আত্তীকরণের নামে নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্য

নিউজ ডেস্ক।।

সুন্দরবন গ্যাস কোম্পনিতে (এসজিসিএল) আত্তীকরণের নামে নিয়োগ ও পদোন্নতি বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। এতে কোম্পানির স্থায়ী কর্মীরা পদোন্নতিবঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট কাজের যোগ্যতা না থাকায় আত্তীকৃত অনেকে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। এসজিসিএলের আত্তীকরণ নিয়ে আদালতে দুটি রিটের কার্যক্রম চলমান থাকলেও নিয়োগ ও পদোন্নতি বন্ধ নেই। জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

এসজিসিএলের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তেকাছে অভিযোগ করেন, কোম্পানির দুর্নীতিবাজ চক্র অর্থের বিনিময়ে প্রেষণে আসা কর্মকর্তাদের আত্তীকরণ করে তাদের বঞ্চিত করছেন। তারা বলেন, আত্তীকরণ হওয়া কর্মকর্তাদের অনেকেরই সংশ্লিষ্ট কাজের দক্ষতা নেই। ছয়জন কর্মকর্তা মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি থেকে এসেছেন। গ্যাস বিপণন কাজে এদের পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় আত্তীকরণ পরবর্তীতে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না। তারা আরও বলেন, সুন্দরবন কোম্পানি নতুন। শুরু থেকে তারা কম সুযোগ নিয়ে কাজ করে আসছেন। পেট্রোবাংলার অন্য কোম্পানিতে কর্মরত তাদের সমমানের কর্মকর্তারা বছরে অনেক ভাতা ও বোনাস পান। অন্য কোম্পানি থেকে লোক এনে মাথার ওপর বসিয়ে দেওয়ায় তাদের পদোন্নতির সুযোগ কমে গেছে। ফলে তারা সব দিক দিয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, অন্য কোম্পানিতে যেসব কর্মকর্তার পদোন্নতির সুযোগ কম, তারাই অর্থের বিনিময়ে এসজিসিএলে আত্তীকরণের মাধ্যমে পদোন্নতি বাগিয়ে নিচ্ছেন।

খুলনা, বরিশাল বিভাগসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলায় গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে এই সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি। বর্তমানে শুধু ভোলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র, আবাসিক ও বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস সরবরাহ করছে এসজিসিএল। এ ছাড়া কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ করছে কোম্পানিটি।

আত্তীকরণ বাণিজ্য :পেট্রোবাংলার অধীন বিভিন্ন কোম্পানির আট কর্মকর্তা ২০১৯ সালের সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিতে আত্তীকরণ হন। এ কর্মকর্তাদের প্রত্যেকেই আত্তীকরণের আগে বিভিন্ন সময়ে সুন্দরবন গ্যাসে প্রেষণে বদলি হয়ে আসেন। এই আত্তীকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ২৭ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেনের একটি খসড়া হিসাব সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। অবশ্য সংশ্নিষ্টরা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

জিটিসিএলের এক কর্মকর্তাকে এসজিসিএলে ব্যবস্থাপক (অর্থ ক্যাডার) পদে আত্তীকরণে টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই কর্মকর্তা ইতোমধ্যে উপমহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। এই কর্মকর্তার সঙ্গে আরও তিন কর্মকর্তাকে ২০১৯ সালে বোর্ডের অনুমোদন নিয়ে আত্তীকরণ করা হয়।

এই আত্তীকরণের বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে কোম্পানির সাত কর্মকর্তা গত বছর আদালতে রিট (নং-৯৬১/২০১৯) করেন। তখন এই আত্তীকরণ কেন অবৈধ হবে না সে বিষয়ে আদালত রুল জারি করেন। এ মামলা এখনও চলমান। এসব নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক তদন্ত করছে।

এসব নিয়োগের সময় দায়িত্ব পালনকারী এসজিসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশতাক আহমদ বলেন, ‘বিধি মেনেই সব নিয়োগ-পদোন্নতি সম্পন্ন হয়েছে। কোনো অনিয়ম হয়নি।’

সরাসরি নিয়োগ বন্ধ :সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানিতে ২০১৬ সালে উপব্যবস্থাপক ও ব্যবস্থাপক পদে কিছু সংখ্যক জনবল নিয়োগের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন গ্রহণ করা হয়। পরে নিয়োগ কার্যক্রম শেষ করা হয়নি। মূলত আত্তীকরণ চালু রাখতেই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া আত্তীকৃত কর্মকর্তারা নিজেদের পদোন্নতির পথ ঝামেলামুক্ত রাখতে ২০১৮ সালে চাকরি প্রবিধানমালার তফসিল সংশোধন করে উচ্চতর পদে সরাসরি পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগর পথ বন্ধ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সুবিধাবঞ্চিত কর্মকর্তারা।

আত্তীকরণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন :আত্তীকরণের বিষয়ে চাকরির বিধিমালা নিয়ে কাজ করেন এমন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কোনো কারণে পদ বিলুপ্ত হলে বা জনবল কাঠামো যৌক্তিকীকরণের ফলে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী উদ্বৃত্ত হলে তাদের সমধর্মী প্রতিষ্ঠানে আত্তীকরণের নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। পেট্রোবাংলার অধীন কোম্পানিগুলোতে যে প্রক্রিয়াকে আত্তীকরণ বলা হচ্ছে, তা প্রকৃতপক্ষে আত্তীকরণ নয়। বাংলাদেশের অন্য খাতে এমন আত্তীকরণের নজির নেই।

সংশ্নিষ্টরা আরও জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গত জুন মাসের পত্র মতে, সরকারি দপ্তর/সংস্থার জন্য মডেল নিয়োগবিধিতে নিয়োগের তিনটি পদ্ধতি- সরাসরি, পদোন্নতি ও প্রেষণ। এখানে আত্তীকরণ অন্তর্ভুক্ত নেই। খোদ পেট্রোবাংলার সার্ভিস রুলে আত্তীকরণের সুযোগ নেই। তবে অধীন কোম্পানিগুলোর সার্ভিস রুলে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে আত্তীকরণের সুযোগ রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেছেন। এ ছাড়া কোম্পানিগুলোর সার্ভিস রুলে আত্তীকরণের কথা বলা থাকলেও তফসিল অংশে নিয়োগের পদ্ধতি হিসেবে আত্তীকরণ রাখা হয়নি।

আত্তীকরণের নিয়ে জানার চেষ্টা করা হলেও পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এবিএম আব্দুল ফাত্তাহর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পেট্রোবাংলার পরিচালক (প্রশাসন) নাজমুল আহসান এ বিষয়ে বলেন, নতুন কোম্পানি হলে দক্ষ লোকবল নিয়োগে আত্তীকরণ পদ্ধতিটি কার্যকর। কারণ এসব পদে চাইলেই কাউকে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয়। তবে সংশ্নিষ্টরা বলছেন, প্রেষণে নিয়োগের সুযোগ থাকায় আত্তীকরণের যৌক্তিকতা নেই।

এসজিসিএল বোর্ড চেয়ারম্যান ও জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব গুলনার নাজমুন নাহার এ বিষয়ে বলেন, বিধিতে যা রয়েছে সে অনুসারেই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর বেশি মন্তব্য করতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। সুত্র সমকাল


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.