মোহাম্মদ ইলিয়াছ।।
করোনা ভাইরাস সমগ্র বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাল্টে দিয়েছে। আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশ প্রভাব পড়েছে। ১৬ মার্চ থেকে বন্ধ রয়েছে দেশের সকল ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বন্ধ হয়ে যায় পিএসসি, জেএসসি ও জেডিসি পরীক্ষা। সর্বশেষ বন্ধ হয়ে যায় এইচএসসি বা সমমানের পরীক্ষা। করোনা ভাইরাসের কারণে এবারের উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমানের পরীক্ষা হবে না বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রীর যুক্তি হলো করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে না। তবে পরীক্ষার্থীর ফলাফল জেএসসি ও এসএসসি এবং সমমানের পরীক্ষার ফলাফলের গড় ভিত্তিতে হবে বলে জানানো হয়। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ফল প্রকাশ করা হবে। কী পদ্ধতিতে গ্রেড নির্ধারণ করা হবে তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, শিক্ষাবোর্ড ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত টেকনিক্যাল ও পরামর্শক কমিটি কাজ করবে। আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করতে কমিটি কাজ করবে।
সরকারের এই সিদ্ধান্তে এইচএসসিতে যারাই ফরম পূরণ করেছে তারা সবাই পাশ করবে। কেউ ফেল করবে না। ২০১৯ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় যারা এক বা দুই কিংবা সব বিষয়ে ফেল করেছে তাদেরও একইভাবে মূল্যায়ন করে গ্রেড নির্ধারণ করা হবে। কেননা তারা সবাই জেএসসি ও এসএস্িস পরীক্ষায় পাশ করেছে। সুতরাং পাশের হার হবে শতভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবারে এইচএসসি বা সমমানের মোট পরীক্ষার্থী ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ জন। এর মধ্যে নিয়মিত পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৭৯ হাজার ১৭১ জন এবং অনিয়মিত ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫০১ জন। আগের বছর অকৃতকার্য হয়েছে ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৭ জন। এদের মধ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার এক বিষয়ে ফেল করা। ৫৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী দুই বিষয়ে এবং ৫১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী তিন বা ততোধিক বিষয়ে অকৃতকার্য।
কিন্তু তারা সবাই জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তারাও সবাই পাশ করবে। অনেকের প্রশ্ন উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠক্রমের ভিত্তিতে ফলাফল মূল্যায়ন হচ্ছে না। আগের দুই পরীক্ষার ভিত্তিতে ফলাফল মূল্যায়ন হলে শিক্ষার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব কিনা। অন্যদিকে আগের বছরগুলোতে ফেল করা শিক্ষার্থীরা গড় মূল্যায়নে উত্তীর্ণ হওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত হবে তাও ভাবার বিষয় রয়েছে। উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠক্রমের ভিত্তিতে মূল্যায়ন না হলে শিক্ষার কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন কতটুকু সম্ভব তাও ভাবার বিষয় । আবার অনেক শিক্ষার্থী এসএসসিতে কম জিপিএ পেয়েছে কিন্তু এইচএসসিতে ভাল ফলাফল করতে পারে তাদের অবস্থা কি হবে। সব কিছু বিবেচনা করে এইচএসসির ফলাফল মূল্যায়ন করা দরকার। ফলাফলে যেন মেধাবীরা মেধার স্থানে, কম মেধাবীরা কম মেধার স্থানে থাকে সেটি যেন মূল্যায়ন হয়।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল গড় করে এইচএসসির ফল নির্ধারণ করলে ভাল হবে। কিছুটা সমস্যা হবে বিষয়ভিত্তিক ফল মূল্যায়ন নিয়ে। আমার মতে এইচএসসির ফলাফল নির্ধারণে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলের গড় পদ্ধতি ঠিক আছে। তবে বিষয়ভিত্তিক নম্বর বন্টন কি রকম হবে তা ভাবার বিষয় রয়েছে। যদি বলি এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিষয়ের একজন শিক্ষার্থীর উচ্চতর গণিত বিষয়ের নম্বর বন্টন কি রকম হবে। এ ক্ষেত্রে আমার মতামত হচ্ছে জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার গণিত বিষয়ের নম্বরের গড় করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে এসএসসির উচ্চতর গণিতের নম্বর হিসাবে আনার প্রয়োজন নেই। শুধু মাত্র হিসাবে আনতে হবে জেএসসি ও এসএসসির সাধারণ গণিত বিষয়ের নম্বর। এভাবে জেএসসির বিজ্ঞান বিষয়ের নম্বরের সাথে এসএসসির বিজ্ঞান বিষয়েরর পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন বিদ্যা ও জীববিদ্যার বিষয়ের নম্বর গড় করে বিজ্ঞানের উক্ত তিন বিষয়ের নম্বর বন্টন করা যেতে পারে। জেএসসির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বিষয়ের নম্বরের সাথে মানবিক বিভাগের সমাজ বিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যুক্তি বিদ্যাা ও অর্থনীতি বিষয়ের নম্বর গড় করা যেতে পারে। অন্যান্য বিষয়গুলোকে অনুরুপ পদ্ধতিতে মূল্যায়ন করা যেতে পারে।
অস্বীকার করার উপায় নেই, করোনাকালীন সময়ে গ্রামের শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় তেমন অগ্রসর হতে পারেনি। শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইন ক্লাস বা অনলাইনে প্রাইভেট পড়ে অগ্রসর হয়েছে। গ্রামে এমন অনেক শিক্ষার্থী আছে শহরের শিক্ষার্থীর চেয়ে বহুগুণে মেধাবী। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রতি বিষয়ে অতিরিক্ত ১০টি নম্বর গড় নম্বরের সাথে যোগ করে জিপিএ করা যেতে পারে। অপর দিকে কলেজের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষদের কাছে শিক্ষার্থীর মেধা মূল্যায়নে ২০ নম্বর আহবান করা যেতে পারে। কোন শিক্ষার্থী কী রকম মেধাবী তা বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকরা ভাল জানেন। উক্ত শিক্ষকরা প্রতি বিষয়ে ২০ নম্বরের ভিত্তিতে মূল্যায়ন (পরীক্ষা ছাড়া) করে টেকনিক্যাল কমিটির কাছে নম্বর পাঠাতে পারেন। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার নম্বরের সাথে শিক্ষক মূল্যায়ন নম্বর যোগ করে ফলাফল নির্ধারণ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে ফলাফলে মেধার প্রভাব পড়তে পারে। টেকনিক্যাল কমিটি এসব বিষয় বিবেচনায় আনতে পারেন। আমরা যেভাবে ফলাফল নির্ধারণে যুক্তি উপস্থাপন করি না কেন আন্তর্জাতিক পদ্ধতি মেনে টেকনিক্যাল কমিটি ফলাফর নির্ধারণে কাজ করবেন এটাই যুক্তি। এটাই অভিভাবক সমাজ ও শিক্ষার্থীরা আশা করেন।
পরিশেষে বলব, কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে এবারের এইচএসসি পরীক্ষা সম্ভব হচ্ছে না বিধায় আন্তর্জাতিক পদ্ধতি মেনে ফলাফল নির্ধারণের দিকে বেশি জোর দিতে হবে। আন্তর্জাতিক পদ্ধতি মেনে ফলাফল নির্ধারিত হলে তা দেশে-বিদেশে প্রহণযোগ্যতা পাবে। মেধাবী শিক্ষার্থীদের যথাযথ মেধা মূল্যায়ন হবে। তখন কারো কিছু বলার থাকবে না।
লেখক: সহ: অধ্যাপক
আলহাজ্ব মোস্তফিজুর রহমান কলেজ, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
