বিশ্বজুড়ে কোভিড–১৯ সংক্রমণে বাংলাদেশ হয়ে পড়ে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপের মতো। বিদেশে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে দেশে। তা নিতে গিয়ে যঁাদের পক্ষে সম্ভব প্রায় ক্ষেত্রে তঁাদের প্রথম পছন্দ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ বা ইংরেজিতে কম্বাইন্ড মিলিটারি হসপিটাল)। হাসপাতালটির মূলত সামরিক বাহিনীর লোকদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা। তবে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে রাষ্ট্রপতি, সরকারপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী অধিকারবলেই এর সুবিধা পান। সংশ্লিষ্টতার জন্য সুবিধার আওতায় আসেন আরও কিছু বেসামরিক কর্মকর্তা- কর্মচারী। কিন্তু দল বেঁধে সেদিকে ছুটতে চাইছেন অনেকেই। এটাকে বিস্ময়কর বলা যাবে না। সেখানে চিকিৎসা ও সেবা পাওয়ার সুব্যবস্থা রয়েছে। এসব সুবিধা বেসামরিক হাসপাতালেও থাকার কথা। বিশেষজ্ঞ ও দক্ষ চিকিৎসকের ঘাটতি অন্তত বড় হাসপাতালগুলোতে নেই। কিন্তু এসব হাসপাতাল যে সমন্বয় সংকটে ভুগছে, তা নেই সিএমএইচে। যন্ত্রপাতিগুলো সচল রাখা রয়েছে সেখানে। সরকারি হাসপাতালগুলোর বেশ কিছু যন্ত্রপাতি অকেজো থাকে। ফলে বিঘ্নিত হয় চিকিৎসাসেবা। মানুষের চাহিদা ও প্রত্যাশা বিবেচনা করে মাত্র কয়েক দিন আগে অন্তত ১০টি সিএমএইচ মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন সর্বজনশ্রদ্ধেয় অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান।আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার পেছনে রাষ্ট্রীয় সামর্থ্যের যতটা সম্ভব বিনিয়োগ হচ্ছে। আগে ব্যাপ্তি সীমিত থাকলেও স্বাধীনতার পর থেকে হচ্ছে এর ক্রমসম্প্রসারণ। উপজেলার নিচের স্তরে গ্রাম পর্যায়েও সম্প্রসারিত হয়েছে এ সেবা। স্নাতক ডিগ্রিধারীরা রয়েছেন এগুলোর দায়িত্বে। এর ওপরে আছে ৩৬টি সরকারি ও ৭০টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ। সামরিক বাহিনীর পরিচালিত ৬টি মেডিকেল কলেজও শিক্ষাদান করছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও সিলেটে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ শুরু হয়েছে। খুলনায় শুরু হওয়ার পথে। রয়েছে ১৭টি বিশেষায়িত ইনস্টিটিউট। মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও ইনস্টিটিউটগুলোতে ব্যাপক সংখ্যক স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী চিকিৎসক পাঠদানের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। এ ছাড়া সরকারের অনুদানপুষ্ট বারডেম ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের মতো বেসরকারি হাসপাতালও রয়েছে। তা ছাড়া দেশের প্রায় সব স্থানেই বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের ছড়াছড়ি। এর কয়েকটি যথেষ্ট মানসম্পন্ন বলে দাবি করা হয়। তবে এসব স্থানে চিকিৎসা নিতে ব্যয় করতে হয় প্রচুর টাকা। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সেবা পেতেও ভোগান্তির নেই শেষ। অন্যদিকে রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ও ধনিকশ্রেণি সাধারণত বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। সরকারি হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে একটি দালাল চক্র কাজ করে যাচ্ছে। তারা এসব হাসপাতালের বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা আরও ব্যাহত হোক সেদিকে সচেষ্ট থাকে। অন্যদিকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে রোগী বা তার সহগামীদের সরাসরি প্ররোচিত করে। পাড়া-মহল্লার ওষুধের দোকানগুলোতে বসা হাতুড়ে ডাক্তারদের কেউ কেউ এ প্ররোচনার কাজে নিয়োজিত থাকেন। সরকারি হাসপাতালগুলোর অব্যবস্থাও ঢেকে রাখার মতো কিছু নয়।
তাহলে বেসামরিক চিকিৎসাসেবা খাতে সরকারের বিশাল বিনিয়োগ যাচ্ছে কোথায়? বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সাবেক পিজি হাসপাতাল) তো নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সের আদলে একটি প্রতিষ্ঠান গড়তেই স্থাপন করা হয়েছিল। আশপাশের অনেক প্রতিষ্ঠানের জমি ও স্থাপনা তাদের চাই। দেওয়াও হচ্ছে। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠানের মানের ধারেকাছেও কি আমরা যেতে পেরেছি। সুদূর মফস্বলে ব্যত্যয় থাকলেও সরকারি চিকিৎসকের অভাব রাজধানী কেন, দেশের জেলা শহরগুলোতেও নেই। তবে ক্ষেত্রবিশেষে তঁাদের সঙ্গে মিল রেখে নার্স, টেকনিশিয়ানসহ অন্যান্য কর্মচারীর সামঞ্জস্য নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থাপিত যন্ত্রপাতির অনেকগুলো প্রায়ই অকেজো থাকে। পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ছুটতে হয় বেসরকারি ল্যাবরেটরিতে। সরকার থেকে দেওয়া ওষুধের বেশ কিছু হয়ে যায় পাচার। এর জন্য সব ক্ষেত্রেই ডাক্তাররা দায়ী নন। এসব হাসপাতাল ঘিরে কিছু কর্মচারীর শক্তিশালী অশুভ চক্র গড়ে উঠেছে। যাঁরা মূল দায়িত্বে আছেন, তঁারা হয়তোবা করেন এঁদের সহায়তা অথবা থাকেন নীরব। তবে রয়েছেন সক্রিয় প্রতিবাদকারী। সফলও হয়েছেন ক্ষেত্রবিশেষে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সদ্য বিদায়ী পরিচালক (সামরিক বাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) তাঁর সৎ সহকর্মীদের নিয়ে গত পাঁচ বছরে সে প্রতিষ্ঠানটির চেহারা আমূল পাল্টে দিয়েছেন। রোগীরা চিকিৎসা, সেবা, ওষুধ ও পথ্য পান। এতে শহর বা শহরতলির বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ওষুধ ব্যবসায়ীরা প্রসন্ন ছিলেন না। তবে তাঁদের কারও কারও অশুভ প্রয়াসও হয়নি সফল। তিনি চলে এসেছেন। দেখার বিষয় এখন কতটা ধরে রাখা যাবে এ পরিবর্তন। বড় সরকারি হাসপাতালগুলোতে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারাই পরিচালক থাকছেন। সবাই এরূপ সফল হন না। গড্ডলিকাপ্রবাহে ভাসিয়ে দেন নিজেদের।
বেসামরিক স্বাস্থ্যসেবা খাতের যেসব গলদ আলোচিত হয়েছে তা সদিচ্ছা থাকলে দূর করা অসম্ভব হবে না। হাসপাতাল পর্যায়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে সদিচ্ছার পাশাপাশি যথাযথ চিকিৎসাসামগ্রী ও জনবল দরকার। এর সময়মতো চাহিদা তৈরিতে সচেষ্ট থাকতে হবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। অচল যন্ত্রপাতি মেরামত করা কিংবা প্রতিস্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে তাদেরই। অন্যদিকে প্রয়োজনীয় শূন্য পদগুলো পূরণে জানাতে হবে জোরালো দাবি। এরপর অধিদপ্তর পর্যায়ে দায়িত্ব। একটি হাসপাতালকে তার প্রাধিকার অনুসারে জনবল ও সরঞ্জামাদি জোগানোর দায়িত্ব তাদের। অবশ্য অর্থের জোগান ও শূন্য পদ পূরণ বা নতুন পদ সৃষ্টির জন্য বড় ভূমিকা মন্ত্রণালয়ের। সময়মতো উদ্যোগ না নিলে ব্যক্তির পাশাপাশি খেসারত দেয় জাতি। মালামাল সরবরাহের দায়িত্বে যঁারা আছেন, তঁারা ব্যবসায়ী। লাভ নিয়েই ব্যবসা করবেন। তবে সে মালামাল মানসম্পন্ন আর মূল্য যৌক্তিক, এটা নিশ্চিত করতে হবে অধিদপ্তর ও ক্ষেত্র বিশেষে মন্ত্রণালয়কে। এখানে যে ধরনের ঘাটতি ছিল বা রয়েছে, তা গত কয়েক মাসের করোনাযুদ্ধে প্রমাণিত। এ–জাতীয় দুর্যোগকালে পুরোনো কর্মকর্তাদের ধরে রাখাই বরাবরের রীতি। তবে স্বাভাবিক কারণেই ঘটেছে উল্টোটা। বদলি হতে হয়েছে সচিবকে। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবসান ঘটিয়েছেন মহাপরিচালক। আরও বেশ কিছু কর্মকর্তা হয়েছেন বদলি। এ ক্ষেত্রে আমাদের অরক্ষিত থাকার চিত্রটি সামনে আসে। পাশাপাশি দুর্নীতি ও ভয়াবহ জালিয়াতির চিত্রও পিলে চমকানো।
করোনায় এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন দুই লাখের অধিক আর মারা গেছেন প্রায় তিন হাজার। এর শেষ কোথায় তা অজানা। এই মহামারি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সে বিবেচনায় প্রস্তুতি জোরদার করা দরকার। বিষয়টি কঠিন হতে পারে, তবে অসম্ভব নয়। সিএমএইচ মানের হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি বর্তমান অব্যবস্থার মুখে এসেছে। একে উপেক্ষা করা চলে না। তাই শৃঙ্খলা, নিষ্ঠা ও নিবেদিতভাবে প্রচেষ্টা চালালেই হাসপাতালগুলোর অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হবে। এখনো কোথাও কোথাও ভালো থাকার কথা আমরা জানি। তবে প্রয়োজন সবখানে তা থাকা। এমনটা হলে সিএমএইচের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা কমে যাবে।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব
majumderali1950@gmail.com
শেয়ার করুন এই পোস্ট
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Print (Opens in new window) Print
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল