মোঃ মোজাহিদুর রহমান।।
প্রথমেই গভীর শ্রদ্ধায়, সম্মানে আর ভালোবাসায় স্মরণ করছি মহাত্মা শ্রী ব্রজলাল শাস্ত্রী মহাশয়কে।১৯০২ সাল। ব্রিটিশ শাসন। ব্রজলাল শাস্ত্রী মহাশয় কলকাতার কোর্টে ওকালতি করেন। কলকাতার বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান “হিন্দু কলেজ” তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং আধুনিকতার আলো ছড়াচ্ছে।
কলকাতার হিন্দু কলেজের আদলে দৌলতপুরের ভৈরব নদীর পাড়ে স্বাস্থ্যকর স্থানে গড়ে তুলেছিলেন তার স্বপ্নের “হিন্দু একাডেমী”। হিন্দু একাডেমী যাত্রাপথে একদিন হয়ে গেল দৌলতপুর কলেজ বা ব্রজলাল কলেজ বা বিএল কলেজ।
এ পর্যায়ে আমরা গভীর সম্মানে আর ভালোবাসায় স্মরণ করছি উপ-মহাদেশের একজন বিখ্যাত দানবীর হাজী মুহাম্মদ মহসিন মহোদয়কে।হাজী মহসিন ট্রাস্টের জমি সংযুক্ত হলো হিন্দু একাডেমির সাথে; যার ফলে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি আকারে যেমন বৃহৎ হল, একইসাথে তার অন্তর বিকশিত হলো পূর্ণাঙ্গভাবে।
১৯০২ সাল থেকে ২০২০. গত ১১৮ বছরে ভৈরব নদীর পানি গড়িয়েছে অনেক। হিমালয় আর অল্পসের পানি কত গড়িয়েছে, সে কথা শুধু সময় বলতে পারবে।
এই দীর্ঘ সময়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক পরিবর্তন করেছে শত ভাগের বেশি।
বিজ্ঞান পৃথিবীর সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে নতুন এক সমাজব্যবস্থা আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে।
শিক্ষাব্যবস্থা নতুন থেকে নতুন রূপে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছে।
সূর্যকে গুণে গুণে ১১৮ বার প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী।
এই সুদীর্ঘ সময়ে একটি জিনিস শুধু পাল্টায়নি। সরকারি বি এল কলেজ আজো বাংলাদেশের দক্ষিণ উপত্যকার মানুষের প্রতিটি ঘরে ঘরে শিক্ষার আলো বিতরণ করে যাচ্ছে।
কোন সন্দেহ নেই, এই দীর্ঘ সময়ে পৃথিবী সম্মুখীন হয়েছে প্রথম মহাযুদ্ধ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ ,অর্থনৈতিক মন্দা, দেশে দেশে উপনিবেশিক শাসন, আবার সেখান থেকে শাসন-শোষণ ভেঙে বেরিয়ে এসেছে জাতীয়তাবাদী চেতনার রাষ্ট্রগুলো… এ দীর্ঘ সময়ে বিজ্ঞান অনেক অসাধারণ অভিযাত্রা উপস্থাপন করেছে।
ব্রিটিশ উপনিবেশের যাঁতাকল থেকে যেসব তরুণেরা নতুন দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতো, একদিন তাদের আশ্রয় দিয়েছে বিএল কলেজ।
ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন, পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, শিক্ষার জন্য আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে বিএল কলেজ পালন করেছে অনন্যসাধারণ ভূমিকা।
বিএল কলেজের মাতৃক্রোড়ে আশ্রয় পেয়েছে কত মেধাবী তরুণেরা, যারা সীমাহীন দারিদ্রতা এবং অসংখ্য সামাজিক বাধা অতিক্রম করে নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পেরেছে। তারা নিজেদের যেমন আলোকিত করেছে, সমাজ এবং সভ্যতাকেও আলোকিত করেছে।
এই বিশেষ দিনে, প্রাচীন জনপদ দৌলতপুর- খুলনা অঞ্চলের মানুষের রুচি এবং সংস্কৃতির প্রশংসা করছি। অসংখ্য শিক্ষার্থী তাদের লেখাপড়া এবং অন্যান্য খরচ জোগাড় করেছে মানুষদের বাসায় “টিউশন” করে।এই অঞ্চলের মানুষের এই সুমহান উদারতার কথা ইতিহাসে লেখা থাকবে।
বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের ঘরে ঘরে শিক্ষা আর সংস্কৃতির আলো পৌছে দেবার দায়িত্ব পড়েছিল বিএল কলেজ এর উপর; আমরা আনন্দের সাথেই বলতে পারি যে, এই মহান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি সে দায়িত্ব পালন করে চলেছে অনন্য রূপে।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র রাজনীতি তৈরি করেছে বিপুলসংখ্যক সামাজিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব। যে বিপুল সংখ্যক নেতৃত্ব এখান থেকে বেরিয়ে এসেছে, তারাই কিন্তু একদিন ভাষা আন্দোলনে স্লোগান তুলেছিল, একাত্তরের মুক্তি সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল। আজও তারা এই মহান সমাজ এবং দেশকে গড়ে তোলায় ভূমিকা পালন করছে।
আমাদের বলতে ইচ্ছে করছে, পৃথিবীতে যতগুলো দেশ আছে, সম্ভবত সর্বত্রই বিএল কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা, মনন, নেতৃত্ব এবং শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন।
আজ গভীর সম্মানের সাথে স্মরণ করছি, বিএল কলেজের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যারা শিক্ষক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে তাদের।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি নিজস্ব সংস্কৃতি আছে।এখানে যারা শিক্ষক হিসেবে কাজ করতে আসেন, তারা সেই সংস্কৃতির মধ্যেই নিজেদের আলোকিত করেন এবং শিক্ষার্থীদের আলোকিত করেন।কত সংখ্যক তারকা শিক্ষক এসব শিক্ষার্থীর মনোলোকে আলো ছড়িয়েছেন, তার হিসাব করা সত্যিই মুশকিল।তথাপি, সেইসব মহান শিক্ষকেরাই বিএল কলেজকে একটি “ব্রান্ড” হিসেবে গড়ে উঠতে সাহায্য করেছেন।
এই দীর্ঘ যাত্রায় আরো অসংখ্য মানুষের অবদান সংযুক্ত হয়েছে বিএল কলেজের বিকাশে। আজ সবার অবদানকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি।
বিএল কলেজের জয় হোক। শতক ছাড়িয়ে হাজার বছরের পথে বিএল কলেজের যাত্রা শুভ হোক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
