কবে আমদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ডিজিটাল হবে ?

আমার লেখাটি একটা সুসংবাদ দিয়ে শুরু করছি তা হলো, গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখ হতে বিডিরেন (bdREN) প্লাটফর্মের আওতাধীন সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ফ্রি অনলাইন ক্লাস করার সুবিধা পাচ্ছে।

এ সুবিধা উপভোগ করার জন্য শিক্ষার্থীকে প্রতিমাসে ১০০ টাকা রিচার্জ করতে হবে (প্রথম মাস ব্যতিত) এবং সিমে ইন্টারনেট ব্যালেন্স থাকতে হবে। তবে মোবাইল রিচার্জকৃত ১০০ টাকা মূল ব্যালেন্সে যোগ হবে যা দিয়ে ভয়েস,ডাটা এবং অন্যান্য সার্ভিস ক্রয়ে ব্যবহার করা যাবে। খুব ভালো একটা উদ্দ্যোগ নেওয়ার জন্য ইউজিসি, বাংলাদেশ রিচার্স এন্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিরেন) এবং টেলিটক-কে ধন্যবাদ।

কিন্তু আসলেই কি বিনামূল্যে অনলাইন ক্লাস করতে পারছে শিক্ষার্থীরা?  আপানার কি মনে হয়? যেহেতু ইউজিসি, বাংলাদেশ রিচার্স এন্ড এডুকেশন নেটওয়ার্ক (বিডিরেন) এবং টেলিটক ফ্রি করে দিয়েছে তাহলে শিক্ষার্থীরা ফ্রি ক্লাস করতে পারছে হয়তো । কেনই পাববে না?

আশা করছি এই প্রশ্নের উত্তর একটু পর আপনি পেয়ে যাবেন। ফ্রি ক্লাসের সুবিধা তখনি শিক্ষার্থী পাবে যখন ক্লাসটি কোন শিক্ষক বিডিরেন প্লাটফর্মের আওতায় জুমে ক্লাস নিবেন। যদি কোন শিক্ষক তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট  থেকে ক্লাস নেন তবে কিন্তু উক্ত ক্লাসটি শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে করতে পারবে না, অবশ্যই ডাটা খরচ করতে হবে। এবার তাহলে বলি শিক্ষকেরা কিভাবে বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার করবেন । বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার জন্য তারা vsession.bdren.net.bd গিয়ে একটা প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইল ব্যবহার করে রেজিষ্ট্রেশন করে খুব সহজেই বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবেন । যেহেতু শিক্ষকদের নিজ উদ্দ্যোগে রেজিষ্ট্রেশন করতে হচ্ছে বা এমনকি অনেক শিক্ষক এ বিষয়ে অবগত না থাকায় খুব কম সংখ্যক শিক্ষক উক্ত সুবিধা নিতে পাচ্ছেন।

zoom.bdren.net.bd এর তথ্য মতে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়” সব চেয়ে বেশি ক্লাস নিয়েছেন (০৩-১০-২০২০)। এ তালিকায় যথাক্রমে রয়েছেন বুয়েট, এমআইএসটি, শাবিপ্রবি, ইউ আই ইউ, বি ইউ পি, ডুয়েট,খুবি,কুয়েট, রুয়েট,নোবিপ্রবি,আইসিএমএবি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ, বিআইসিএম, গ্রীন ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, যবিপ্রবি সহ ৩৫ টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিক্যাল কলেজ। তালিকায় অনুযায়ী ৩৫ টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে “মেডিকেয়ার ২৪ বিডি প্রজেক্ট এ ইউ এস” সবচেয়ে কম ক্লাস নিয়েছে তারা ১.১৬২ ঘন্টা ক্লাস নিয়েছেন। বাকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাদের নাম নেই তারা ১.১৬২ ঘন্টার কম ক্লাস নিয়েছেন অথবা আদৌ ক্লাস নেননি।

যে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম তালিকায় নেই তাদের কথা বাদ দিলাম। যদিও তাদের লিস্ট অনেক বড়(১১২ টি প্রতিষ্ঠান – তথ্যসুত্রঃ zoom.bdren.net.bd)। এবার কথা বলতে চাচ্ছি তালিকায় শীর্ষে থাকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বিডিরেনের তথ্য মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮১৯ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা মোট ২৭০২০ টি ক্লাস নিয়েছেন। বাংলা উইকিপিডিয়া মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষায়তনিক ব্যক্তিবর্গের (শিক্ষক শিক্ষিকা) সংখ্যা ১৮১৭ জন। এর মানে কি হচ্ছে ১৮১৭ জনের মধ্যে ৮১৯ জন (শতকরা ৪৫ জন) বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার করছেন। বাকি শিক্ষক শিক্ষিকারা হয়তো ক্লাস নিচ্ছেন ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে অথবা ক্লাস নিচ্ছেন না।

এই যদি হয় তালিকায় শীর্ষে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তাহলে আন্দাজ করেন বাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কি অবস্থা! যাইহোক একটা বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে এটা যাচাই করা ঠিক হবে না, তাই তালিকায় থাকা দ্বিতীয় বিশ্ববিদ্যালয় “বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)” এর তথ্য দেখাযাক বিডিরেনের তথ্য মতে, বুয়েটের ৪২৭ জনশিক্ষক-শিক্ষিকা মোট ১৫৭৪৯ টি ক্লাস নিয়েছেন। বাংলা উইকিপিডিয়া মতে বুয়েটে শিক্ষায়তনিক ব্যক্তিবর্গের (শিক্ষক শিক্ষিকা) সংখ্যা ৬২৪ জন। এর মানে কি হচ্ছে ৬২৪ জনের মধ্যে ৪২৭ জন (শতকরা ৬৮.৪৩ জন) বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার করছেন।

যা আমার কাছে মোটেও সন্তেসজনক মনে হয়নি। প্রযুক্তিতে এগিয়ে থাকা শাবিপ্রবি দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ৪৮৭ জন শিক্ষক শিক্ষিকার মধ্যে মাত্র ২৯১ (শতকরা ৫৯.৭৫) জন শিক্ষক শিক্ষিকা বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে ক্লাস
নিচ্ছেন। তালিকায় থাকা ৩৫টি প্রতিষ্ঠানের মোট শিক্ষকদের শতকরা ১৫-১৮ জন শিক্ষক শিক্ষিকারা বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার করছেন, যে ক্লাসগুলো শিক্ষার্থীরা বিনামূল্যে করতে পারছে। এটা ছিল শুধু তালিকায় থাকা ৩৫ টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদেরসংখ্যা এবং বিডিরেন প্লাটফর্ম ইউজার সংখ্যার অনুপাত।

বিডিরেন মোট ১৪৭টি প্রতিষ্ঠানকে ফ্রিতে জুম ব্যবহার করার অনুমতি দিয়ে থাকলেও ১১২টি প্রতিষ্ঠান কিন্তু বিডিরেন প্লাটফর্ম ব্যবহার করছেন না। যদি আমরা ১৪৭ টি প্রতিষ্ঠানে মোট শিক্ষক ও বিডিরেন প্লাটফর্ম ইউজার সংখ্যার অনুপাত হিসাব করে তবে ০.৫% – ১% শিক্ষক শিক্ষিকারা বিডিরেন প্লাটফর্মের জুম ব্যবহার করে ক্লাস নিচ্ছেন। বাকী ৯৯% শিক্ষক শিক্ষিকারা বিডিরেন প্লাটফর্মের জুম ব্যবহার না করায় শিক্ষার্থীদের ৯৯% ক্লাস করতে ডাটা ব্যবহার হচ্ছে।

বিনামূল্যে অনলাইন ক্লাসের সুবিধা থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যদি এমন খারাপ অবস্থা হয় তবে প্রাথমিক,মাধ্যমিক পর্যায়ে কেমন অবস্থা হবে তা নিয়ে চিন্তা করা বোকামি ছাড়া কিছুই না। যদি করোনা পরিস্থিতি উন্নতি
না হয় তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অবশ্য অনলাইনে ক্লাস চালিয়ে যেতে হবে এবং প্রত্যেক শিক্ষকে বিডিরেনের আওতায় জুম ব্যবহার করতে হবে।

শুধু “বিনামূল্যে অনলাইনে ক্লাসে সুযোগ পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা” এটা পত্রিকায় ছাপালে বা বিজ্ঞাপন করলে দিবাস্বপ্নে আমরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশ দেখবো কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। যদি বাস্তবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে চাই তবে অবশ্যই প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ডিজিটাল হতে হবে। আমরা কতটা ডিজিটাল হয়েছি তা উপরের ফ্রি অনলাইন ক্লাসের আলোচনা বুঝতে পারছি।

লেখক- মোঃ নাজমুল ইসলাম, শিক্ষার্থী বশেমুরবিপ্রবি


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.