নিজস্ব প্রতিনিধি।।
ক্যারিয়ারের ‘বিতর্কিত’ আইসিএল অধ্যায় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোলামেলা কথা বলেছেন জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার শাহরিয়ার নাফীস। দেশের প্রথম টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সেখানে জাতীয় দলে বারবার উপেক্ষা হওয়ার দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘ক্যারিয়ার বাঁচাতেই আইসিএলে গিয়েছিলাম।’
বৃহস্পতিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেজে ‘আইসিএল: দ্য আনটোল্ড ট্রুথ, পর্ব-২’ শিরোনামে প্রায় ১৭ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন নাফীস। সেখানেই ৩৫ বছর বয়সী ওপেনার বলেন, ‘আমি মনেকরি আইসিএলে যদি ওই সময়ে না যেতাম, তাহলে আমার ক্যারিয়ারটাই শেষ হয়ে যেত। এই ক্যারিয়ার বাঁচানোর জন্যই আমি আইসিএলে যোগ দিয়েছিলাম।’
২০০৮ সালে হাবিবুল বাশারের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মোট ১৪জন ক্রিকেটার ‘নিষিদ্ধ’ ক্রিকেট লিগ আইসিএলে পাড়ি দিয়েছিলেন। ঢাকা ওয়ারিয়র্স নামে সেই দলটি ছিল আফতাব আহমেদ, অলক কাপালি, মোহাম্মদ রফিকদের নিয়ে গড়া।
আইসিএলে যোগ দেওয়া ক্রিকেটারদের সেই সময় ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। পরে অবশ্য আইসিএল বিলুপ্ত হয়ে যায়। একটি নির্দিষ্ট সময় পর নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও।
নাফীস এরপর জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেছেন। ২০১১ বিশ্বকাপের দলেও ছিলেন। তবে সেভাবে আর নিয়মিত হতে পারেননি। অবশ্য এখন পর্যন্ত ২৪টি টেস্ট, ৭৫ ওয়ানডে ও ১টি টি-টোয়েন্টি খেলা নাফীস আইসিএলে যোগ দেওয়া নিয়ে বিন্দুমাত্রও আক্ষেপ করেন না। আইসিএলে যাওয়া ভুল ছিল এমনও মনে করেন না তিনি।
নাফীস বলেন, ‘আমি তখন বিশ্বাস তো করতামই, এখনো বিশ্বাস করি। আমি আইসিএলে গিয়েছিলাম, ভালো খেলতে পেরেছিলাম এবং আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরতে পেরেছিলাম। এরপর জাতীয় দলে কতটুকু সুযোগ পেয়েছি বা পাইনি, কি হতে পারতো, কি হলে কি হতো, এটা বিতর্কের ব্যাপার। আমি ওই ব্যাপারে যেতে চাচ্ছি না।’
নাফীস জাতীয় দলে বঞ্চনার গল্পগুলো শুরু করেছিলেন এভাবে, ‘আমার কানে এমনও এসেছে, প্রয়োজনে একজন পেসারকে দিয়ে ওপেনিং করানো হবে, তবুও শাহরিয়ার নাফীসকে কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। অনেক কিছু চিন্তা করে আমি আইসিএলে যোগ দিয়েছিলাম।’
২০০৫ সালের জুনে ইংল্যান্ড সফরে ওয়ানডে দিয়ে জাতীয় দলে অভিষেক হয় নাফীসের। বলছিলেন, ‘২০০৫-০৬ সাল আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা সময় ছিল। ২০০৭ বিশ্বকাপ আমাদের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ ছিল। আমি সেই দলের সহ-অধিনায়ক ছিলাম। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দল ভালো করেছিল, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমি খুব ভালো করতে পারিনি।’
‘আমরা যখন ফিরে এলাম, তখন কিন্তু বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক পালাবদলের সময় হলো। হাবিবুল বাশার সুমন ভাই ওয়ানডে দল থেকে সরে দাঁড়ালেন। মোহাম্মদ আশরাফুল ওয়ানডে অধিনায়ক হয়, সুমন ভাই টেস্ট অধিনায়ক ছিলেন।’
‘ঠিক বিশ্বকাপের পর ভারতের বিপক্ষে সিরিজ হয়। আমি টেস্ট সিরিজ খেলি কিন্তু ওয়ানডে দল থেকে বাদ পড়ে যাই। এরপর আসে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ (২০০৭)। আমি বাংলাদেশ জাতীয় দলের প্রথম টি-টোয়োন্টি অধিনায়ক ছিলাম এবং আমরা ওই ম্যাচটা জিতেছিলাম। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে আমাকে ৩০ জনের দল (টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ) থেকেই বাদ দেওয়া হয়। একজন খেলোয়াড় যিনি নাকি জাতীয় দলের প্রথম টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক, আপনি জিতেছেন, আপনি ৩০ জনের সেই প্রাথমিক স্কোয়াডেই নেই।’- এভাবেই বলছিলেন নাফীস।
এরপর তুলে ধরেন সে বছরের শ্রীলঙ্কা সিরিজের কথা, ‘আমরা শ্রীলঙ্কায় গেলাম। সেখানে টেস্ট সিরিজ খেলা শুরু করলাম। বাংলাদেশ জাতীয় দল তিনটা ম্যাচেই ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল। ওই সিরিজে মোহাম্মদ আশরাফুল সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন। আমি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলাম। আবার ওয়ানডে দল থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হলো।’
‘যখন পুরো দলের পারফরম্যান্স ভালো ছিল না এবং আমার পারফরম্যান্স অনেকের মধ্যে ভালো ছিল, তখন জাতীয় দলের কোচ শন উইলিয়ামস, উনি বোর্ডকে জানান, ও ভালো খেলেছে ওকে কেন বাদ দেওয়া হয়েছে। ওকে (নাফীস) না রাখলে আমি দলের কোচিং করাব না। এমন পরিস্থিতিতে আমাকে জাতীয় দলে সুযোগ দেওয়া হয়। প্রথম ম্যাচে আমি সর্বোচ্চ রান করি, ৩৪। দ্বিতীয় ম্যাচটি ভালো করতে পারিনি। তৃতীয় ম্যাচে আমাকে আবারো হুটহাট করে ড্রপ দেওয়া হলো। যাই হোক এভাবেই ২০০৭ সাল পার করি।’
এরপর ২০০৮ সালেও প্রতিটি সিরিজে কীভাবে অবহেলার শিকার হতে হয়েছে সে বর্ণনা দেন নাফীস। বলেছেন, বোর্ডের ফুল কন্ট্রাক্ট থেকে বাদ যাওয়ার কথাও।
সেগুলো তুলে ধরে নাফীস বলেন, ‘আমি যদি ২০০৭ ও ০৮ এর ব্যবচ্ছেদ করি বা ফিরে তাকাই, একজন খেলোয়াড়ের ২০০৫ সালে অভিষেক হলো। ২০০৬ সালে এক হাজার রান করল। ওয়ানডেতে ভালো করল, টেস্টে ভালো করল। এরপর একটি টুর্নামেন্টে (২০০৭ বিশ্বকাপ) মাত্র তিন থেকে চারটি ম্যাচ খারাপ খেলার কারণে আপনি যদি তাকে টিম থেকে ছোড়ে ফেলতে চান, তাহলে একজন খেলোয়াড় নিজেকে কীভাবে প্রতিষ্ঠিত কবরে এর উত্তর আমি এখনো খুঁজে পাই না।’
নাফীস বলেন, ‘কেন যেন আমার কোনো ভালো খেলাই ওই সময় কারো জন্য যথেষ্ট ছিল না।’ ২০০৭ বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশের সিনিয়র ক্রিকেটারদের সরিয়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আমি হয়তো ওই সিরিয়ালে পরবর্তী নাম ছিলাম।’
তাই সিদ্ধান্ত নেন আইসিএলের প্রস্তাবে হ্যাঁ বলার, ‘সার্বিক দিক বিবেচনা করে আমি যখন দেখলাম আমাকে জাতীয় দলে খেলার সুযোগও দেওয়া হচ্ছে না, প্রতিষ্ঠিত হওয়ারও সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে না। আমি যখন ভালো খেলছি, এরপর একটি-দুটি ম্যাচ খারাপ খেললে, নানা অজুহাতে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তখন আমার মনে হয়েছে, আমার পূর্ববর্তী সিনিয়র খেলোয়াড়দের মতোই অবস্থা হবে। হয় আমাকে জোর পূর্বক অবসরে যেতে হবে, না হয় খেলা ছেড়ে দিতে হবে।’
যোগ করে বলেন, ‘এ রকম পরিস্থিতিতে আমি তো আমার এত কষ্টের ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে পারি না। সবকিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিলাম, এই যে আমার সাথে এরকম ব্যবহার করা হচ্ছে… আমার এমন একটা ক্ষেত্র দরকার, যেখানে ভালো খেলবে সবাই দেখতে পারবে শাহরিয়ার নাফীস ভালো খেলছে এবং আমরা যাতে ওকে প্রোপারলি সুযোগ দেই।’
নাফীস আরো বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল আমি যদি এখানে খেলতে যাই, আমি যদি এখানে ভালো খেলি তবে দুইটা লাভ। এক- আমি আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবো, দ্বিতীয়ত সবাই দেখবে যে ও ভালো খেলছে কিন্তু ওকে প্রোপারলি আমার সুযোগ দিচ্ছে না। এই একটা কারণে আমি আইসিএলে গিয়েছিলাম। আমি চেয়েছিলাম এই সিস্টেমের বাইরে গিয়ে এমন এক জায়গা খেলতে, যেটার মানও ভালো, আবার ভালো খেলবে সবাই স্বীকৃতি দেবে।’
শাহরিয়ার নাফীস এই ভিডিওতে আরো বলেছেন, আইসিএলে যাওয়ার প্রস্তাব বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের মধ্যে সবার আগে এসেছিল মোহাম্মদ আশরাফুলের কাছে। নাফীসও আশরাফুলের কাছ থেকেই প্রথম শুনেছিলেন, তবে সে সময় প্রস্তাব ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দেন বলে দাবি করেন। কিন্তু ২০০৮ এশিয়া কাপের পর তার ভাবনায় বদল আসে বলে জানান তিনি।
এত এত উপেক্ষার কথা বললেও নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম বলেননি নাফীস। বরং এভাবে বললেন, ‘কে করেছেন, আমি এখন বলতে পারব না। কারণ খেলা বাদ দিয়ে কে আমার পেছনে লেগে আছে বা কে এই সিদ্ধান্তগুলো নিচ্ছে, এগুলোর পেছনে আমি দৌড়াইনি। আমি সব সময় আমার নিজেকে ব্যস্ত রেখেছিলাম, ভালো খেলার পেছনে এবং প্রস্তুতির পেছনে।’
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
