শিশুদের মানসিক গঠনঃ আমাদের ভুল ও করণীয়

অনলাইন ডেস্ক

১৯৯৮ সালে ফুটবল নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে জগত বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় জিদান বলেছিলেন, খেলোয়াড় সৃষ্টি হয় না, খেলোয়াড়কে গড়ে তুলতে হয়। জিদানের কথায় আমরা দেখতে পাই, আজকে জন্ম নেওয়া শিশুটিকে আগামীদিনের সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজন সঠিক অভিভাবকত্বের। আশার কথা, শিশুদের মানস গঠনে অভিভাবক হিসেবে শিশুতোষ রচনায় এগিয়ে এসেছেন অনেকেই। এক্ষেত্রে পাঠক মনে ভেসে ওঠে যে নামগুলো- জসীম উদ্দিন, বন্দে আলী মিঞা, সুকুমার রায়, আল মাহমুদ, নজরুল ইসলাম এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

আবার অন্যদিকে শিশুতোষ রচনায় অনেকের নাম স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হয় না এমন একজন হলেন নীতিবাদী সাহিত্যিক মদনমোহন তর্কালঙ্কার। শিশুদের নিয়ে তার লেখা একটি ছড়া বাংলাদেশের ৮০% মানুষ জানে বললে ভুল হবে না। যেমন লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে, বড় যদি হতে চাও লেখাপড়া করে যাও। শিশুর উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ছড়া কণ্ঠস্থের মাধ্যমে আত্মস্থ করা শিশুরা ভবিষ্যৎ জাতিকে উপহার দিবে সুকুমার রায়ের দুটি শিং ওয়ালা হাট্টিমাটিম টিম নামক ডিম পাড়া অজানা-জন্তুকে।

এ ছাড়াও উল্লেখিত শিশুদের মানস গড়নের ছড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শোক দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, বেদনা, ক্লান্তির অনুভূতি বোঝার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে বা করতে পারে। এতকিছু জানার পরেও বাংলাদেশের ঘরে-ঘরে শিশুদের নিয়ে চলছে অভিভাবকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা। কার শিশু কতটি ‘অন্তঃসারশূন্য ছড়া’ বলতে পারে!

জিদানের ভাষায় বলতে হয়, আপনি আপনার শিশুদের গড়ে তুলছেন কীভাবে? রোবট নাকি মানুষ হিসেবে? অভিভাবক হিসেবে প্রশ্নটি থাকলো আপনার কাছে।
বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডায় লেখাপড়ার সাথে গাড়ীতে চড়ার সম্পর্ক নিয়ে আর একটু আলোকপাত করলে দেখা যাবে ব্যক্তি-সমাজ-রাষ্ট্র জীবনের বর্তমান প্রয়োজনীয়তা, রুট ক্যানেলের (দন্ত চিকিৎসকদের ভাষা)!

আজকের পাঠক, আপনার জন্য মদনমোহন তর্কালঙ্কার রচিত ছড়াটির অতি সংক্ষিপ্ত রূপকে উপস্থাপন করা যেতে পারে এভাবে- দুর্জন দুর্বৃত্তরা গাড়ি ঘোড়ায় চড়বে না। বাংলাদেশে দুর্জন দুর্বৃত্তরা গাড়ি ঘোড়ায় চড়ছে আর ধীমানেরা ওদের গাড়ীর নীচে চাপা পড়ছে- এই দৃষ্টান্ত কম নয়। বিচারের আশায় এই ধীমানদের ফিরে যেতে হয়, বহু সহস্রাধিক বছর আগে! এখানে খুব ছোট একটি উদাহরণের অবতারণা করা যেতে পারে।

দ্যা এজ অফ ইম্পায়ার্স- ধনীদের অধীনে পরিচালিত রাজ্য শাসন ব্যবস্থার যুগ। এই যুগে চিকিৎসকের সেবা গ্রহণ করার পরে যদি কোন ধনী গোষ্ঠীর রোগী মারা যেত, তখন সেই চিকিৎসকের হাত কেটে ফেলা হতো এবং ধনীদের অপরাধকে পরোক্ষভাবে দেখা হতো ছোট করে। আর পেশাজীবী ও দাসদের অপরাধকে দেখা হত খুব বড় চোখে।

ব্যবিলিয়নের ৬ষ্ঠ রাজা হাম্মুরাবি কোডের অন্তর্গত এই আইনগুলো অন্যরূপে কিংবা অন্যভাবে এখনো বাংলাদেশে প্রচলিত! চা-সিগারেট-পান-বিড়ি দোকানে আড্ডা দেবার মতো দেশ-বিদেশের সকল জায়গায় বাংলাদেশীরা বলে, বর্তমান আইনের শাসন দুটি গোষ্ঠীকে (আইন প্রণয়নকারী এবং আইন প্রয়োগকারী) রক্ষার জন্য। সত্যি কি তাই? তবে জানতে হবে পাঠক ভাই।

বর্তমান আইনের শাসন পরিচালনার নেপথ্যে কাজ করে কারা? অকাট মূর্খ ধনী গোষ্ঠী কিংবা পল্লবগ্রাহী ধীমান যারা। দেশের রাজনৈতিক পরিচয়ের চাদর পড়ে দুর্নীতি করেও সমাজে নমস্য ব্যক্তি তারা। সম্ভবত এদের কথা ভেবে জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন, পৃথিবীতে অল্পসংখ্যক লোক কবিতা বোঝে। এ জন্য পৃথিবীটা আজও অসুন্দরই থেকে গেল।

অন্যদিকে আজকের সমাজ, ভদ্রভাষার অপব্যবহার করে, ওই নমস্য ব্যক্তিদের বলে ‘দুর্নীতিবাজ’। বৃহৎ পরিসরে এবং বহুমাত্রিক হিসাব-নিকাশ করে এরা ২০০৫ সালে ছড়িয়েছে বোমাতংক, ২০০৯ সালে দুর্বল করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মনোবল, ২০১২ সালে সাধারণ মানুষকে বারণ করেছে বিশ্বজিত হতে, ২০১৪ সালে ধর্ষণকে রোমান্স হিসেবে দেখার জন্য মনে ঢুকিয়েছে আগুনে পোড়াতংক, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওপর পৃথিবীর সকল সচেতন মানুষের অর্থনৈতিক লেন-দেনের আস্থার ওপর ঢিল ছুঁড়েছে, ২০১৯ সালে মেধাবী-দেশপ্রেমিকদের মধ্যে ছড়িয়েছে হত্যাংক এবং ২০২০ সালে সিনহাকে হত্যার মাধ্যমে এরা কিছুটা প্রশমিত করতে পেরেছে ভয়ের সংস্কৃতি। তাই বন্ধুকযুদ্ধে মৃত্যুর খবর দৈনিক পত্রিকাগুলোতে আর নাই! অর্থাৎ এক কথায়, মূর্খ ধনী গোষ্ঠী এবং পল্লবগ্রাহী ধীমানেরা যৌথভাবে চৌর্যবৃত্তির মাধ্যমে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে বঙ্কিম চন্দ্রের বিখ্যাত উপন্যাস বিষবৃক্ষকে করেছে সমুদ্ভাসিত। আপনার মনে জন্ম নেয়া নতুন প্রশ্ন-দুর্নীতিবাজ নামক দেশের বড় চোররা কি করছে এখন?

দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করার নতুন কূট কৌশলের অংশ হিসেবে ‘অর্থনৈতিক কূটনীতির’ সম্মোহনীসুর বাজিয়েছে রাজ দরবারে। রাজাও সেই সুর শুনে হয়েছেন মুগ্ধ! দেশের রাজা হয়ত ভুলে যেতে পারেন, ওই দুর্নীতিবাজদের সম্মোহনীসুরের মাধ্যমেই বাইপোলার পৃথিবীর সমাপ্তি ঘটেছে অনেক আগে। করোনা মহামারির কারণে, ইউনিপোলার পৃথিবীও ভেঙ্গে গেছে। বর্তমান সভ্য জাতি তাই অর্থনৈতিক কূটনীতি নয় বরং ভূ-রাজনৈতিক কূটনীতিকে সামনে রেখে মাল্টিপোলার পৃথিবীর দিকে ধাবমান। এখন দেশের রাজা মানে আমাদের নরপতি, দেশের গন্তব্য খোঁজার জন্য, দুর্নীতিবাজ গোত্রের সদস্যদের দেখবেন কীভাবে?

সাধারণ জনগণ আশা করে, দেশের নরপতি নরসুন্দর ডেকে ওই দুর্নীতিবাজ নামক নরপিশাচ ও নরাধমদের মাথার চুল কেটে, ধিক্কার জানাবে ওদের চিহ্নিত বড় চোর হিসেবে। এই কাজটি দেশের নরপতি করে দেখাতে পারবেন কি? যদি তা পারেন তবেই ভালো। নতুবা দুর্নীতিবাজরা যে বড় চোর, এই মহা সত্য কথা অপ্রকাশ্য থেকে যাবে সমাজে। যেমন করে এক, অপ্রকাশ্য থেকে যায় জীবন চলার পথে অনেক সত্য কথা। দুই, সাহিত্য রচনায় যেমন করে উন্মোচিত হয় না অনেক সত্য ঘটনা।

তবে আমাদের বিশ্বাস, সত্য কখনই তার গন্তব্যের গতিপথ পরিবর্তন করে না বরং সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে পাখোয়াজ বাজিয়ে সাধুবাদ জানায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো সাহসী সেই মানুষদের; যারা সমাজের গভীরতর অসুখের মূলোৎপাটনে অগ্রণী ভূমিকা পালনে কখন কুণ্ঠাবোধ করে না। পরিশেষে প্রিয় পাঠক আপনাকে বলতে চাই, সমাজের গভীরতর অসুখের মূলে রয়েছে শিশুদের মানস গঠনে আমাদের ভুল। আমরা এখনও তাই খুঁজছি জীবনের কূল।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.