
বঙ্গবন্ধুর শাসনামল (৩ বছর ৭ মাস)
(১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী থেকে ’৭৫ এর ১৫ আগষ্ট এর পূর্ব পর্যন্ত)
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পরিচালনাকালীন সময়ে বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত ও প্রাপ্তি:
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে রাষ্ট্রপতি শাসনের পরিবর্তে সংসদীয় শাসন কাঠামো প্রবর্তন করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
১৯৭২ সালের ৩১ জানুযারী, মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ ।
১৯৭২ সালের ১২ মার্চ, স্বাধীনতার মাত্র ৫০ দিনের মধ্যে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হয়।
১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর , নতুন সংবিধান কার্যকর করা হয়। বাতিল করা হয় গণ-পরিষদ। মূলত: সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতা এই চারটি মূলনীতির উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছিলো স্বাধীন গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধান।
১৯৭২ সালের ২৪ মে, বিদ্রোহী কবি কাজী নজুরুল ইসলামকে ঢাকায় আনায়ন এবং জাতীয় কবির মর্যাদা দান । ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ, নতুন সংবিধানের অধীনে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯২টি আসনে বিজয়ী হয় এবং তিনি সরকার গঠন করেন।
১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আওয়ামীলীগ , সিপিবি এবং ন্যাপের সমন্বয়ে ত্রিদেশীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়।
১৯৭৩ সালে ইসলামী একাডেমি চালু করেন এবং মদ ও জুয়া খেলা নিষিদ্ধ করেন।
১৯৭৩ সালের ২৩ মে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত হন।পুরস্কার লাভ করেন।
১৯৭৩ সালে প্রাথমিক শিক্ষা, ব্যাংক , বীমা, বড় শিল্পকারখানাকে জাতীয়করণ করা হয়।
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম বাঙালি নেতা হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দেন ।
১৯৭৫ সালে ২৫ জানুয়ারি, দেশে বিরাজমান পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু জাতীয় সংসদে চতুর্থ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা চালু করেন এবং তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, রাষ্ট্রপতি এক ডিক্রির মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দলের সন্মিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সমাপ্তি টেনে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ ’ বা সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ নামে একটি নতুন একক রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ , ইসলামের প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী( প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর শপথ গ্রহণ ):
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে রাষ্ট্রপতি শাসনের পরিবর্তে সংসদীয় শাসন কাঠামো প্রবর্তন করে বঙ্গভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।

তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। উল্লেখ্য যে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী সময়ে অল্পদিনের জন্য স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারী(মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠান):
১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি, ঢাকা ষ্টেডিয়ামে মুজিব বাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনীসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সমর্পণ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবেকঘন ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন।

এই অনুষ্ঠানে মুজিব বাহিনীর পক্ষে শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমদ, আব্দুর রাজ্জাক, সিরাজুল আলম খান ও আব্দুল মান্নান এবং কাদেরিয়া বাহিনীর পক্ষে কাদের সিদ্দিকী অস্ত্র জমা দেন।
১৯৭২ সালের ২৪ মে(বিদ্রোহী কবি কাজী নজুরুল ইসলামকে স্বপরিবারে বাংলাদেশে আনায়ন):
১৯৭২ সালের ২৪ মে তারিখে বাংলাদেশের তৎকালিন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগে ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে বিদ্রোহী কবি কাজী নজুরুল ইসলামকে স্বপরিবারে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয় এবং জাতীয় কবির মর্যাদা প্রদান করা হয়।

এরপর ১৯৭৪ সালের ০৯ ডিসেম্বর, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকেঁ সন্মানসূচক ‘ডিলিট’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারি মাসে, বাংলাদেশ সরকার কবিকে স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে একুশে পদকেও ভূষিত করা হয়। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগষ্ট( বাংলা: ১২ ভাদ্র, ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) তিনি মৃত্যূবরণ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে চির নিদ্রায় শায়িত করা হয়। উল্লেখ্য যে, ১৮৯৯ সালের ২৫ মে( বাংলা: ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী নজরুল ইসলাম জন্মগ্রহণ করেন।
১৯৭৩ সালের ২৩ মে(বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত)
১৯৭৩ সালের ২৩ মে, বিশ্ব মানবতায় ও শান্তির স্বপক্ষে অবদান রাখার কারণে বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশ চন্দ্র বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক প্রদান করেন।

এরপর তিনি বলেন, ‘শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধু ও বটে।’ বঙ্গবন্ধুর এই পদক প্রাপ্তি ছিল বাংলাদেশের জন্য প্রথম কোন আন্তর্জাতিক সন্মান। দীর্ঘ ২৩ বছর বর্বর পাকিস্তানি শাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম, জেল ও নির্যাতন ভোগ করে সাড়ে সাত কোটি নির্যাতিত , নিপীড়িত, শোষিত, বঞ্চিত মানুষের শান্তির জন্যে বঙ্গবন্ধু ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রাামর। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে বাংলার মানুষ দীর্ঘ নয়(০৯) মাস যুদ্ধ করে, ৩০ লক্ষ শহীদ ও দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে দেশ স্বাধীন করে। আর বাঙালি জাতি পায় একটি স্বাধীন সার্বভেৌম বাংলাদেশ এবং সবুজের মাঝে লাল বৃত্ত খচিত একটি জাতীয় পতাকা।
বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী ম্যারি কুরি ও পিয়েরে কুরি দম্পতি বিশ্ব শান্তির সংগ্রামে যে অবদান রেখেছেন, তা চিরস্মরীয় করে রাখার জন্য বিশ্ব শান্তি পরিষদ ১৯৫০ সাল থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে, মানবতার কল্যানে, শান্তির স্বপক্ষেব বিশেষ অবদানের জন্য বরণীয় ব্যক্তি ও সংগঠনকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করে আসছে।
কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রো, প্যালেসটাইনের ইয়াসির আরাফাত, দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের ইন্দিরা গান্ধী, মাদার তেরেসা, ভারতের জওহরলাল নেহেরু, আমেরিকার মার্কিন লুথার কিং, রাশিয়ার(সোভিয়েত ইউনিয়ন) লিওনিদ ব্রেজনেভ প্রমুখ বিশ্ব নেতাদের এই পদকে ভূষিত করা হয়েছে।
১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর (জাতীয় সংসদের প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধুর শপথ গ্রহণ ):
১৯৭৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর, জাতীয় সংসদের প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শপথ গ্রহণ। তখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর( জাতিসংঘ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর বাংলায় বক্তব্য):
১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম বাংলায় বক্তব্য দেন।

উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘ অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার ঠিক সাত(০৭) দিন আগে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর, বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্যপদ লাভ করেছিল।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি (জাতীয় সংসদে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭২ এর সংবিধান পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর শপথ গ্রহণ ):
বঙ্গবন্ধু জাতীয় সংসদে চতুর্থ সংশোধনী বিল পাসের মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতির
সরকার ব্যবস্থা চালু করেন এবং তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি (সকল রাজনৈতিক দলের সন্মিলেন ‘বাকশাল’ নামে একটি নতুন একক রাজনৈতিক দল গঠন):
১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি, রাষ্ট্রপতি এক ডিক্রির মাধ্যমে সকল রাজনৈতিক দলের সন্মিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সমাপ্তি টেনে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ ’ বা সংক্ষেপে ‘বাকশাল’ নামে একটি নতুন একক রাজনৈতিক দল গঠন করেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নৃশংস হত্যাকান্ড) :
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ( বাংলা: ২৯ শ্রাবণ ১৩৮২ বঙ্গব্দ) রাতের অন্ধকারে একদল হায়নারূপী ও বিপদগামী উচ্চাভিলাষী বিশ্বাসঘাতক সেনা কর্মকর্তা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধূ শেখ মুজিবুর রহমানকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে স্বপরিবারে হত্যা করে।

এছাড়াও ঘাতকেরা হত্যা করে বঙ্গবন্ধুর পরিবার ও আত্মীয়স্বজনসহ মোট ১৬ জনকে। নিহতরা হলেন- বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী মহীয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র মুক্তিযোদ্ধা লে: শেখ কামাল ও তাঁর স্ত্রী সূলতানা কামাল, দ্বিতীয় পুত্র লে: শেখ জামাল ও তাঁর স্ত্রী রোজী জামাল, কনিষ্ঠপুত্র শেখ রাসেল, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের, ভগ্নীপতি ও কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও তার কন্যা বেবি সেরনিয়াবাত, আরিফ সেরনিয়াবাত, দৌহিত্র সুকান্ত আব্দুল্লাহ বাবু, ভ্রাতুষ্পুত্র শহীদ সেরনিয়াবাত, বঙ্গবন্ধূর ভাগ্নে যুবনেতা ও সাংবাদিক শেখ ফজলুল হক মনি ও তার অন্ত:সত্ত্বা স্ত্রী আরজু মনি, বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার অফিসার কর্ণেল জামিল আহমেদ এবং ১৪ বছরের কিশোর আব্দুল নঈম খান। শুধুমাত্র শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানীতে অবস্থান করায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান।
এমন নৃশংস হত্যাকান্ডে জাতি বিস্ময়ে বিমূঢ় ও শোকে স্তব্ধ হয়ে গেল। সারা বিশ্ব জ্ঞাপন করল চরম ঘৃনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট , জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহামন শহীদ হবার পর দেশে সামরিক শাসন করা হয়। শুরু হয় হত্যা ,ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি। কেড়ে নেয়া হয় জনগনের ভোট ও ভাতের অধিকার। এরপর জেনারেল জিয়াউর রহমান সামরিক শাসনের মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ নামে এক কুখ্যাত কালো আইন জারি করে সংবিধানে সংযুক্ত করে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার কাজ বন্ধ করে দেয় এবং বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিদেশে অবস্থিত বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে।
১৯৭৫ সালের ১6 আগষ্ট (টুঙ্গিপাড়ায় যেভাবে বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফন হয়েছিল):
১৯৭৫ সালের ১৬ আগষ্ট, ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে নিহত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কড়া সামরিক পাহারার মধ্যে তাঁর নিজ জন্মস্থান নিভৃত পল্লী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় পিতা-মাতার কবরের পাশে অনাড়ম্বরভাবে সমাহিত করা হয়। জানা গেছে, ’৭৫ এর ১৬ আগষ্ট, বঙ্গবন্ধুর মরদেহ তাঁর জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ায় দুপুরে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর কড়া নিরাপত্তার মধ্যে হেলিকপ্টার থেকে কফিন নামিয়ে কাসেম, আব্দুল হাই মেম্বার, আকবর কাজী, আনোয়ার হোসেন, আয়ূব আলী শেখ, মো: ইলিয়াস হোসেন, জহর মুন্সি, সোনা মিয়া কবিরাজ, শেখ নুরূল হক গেদু মিয়া, সোহরাব মাস্টারসহ অন্যরা তাঁর পৈত্রিক বাড়ীতে লাশ বহন করে আনেন। কফিন খুলে লাশ বের করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে রেডক্রিসেন্টের রিলিফের কাপড় দিয়ে কাফন পরানো হয়। জানাজা ও দাফনে গ্রামবাসী অংশগ্রহণ করতে চাইলেও দেওয়া হয়নি।

সেনা অফিসাররা ১৫/২০ মিনিটের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর লাশ দাফনের নির্দেশ দেন। জানাজা শেষে বাবা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা শেখ সাহেরা খাতুনের কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। জানাজা ও দাফন শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন মৌলভী আব্দুল হালিম। বঙ্গবন্ধুর গোসল, জানাজা ও দাফনে টুঙ্গিপাড়া, পাঁচ কাহনিয়া ও পাটগাতী গ্রামের প্রায় ৩০/৩৫ অংশ নেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথা, বঙ্গবন্ধুর কবর খুড়েঁছিলেন আব্দুল মান্নান শেখ এবং গোসলও করিয়েছিলেন তিনি। স্বাধী।ন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে লাশ টুঙ্গিপাড়া গ্রামে দাফন করে ওরা বঙ্গবন্ধূকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সে উদ্দেশ্য সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু সবর্কালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হয়েছেনে। টুঙ্পিপাড়া বাঙালির জাতির শ্রেষ্ঠ স্থানে পরিনত হয়েছে।
২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারী (বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার কার্যকর) :
১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট, রাতের অন্ধকারে একদল বিপদগামী সেনা কর্মকর্তা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের নিজ বাসভবনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্বপরিবারে হত্যা করে। এ মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের বিচার নিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ নামে এক কুখ্যাত কালো আইন জারি করে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচারকার্য বন্ধ করে দেয়।
এরপর দীর্ঘ ২১ বছর( (১৯৭৫-’৯৬) পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ নামক কালো আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচারকার্য শুরু করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ পুনরায় ক্ষমতায় আসলে ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারী, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে ৫ জন খুনির মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে সরকার। মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত খুনিরা হলো: সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, মহিউদ্দিন আহমেদ(ন্যান্সার), বজলুল হুদা ও একেএম মহিউদ্দিন(আর্টিলারি)।

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের রায় অনুসারে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামরায় সর্বমোট ১২ জন আসামীর ফাঁসির আদেয় দেয়। ফাঁসির দন্ডাদেশ পাওয়া বিদেশে পলাতক সাত আসামীর মধ্যে এক আগামী বিদেশেই পলাতক অবস্থায় মারা যায় এবং ভারতে পালিয়ে থাকা অপর এক আসামী ক্যাপ্টের আব্দুল মাজেদ বাংলাদেশে এলে গত ১১ এপ্রিল, ২০২০ তারিখ রাত ১২ টা ১ মিনিটে তার ফাসি কার্যকর করা হয়। অবশিষ্ট ফাঁসির দন্ডাদেশ পাওয়া পাঁচ আসামী এখনও বিদেশে পলাতক রয়েছে। বিদেশে পালিয়ে থাকা ফাঁসির দন্ডাদেশ পাওয়া পাঁচ আসামী হলো- খন্দকার আব্দুর রশীদ, রাশেধ চৌধুরী, শরিফূল হক ডালিম, এস,এইচ,এমবি নূর চৌধুরী। অবশেষে ৩৪ বছর পর বঙ্গবন্ধুসহ তাঁর পরিবারের নৃংশস হত্যাকান্ডের বিচার বাংলার মাটিতে কার্যকর হলো এবং সেই সাথে ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি কলংকমুক্ত হলো।
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত টুঙ্গিপাড়া সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স :
পোগালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মধুমতি নদীর তীরে ঘুমিয়ে আছেন বাঙালির অবিসংবাদিত মহানায়ক, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাশেই ঘুমিয়ে আছেন তাঁর পিতা-মাতা। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ , শান্ত সুন্দর নিরিবিলি এই টুঙ্গিপাড়া গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। আবার এই গ্রামেই প্রকৃতির মমতাঘেরা কোলে চিরনিন্দ্রায় শায়িত আছেন।

গোটা টুঙ্পিপাড়াকেই আজ বদলে দিয়েছে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসার পর টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় এবং ১৯৯৯ সালের ১৭ মার্চ, সমাধিসৌধের নির্মাণকাজের ভিস্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। লাল সিরামিক ইট আর সাদা-কালো টাইলস দিয়ে গ্রীক স্থাপত্যশৈলীর আদলে নির্মিত সমাধিসৌধের কারুকার্যে ফুটে উঠেছে বেদনা ও শোকের আবহ।
২০০১ সালের ১০ জানুয়ারী, বঙ্গবন্ধুকন্যা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সমাধিসৌধের উদ্বোধন করেন। সমাধিসৌধ কমপ্লেক্সের মধ্যে রয়েছে পাঠাগার , গবেষনাকেন্দ্র, স্যুভেনির কর্নার, প্রশস্ত পথ, ফুলের বাগান ও কৃত্রিম পাহাড়। সমাধি কমপ্লেক্সের পাঠাগারে দেড় হাজারেরও বেশী বই রয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী, আমার কিছু কথা, শেখ হাসিনার লেখা- আমার পিতা শেখ মুজিব প্রভৃতি গ্রন্থ।
আজ সেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত সমাধিসৌধ কমপ্লেক্স বাঙালির জাতির শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থানে পরিনত হয়েছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
