এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
আল্লাহ তাআলা মানুষকে দুই ভাগে সৃষ্টি করেছেন। পুরুষ আর নারী। এভাবে সৃষ্টি করা আল্লাহ তাআলার হিকমত ও কল্যাণ-জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল। তবে আল্লাহ তাআলা কাউকে শুধু কন্যা সন্তানই দান করেন।
আবার কাউকে পুত্র সন্তান। কাউকে আবার পুত্র ও কন্যা উভয়ই দান করেন। কাউকে কাউকে আবার কোনো সন্তানই দান করেন না। এ বণ্টনও আল্লাহ তাআলার বিশেষ হিকমত ও কল্যাণ-জ্ঞানের ভিত্তিতেই হয়।
এদিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন- يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَأَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا. তিনি যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দান করেন। অথবা তাদেরকে দান করেন পুত্র ও কন্যা উভয়ই এবং যাকে ইচ্ছা করে দেন বন্ধ্যা। -সূরা শুরা (৪২)
হজরত আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ঐ স্ত্রী স্বামীর জন্য অধিক বরকতময়, যার দেন-মোহরের পরিমান কম হয় এবং যার প্রথম সন্তান হয় মেয়ে।” রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো ইরশাদ করেন, “যার গৃহে কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহন করল, অতঃপর সে তাকে (কন্যাকে) কষ্টও দেয়নি, তার উপর অসন্তুষ্ট ও হয়নি এবং পুত্র সন্তানকে প্রাধান্য দেয়নি, তাহলে ঐ কন্যার কারনে আল্লাহ তা’য়ালা তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।” (মুসনাদে আহমদ, ১:২২৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন,” যে ব্যক্তির তিনটি কন্যা সন্তান হবে, এবং সে তাদেরকে এলেম-কালাম, আদব-কায়দা শিক্ষা দিবে, এবং যত্নের সাথে প্রতিপালন করবে ও তাদের উপর অনুগ্রহ করবে, সে ব্যক্তির উপর অবশ্যই জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। উল্লেখিত বর্ণনা দ্বারা প্রমানিত হয় যে, কন্যা সন্তান আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ নেয়ামত। সুতারাং কন্যা সন্তানকে বেশী করে ভালবাসুন। আদর-সোহাগ করুন আর মায়া-মমতা দিয়ে লালন-পালন করুন। সে তো আপনার কলিজার টুকরার টুকরো, দেহের এক বিশেষ অংশ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর অসীম বানীর প্রতি লক্ষ্য রেখে কন্যা সন্তানকে পুত্রের চাইতে ও বেশী আদর যত্ন করুন। এখানে একটি বিষয় আলোচ্য হলো, কন্যা সন্তান আল্লাহ মহান প্রদত্ত নেয়ামত ঠিক কিন্তু পুত্র সন্তানও কিন্তু কোনো অংশে কম নয়। এই আলাচেনার উদ্দেশ্য হচ্ছে, কন্যা সন্তানের প্রতি বিরুপ মানসিকতা পরিহার করা। একমাত্র ছেলে সন্তানের কামনায় কন্যা সন্তানকে অবহেলার পাত্র না বনানো।
হযরত আনাস রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ دَخَلْتُ أَنَا وَهُوَ الجَنّةَ كَهَاتَيْنِ، وَأَشَارَ بِإصْبعَيْهِ. যে ব্যক্তি দুইজন কন্যা সন্তানকে লালনপালন ও দেখাশুনা করল [বিয়ের সময় হলে ভাল পাত্রের কাছে বিবাহ দিল] সে এবং আমি জান্নাতে এরূপ একসাথে প্রবেশ করব যেরূপ এ দুটি আঙুল। তিনি নিজের দুই আঙুল মিলিয়ে দেখালেন।
কন্যা সন্তান প্রতিপালনের তিনটি ফযীলত সকল ফযীলতের সারমর্ম হল তিনটি জিনিস। এক. আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। দুই. জান্নাত দান করবেন। যা নিআমত ও আরাম আয়েশের স্থান। তিন. আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী হওয়ার সৌভাগ্য দান করবেন। যা সফলতার সর্বোচ্চ চূড়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ তিনটি ফযীলত বর্ণনা করেছেন কন্যা সন্তান লালনপালনকারীদের জন্য।
কন্যা সন্তানের জন্মে অধিক আনন্দ প্রকাশ করা ইসলামের শিক্ষা হল, কন্যা সন্তান জন্ম নিলে আনন্দ প্রকাশ করা; তাইতো কন্যা জন্মের সংবাদকে ‘সুসংবাদ’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আর সুসংবাদ শুনে মানুষ আনন্দই প্রকাশ করে।
এজন্য অনেক উলামায়ে কেরাম লেখেন, যেহেতু কন্যা সন্তান জন্মানোর কারণে নিজেকে ছোট মনে করা, একে অপমান ও অসম্মানের কারণ মনে করা কাফিদের কর্মপন্থা, তাই মুসলমানগণের উচিত, তারা কন্যা সন্তানের জন্মের কারণে অধিক খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করবে।
যাতে কাফিরদের এ নিচু রীতির প্রতিবাদ হয় এবং এ রীতি যেন বিলুপ্ত হয়ে যায়। কন্যা সন্তানের হকসমূহ কন্যা সন্তানের লালনপালনের ফযীলত বর্ণনার পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা সন্তানের হকসমূহও বর্ণনা করেছেন। জাহেলী যুগে এ হকসমূহ থেকে কন্যা সন্তানকে বঞ্চিত করা হত। আজকালও তাদের হকসমূহ আদায়ের ব্যাপারে অবহেলা করা হয়। এজন্য তাদের হকগুলো বুঝে নেওয়া জরুরি। যেন এ ব্যাপারে আমাদের অবহেলা না হয়।
ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা কারো পুত্র সন্তানের প্রতি ভালবাসা বেশি আবার কারো কন্যা সন্তানের প্রতি। অধিকাংশ লোকের পুত্র সন্তানের তুলনায় কন্যা সন্তানের প্রতি ভালবাসা কম থাকে। ভালবাসা ও মহব্বতের সম্পর্ক হল অন্তরের সাথে। এতে মানুষের ইচ্ছার দখল নেই। এজন্য এ ক্ষেত্রে সমতা রক্ষার বিষয়ে মানুষ বাধ্যও নয়। তবে ভালবাসা প্রকাশ মানুষের ইচ্ছার অধীন। এ ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা আবশ্যক। অনেকে ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রেও কমবেশি করে। তারা ছেলেকে বেশি বেশি খাওয়ায়, বেশি বেশি ঘুরতে নিয়ে যায়। আর মেয়েকে জিজ্ঞাসাও করে না।
এভাবে সে মেয়ের সাথে ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে কমবেশি করে। যেহেতু ভালবাসা প্রকাশ করা মানুষের ইচ্ছাধীন বিষয় তাই এ ক্ষেত্রে কমবেশি করা অন্যায়। সুতরাং কখনো মা-বাবা কথায় ও কাজে এমন ভাব প্রকাশ করবে না, যাতে সন্তানরা বুঝতে পারে, মা-বাবা অমুককে বেশি ভালবাসেন, অমুককে কম ভালবাসেন। এমনটা করবে না। যদি মা-বাবা এমনটা করেন তাহলে তা হবে অন্যায় এবং কিয়ামতের দিন এর জন্য পাকড়াও করা হবে।
সন্তানদের দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা যেমনি ভালবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা উচিত তেমনি কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষার হুকুম রয়েছে। তাই মা-বাবা যদি তাদের জীবদ্দশায় সন্তানদের মাঝে টাকা-পয়সা, কাপড়-চোপড় অথবা খাদ্যবস্তু বণ্টন করেন তবে সে ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা জরুরি। মেয়েকেও সেই পরিমাণ দিবে, যে পরিমাণে ছেলেকে দিয়েছে। মা-বাবা যখন প্রয়োজনের বাইরে অথবা খুশি হয়ে সন্তানদের কিছু দিবে সে ক্ষেত্রেও এ সমতা রক্ষা করা আবশ্যক। যেমন, ঈদের সময় ঈদের বকশিশ অথবা সফর থেকে ফিরে এসে সন্তানদের হাদিয়া দেওয়া ইত্যাদি।
প্রয়োজনের বিষয়টি ভিন্ন কিন্তু বাবা-মা যদি প্রয়োজনে কোনো সন্তানের জন্য কিছু ব্যয় করেন যেমন, অসুস্থতার জন্য খরচ করছেন, কারো শিক্ষার জন্য অর্থ ব্যয় করছেন, ছেলে অথবা মেয়ে কেউ সফরে যাচ্ছে, কারো সফর ছোট কারো সফর বড়, কারো সফরে বেশি টাকার প্রয়োজন আবার কারো কম, এমনিভাবে প্রয়োজনের সময় সন্তানদের জন্য ব্যয়ের ক্ষেত্রে কমবেশি করার মধ্যে কোনো গোনাহ নেই। বরং যার যতটুকু প্রয়োজন তাকে ততটুকু দিতে পারবে।
বিয়ের কারণে মেয়ের হক শেষ হয়ে যায় না আমাদের সমাজের অবস্থা তো এমন যে, প্রথমত মেয়েদেরকে ধন-সম্পদ ও জায়গা-জমি দেওয়াই হয় না। আর যদি তাকে বলা হয়, তুমি তো সবকিছু ছেলেদেরকেই দিয়ে দিয়েছ, মেয়েদেরকে তো কিছুই দিলে না! উত্তরে বলা হয়, তাদের বিয়ে-শাদী তো দিয়েছি। মেয়ের বিয়েতে যে যৌতুক দিয়েছি তাতে তার হক আদায় হয়ে গেছে। (যৌতুক দেওয়া শরীয়তসম্মত নয়।) স্মরণ রাখুন! এটা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা।
যেমন মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দেওয়ার দ্বারা পিতার মীরাছ থেকে মেয়ের হক শেষ হয়ে যায় না তেমনি যৌতুক দেওয়ার কারণে মেয়েকে ধন-সম্পদ ও জায়গা-জমি থেকে বঞ্চিত করাও ঠিক নয়। পিতা যেমন মেয়ের বিয়েতে খরচ করে তেমনি ছেলের বিয়েতেও খরচ করে। বরং সাধারণত ছেলের বিয়েতে মেয়ের বিয়ের চেয়ে বেশি খরচ করা হয়। অথচ বিয়ে-শাদীর খরচের ক্ষেত্রেও সমতা রক্ষা করা উচিত। এর সহজ একটি পদ্ধতি হচ্ছে, আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় অর্থের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ঠিক করে নিবে যে, আমি আমার প্রত্যেক ছেলেমেয়ের বিয়েতে এ পরিমাণ টাকা ব্যয় করব। বিয়ের খরচাদি করার পরও যদি নির্ধারিত পরিমাণ থেকে কিছু টাকা বাকি থেকে যায় তবে তাকে দিয়ে দিবে।
এমনটি করবে না, এক সন্তানের বিয়েতে বেশি খরচ করবে আর অন্য সন্তানের বিয়েতে কম খরচ করবে। এটাও এক প্রকার অন্যায় ও নাইনসাফী। সারকথা পুরো আলোচনার সারমর্ম হচ্ছে :
এক. কন্যা সন্তান হলে পেরেশানি, রাগ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করা না জায়েয। এটা ইসলামী কর্মপন্থা নয়। ইসলাম এ বিষয়ের নিন্দা করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে এর ভ্রান্ততা সাব্যস্ত করেছেন। তাই মুসলমানদের এ ধরনের কর্মকা- থেকে বিরত থাকা উচিত। যখন কারো কন্যা সন্তান হয় তখন সে যেন ঐ রকম খুশিই প্রকাশ করে, যেমনটি ছেলে সন্তান হলে করা হয়।
দুই. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কন্যা সন্তান লালনপালনের যে ফযীলত ও সাওয়াবের উল্লেখ করেছেন এর উপর বিশ্বাস রাখবে এবং এর উপরই সন্তুষ্ট থাকবে। এ কথা ভাববে যে, এই এক মেয়েই আমার জান্নাতে যাওয়ার কারণ হতে পারে এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির কারণ হতে পারে। তাই পূর্ণ খুশি ও সন্তুষ্টির সাথে যেভাবে ছেলেদের লালনপালন করা হয় ঠিক সেভাবেই মেয়েদেরও লালনপালন করবে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
