কমে গেছে পূজামণ্ডপের সংখ্যা কমে গেছে প্রতিমা তৈরির মজুরিও

নিউজ ডেস্ক।।

রমনা কালীমন্দিরের প্রতিমা তৈরি করছেন গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার রতন পাল। অন্য বছর তিনি ১৮ থেকে ২০টি প্রতিমা তৈরি করলেও এবার করেছেন মাত্র ১২টি। সবচেয়ে বেশি আড়াই লাখ টাকা দিয়ে প্রতিমা তৈরি করে কলাবাগান পূজা কমিটি। এবার সেখানে পূজা হচ্ছে না। আবার যে প্রতিমাগুলো তিনি তৈরি করছেন, সেখানেও বাজেটে কাটছাঁট। তাই উপার্জন কমে গেছে অনেক। সঙ্গে আলাপকালে রতন পাল বলেন, সব মন্দিরেই বাজেট এবার কম। জগন্নাথ হলের প্রতিমাও তিনিই তৈরি করেন। সবাই প্রতিমার দাম যেমন কম দিচ্ছেন, পাশাপাশি পূজার আয়োজনেও নেই কোনো বাড়াবাড়ি।

হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উতসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হবে আগামী ২২ অক্টোবর। ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এবার শুধু মন্দির প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ থাকবে পূজা। চলমান করোনা মহামারির কারণেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জি। তিনি   বলেন, ‘এবার আমরা বলে দিয়েছি, আলোকসজ্জা, মেলা, আরতি প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান না করতে। পাশাপাশি সড়ক বন্ধ করে যে অস্থায়ী মণ্ডপ তৈরি হয়, সেগুলোও এবার না করতে বলেছি। কারণ মানুষের জীবন বাঁচলে সামনের বছর ধুমধাম করে পূজা করা যাবে।’

গত ১৭ সেপ্টেম্বর মহালয়ার মধ্য দিয়ে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়ে গেছে। নির্মল চ্যাটার্জি বলেন, ‘এবারের দুর্গোত্সবের অনুষ্ঠানমালা পূজা-অর্চনার মাধ্যমে মন্দির প্রাঙ্গণেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে পূজা করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের অনুমতি নিতে হবে।’ তিনি বলেন, এবার ঢাকা শহরে ২৩২টি পূজা হচ্ছে। গত বছর ছিল ২৩৭টি। আর সারা দেশে এবার ৩১ হাজারের মতো পূজা হচ্ছে, যেটা গত বছর ছিল ৩২ হাজারের মতো। সব মিলিয়ে এবার ১ হাজারের মতো পূজা কম হচ্ছে। যদিও পুলিশের হিসাবে এই সংখ্যা ২ হাজারের মতো হতে পারে বলে জানান তিনি।

তাঁতীবাজারে প্রতিমা তৈরি করছেন বলাই পাল। তিনিও বলেন, ‘এবার প্রতিমার সংখ্যা অনেক কম। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, আগে যেখানে একটি প্রতিমা তৈরি করে ১ লাখ টাকা পাওয়া যেত, এবার সেখানে দিচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টাকা। সার্বিক পূজার আয়োজনেই এবার বাজেট কম রাখা হয়েছে। সারা বছর আমরা এই সময়টার জন্য অপেক্ষা করি। করোনার কারণে আমাদের সব প্রতিমাশিল্পীকেই কম বাজেটে প্রতিমা করতে হচ্ছে। এতে করে আমাদের ওপর যারা নির্ভর করে থাকেন, সবাইকে কষ্টে দিন পার করতে হবে।’

আগামী ২৬ অক্টোবর মহাদশমীতে বিসর্জনে শেষ হবে দুর্গোত্সবের আনুষ্ঠানিকতা। এবার প্রতিমা বিসর্জনে কোনো ধরনের শোভাযাত্রা হবে না বলেও জানিয়ে দিয়েছেন হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতারা। প্রতিমাশিল্পীদের এই দুর্দিন শুধু ঢাকায় নয়, সারা দেশেই। রাজশাহীর আলুপট্টির কুমারপাড়া এলাকার প্রতিমা তৈরি করছেন কার্তিক চন্দ্র পাল। তিনি বলেন, ‘এক মাস আগেই প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেছি। এখন পর্যন্ত ১২টি প্রতিমা তৈরি করেছি। তবে অর্ডার পেয়েছি চারটির। কেউ দাম বলতে চায় না। সবাই বলে, করোনার কারণে টাকা নেই। এ বছর ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার ওপরে কেউ দাম বলে না। মনে হচ্ছে খরচের টাকাই উঠবে না।’

চট্টগ্রাম মৃিশল্পী সমিতির সভাপতি রতন পাল বলেন, ‘প্রতিটি পূজা কমিটি তাদের খরচ কমিয়ে ফেলেছে। কিন্তু প্রতিমা তৈরির সরঞ্জামের দাম তো বেড়েছে। প্রতি বছর দুর্গাপূজা ঘিরে আমাদের আয়ের যে সম্ভাবনা থাকে, এবার সেটা নষ্ট হয়ে গেছে।’ রোজগার কম হলেও পূজার আয়োজন হচ্ছে বলে মৃিশল্পীরা বেঁচে থাকার অবলম্বনটুকু পাচ্ছেন বলে মন্তব্য তার। এটুকু না হলে হয়তো বেঁচে থাকাটাই কঠিন হতো।

চট্টগ্রাম উত্তর জেলা পূজা উদ্যাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিখিল কুমার নাথ জানিয়েছেন, মহামারির কারণে মানুষের আর্থিক অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। আগের মতো খরচ করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি জনসমাগম নিয়ন্ত্রণের জন্য পূজার আয়োজন করা হচ্ছে সীমিত আকারে। সে কারণে মণ্ডপের বাজেটও কমিয়ে আনা হয়েছে।

এদিকে বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ পূজাসংক্রান্ত ২৬ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মানার পাশাপাশি প্রতিটি মন্দিরের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মন্দিরের সবাইকে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রবেশ এবং বাইরে যাওয়ার পৃথক ব্যবস্থাও রাখতে বলা হয়েছে। কোনো ধরনের পটকা বা বাজি ফোটানো যাবে না। উচ্চ স্বরে সংগীত বাজানো যাবে না। মন্দিরে সব ধরনের সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, আরতি প্রতিযোগিতা, মেলার আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ সব ধরনের অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.