রাপ্ত সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান। ৩১ জুলাই রাতে টেকনাফ থেকে ফেরার পথে শামলাপুর এপিবিএনের পুলিশ চৌকিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন মেজর সিনহা। ৫ আগস্ট সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার ফেরদৌস বাদী হয়ে কক্সবাজারের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। পরদিন ওসি প্রদীপসহ অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেন। এর পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পর্শকাতর এ মামলার তদন্তভার তুলে দেয় র্যাবের হাতে। এরই ধারাবাহিকতায় এপিবিএনের তিন সদস্য এবং পুলিশের মামলার সাক্ষী তিনজনকে আটক করে।
মামলার ১৪ আসামি হলেন- পরিদর্শক লিয়াকত আলী, ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল-মামুন, মোহাম্মদ মোস্তফা, এপিবিএনের তিন সদস্য যথা- এসআই মোহাম্মদ শাহজাহান, কনস্টেবল মোহাম্মদ রাজীব ও মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার ৩ সাক্ষী নুরুল আমিন, নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াজ এবং টেকনাফ থানার সাবেক কনস্টেবল রুবেল শর্মা।
সিনহা হত্যাকাণ্ডে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় যেখানে এ ধরনের ঘটনা যেন আর না ঘটে, সে উদ্দেশ্যে ১৩টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
গত ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর এপিবিএন চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। এ ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়।
এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা কবের এবং কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মুখপাত্র আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের বলেন, পরিকল্পনাটি মধ্য জুলাইয়ের। সিনহা মো. রাশেদ বন্ধুবৎসল ছিলেন। টেকনাফে তার ইউটিউব চ্যানেল চালুর অংশ হিসেবে গিয়েছিলেন। দ্রুতই তার সঙ্গে এলাকাবাসীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ডকুমেন্টারি বানাতে গেলেও তিনি টেকনাফের মানুষের ওপর প্রদীপ কুমার দাশের নির্যাতন-নিপীড়নের কথা জানতে পারেন। ইয়াবা বড়ি কেনাবেচায় সম্পৃক্ততারও প্রমাণ পান। এমন কিছু তথ্য তিনি সংগ্রহ করেছিলেন, যেগুলো প্রকাশ পেলে প্রদীপ কুমার দাশ অস্তিত্বের সংকটে পড়ে যেতে পারতেন। এসবের ভিত্তিতে তিনি টেকনাফ থানায় প্রদীপ কুমার দাশের সাক্ষাৎকার নিতে যান। এ সময় প্রদীপ কুমার দাশ তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার কথা বলেন এবং সরাসরি হুমকি দেন। কিন্তু সিনহা তার কাজ চালিয়ে চান। পরে প্রদীপ থানাতেই পরিদর্শক লিয়াকত ও তিন সোর্সের সঙ্গে বৈঠক করেন। হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করতেও প্রদীপই নির্দেশ দেন।
র্যাব জানায়, গত ৩১ জুলাই রাত ৯টা ২৫ মিনিটে সিনহা মো. রাশেদ খান গুলিবিদ্ধ হন। খবর পেয়ে প্রদীপ কুমার দাশ ঘটনাস্থলে আসেন এবং সিনহার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। হাসপাতালে নেন দায়সারাভাবে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য আসামি পুরো হত্যাকাণ্ডটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য নাটক মঞ্চস্থ করেন।
আশিক বিল্লাহ বলেন, জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে লিয়াকত তিন সোর্স নুরুল আমিন, নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াজের সঙ্গে হত্যা পরিকল্পনা নিয়ে সাক্ষাৎও করেছিলেন, সে তথ্যও তদন্তকারী কর্মকর্তা জানতে পেরেছেন।
সিনহা মো. রাশেদ খানের ডিজিটাল ডিভাইসে ঠিক কী কী তথ্য ছিল? তদন্ত কর্মকর্তা এগুলো পরীক্ষা করে দেখেছেন কিনা, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আশিক বিল্লাহ বলেন, এগুলো পরীক্ষা করার প্রয়োজন পড়েনি। সিনহা মো. রাশেদ তার সহকর্মীদের নিয়ে যে থানায় গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে কোনো প্রমাণ আছে কিনা, সে সম্পর্কে আশিক বিল্লাহ বলেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে টেকনাফ থানার কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি।
সে সময় প্রদীপ কি হুমকি দিয়েছিলেন- এ প্রশ্নে র্যাব কর্মকর্তা আশিক বিল্লাহ বলেন, কক্সবাজার থেকে চলে যাওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। না গেলে সিনহাকে ধ্বংস করা হবে বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছিলেন প্রদীপ।
কক্সবাজারের তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এবিএম মাসুদ হোসেনের ভূমিকা সম্পর্কে তদন্ত কর্মকর্তা তার প্রতিবেদনে বলেছেন, ঘটনা ঘটার পরও ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া ছিল অপেশাদারী আয়োজন। এ বিষয়ে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেন তিনি।
টেকনাফে কি তাহলে পুলিশ এভাবেই সাজানো বন্দুকযুদ্ধ ঘটিয়েছে- এমন প্রশ্নে আশিক বিল্লাহ বলেন, প্রতিটি ঘটনাই আলাদা। তারা নির্দিষ্ট একটি ফৌজদারি মামলার তদন্ত করেছেন। এর আগে টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক র্যাবের গুলিতে নিহত হন বলে জানান তার স্ত্রী। এ সম্পর্কিত তথ্য-প্রমাণ তিনি সংবাদ সম্মেলনে হাজির করেন। ওই মামলার তদন্ত র্যাব করেছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে আশিক বিল্লাহ একই জবাব দেন। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনটি সিনহা হত্যা নিয়ে।
লিয়াকতের করা রিভিশন মামলা খারিজ
সিনহা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার বড় বোন শারমিনের করা মামলাটি আদালত কর্তৃক বেআইনি ও অবৈধ ঘোষণা করার আবেদন করে প্রধান আসামি লিয়াকত আলীর আইনজীবীর দায়ের করা রিভিশন মামলাটি খারিজ করে দিয়েছেন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ঈসমাইল। রিভিশন মামলাটির পূর্ণাঙ্গ শুনানির নির্ধারিত দিন ছিল গতকাল। এদিন শুনানি গ্রহণ করে বিচারক মামলাটি খারিজ করে দেন। এ তথ্য জানিয়েছেন শারমিনের দায়ের করা মামলায় তার পক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর।
গত ৪ অক্টোবর কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সিনহা হত্যা মামলার প্রধান আসামি লিয়াকত আলীর পক্ষে তার আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন এ রিভিশন মামলাটি দায়ের করেন। ওই দিন আদালত মামলাটির পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য গত ২০ অক্টোবর দিন ধার্য করেন।
শুনানির ওই নির্ধারিত দিনে (২০ অক্টোবর) সিনহা হত্যার মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস অসুস্থতার কারণে আদালতে উপস্থিত থাকতে না পারায় আদালত পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন ১০ নভেম্বর।
মামলাটি শুনানির ওই পূর্বনির্ধারিত দিনে (১০ নভেম্বর) লিয়াকতের নিযুক্ত আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন উদ্দিন অসুস্থ হয়ে পড়েন। এতে মামলাটির পূর্ণাঙ্গ শুনানির দিন আবারো পিছিয়ে যায়। ওই দিন (১০ নভেম্বর) আদালত মামলাটির পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য ১৩ ডিসেম্বর দিন ধার্য করেন।
আদালত চত্বরে লিয়াকত আলীর নিযুক্ত আইনজীবী মাসুদ সালাহ উদ্দীন বলেন, রিভিশন মামলাটি আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। আদালতের এ আদেশে তারা ন্যায় বিচার পায়নি। তারা আদেশ পুনর্বিবেচনার জন্য আদালতে আবেদন করবেন।
শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌসের আইনজীবী বলেন, একই হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করে আজ ১৫ আসামির বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে আদালতে। আদালত চার্জশিট গ্রহণ করেছেন। এ ঘটনার পরম্পরায় সম্পৃক্ত শিপ্রা ও শাহেদুল ইসলাম সিফাতের বিরুদ্ধে দায়ের করা মাদকদ্রব্য আইনে দুটি মামলার ও চূড়ান্ত অভিযোগপত্র (ফাইনাল চার্জশিট) আদালতে দাখিল করা হয়েছে। তা আদালত গ্রহণ করেছে। ওই সবকিছু বিবেচনা করে আদালত বহিষ্কৃত পুলিশ পরিদর্শক লিয়াকত আলীর করা রিভিশন মামলাটি খারিজ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
