কাজী ফারুক আহমেদ:
প্রতিবছর এসএসসির ফল প্রকাশের পর নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের আনন্দ-উচ্ছ্বাস সংবাদমাধ্যম বিশেষ করে টেলিভিশনে চোখে পড়ার মতো বিষয় হলেও এবার তা হয়নি করোনার কারণে। অবশ্য প্রায় এক দশক ধরে ফলাফলে কম-বেশি যে ধারা লক্ষ করা গেছে, এবারও তার খুব একটা ব্যতিক্রম হয়নি। তবে এবার ফল প্রকাশের পদ্ধতিতে ছিল ব্যতিক্রম।
৩১ মে সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের উদ্বোধন করে বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ফল প্রকাশ করেছি। এ সময় শিক্ষকদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হওয়ার শিক্ষা দিন। শুধু নিজে ভালো থাকা নয়, দেশের ও দেশের মানুষের জন্য কাজ করে সবাইকে নিয়ে যেন ভালো থাকা যায়, শিক্ষার্থীদের সে শিক্ষা দিন। তিনি বলেন, দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসা, মানুষের প্রতি কর্তব্যপরায়ণতা এ শিক্ষাগুলো শিক্ষার্থীদের দিতে হবে। আমার প্রতি অন্যের কর্তব্য যেমন অধিকার, আমার যেটি কর্তব্য, সেটিও অন্যের অধিকার এভাবে যেন সবাই চিন্তা করে।
শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিকের ফলাফলে আশান্বিত হলেও প্রধান শিক্ষক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তাদের মেধার প্রতিফলন দেখা যায় না। অন্যদিকে জাতীয় দৈনিকগুলো বরাবরের মতো ভালো কলেজে ভর্তি নিয়ে সদ্য উত্তীর্ণদের দুশ্চিন্তার কথা উল্লেখ করলেও আমার কাছে উদ্বেগের বিষয় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বনিম্ন পাসের হার নিয়ে। এ বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার সর্বনিম্ন, ৭২.৭০। এরপর ৭৮.৭৯ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে সিলেট বোর্ড। অর্থাৎ সবচেয়ে খারাপ ফল করা সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছে কারিগরি। আর গড় পাসের হারের (৮২.৮৭) সঙ্গে এ পার্থক্য প্রায় ১০ শতাংশের। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কারিকুলামের যুগোপযোগিতা ও বোর্ডের পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে; কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের বর্তমান চেয়ারম্যান মোরাদ হোসেন মোল্যার বক্তব্য নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ‘কারিগরিতে লো কোয়ালিটির ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে। অভিভাবকরাও চান না তাদের সন্তান পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট অথবা কৃষি ডিপ্লোমায় পড়ুক। যারা সাধারণ শিক্ষায় একেবারেই পারে না তারাই কারিগরিতে আসে। এজন্যই ফল ভালো হয় না।’
শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের কাছে এবার কঠিন বিষয় ছিল গণিত। যে বোর্ডের শিক্ষার্থীরা গণিত বিষয়ে ভালো করেছে, সেখানে পাসের হার বেড়েছে। আবার যেখানে এ বিষয়ে পাসের হার কম, সেখানে বোর্ডের পাসের হারও গত বছরের তুলনায় কম। বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানরা জানান, এবার গণিতের প্রশ্ন কঠিন হয়েছে। সৃজনশীল গণিতের সঙ্গে বিশেষ করে মানবিক এবং ব্যবসায় শাখার শিক্ষার্থীরা খাপ খাওয়াতে পারেনি। অনেক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের এবং নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণিতের শিক্ষক নেই। এ বিষয়ে যোগ্য শিক্ষকেরও ঘাটতি থাকায় গণিতে তারা ভালো করতে পারেনি। এবার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন দাখিলে জিপিএ-৫ প্রাপ্তি বেড়েছে। তবে পাসের হার কমেছে। শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠানের ৫৮ শতাংশই মাদ্রাসা বোর্ডের হলেও একেবারে পাস করেনি এমন প্রতিষ্ঠানের ৪৬ শতাংশ এ বোর্ডের।
আমাদের দেশে প্রচলিত পাবলিক পরীক্ষার উপযোগিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন আছে, সেই সঙ্গে বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতি আমরা কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারছি তা-ও প্রশ্নসাপেক্ষ। অন্যদিকে ২০০০ সালের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি বিশেষ করে এর ৪নং লক্ষ্য অর্জন নিয়ে বর্ণিত শিক্ষা যেমন জাতীয় পরিধিতে সীমিত থাকছে না, এর মূল্যায়ন ব্যবস্থায়ও আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বা বিশ্বায়নের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। অবশ্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১০ দেশের শিক্ষামন্ত্রীদের ম্যাধমিক শিক্ষা-পরবর্তী পরীক্ষা নিয়ে সংগঠিত উদ্যোগ ১৯৬৫ সালের নভেম্বর থেকেই শুরু হয়েছে। তার উল্লেখ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। সাউথ ইস্ট এশিয়ান মিনিস্টারস অফ এডুকেশন অর্গানাইজেশন ঝঊঅগঊঙ যা সিমিও নামে পরিচিত, সদস্য দেশগুলোর মাধ্যমিক স্কুলের পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর জরিপ ও গবেষণা কার্যক্রম তখন থেকেই পরিচালনা করে আসছে। নুরুল ইসলাম নাহিদ শিক্ষামন্ত্রী থাকাকালে বছর পাঁচেক আগে আমাদের দেশে পরীক্ষা পদ্ধতির ওপর গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হলেও এর কার্যক্রম সম্বন্ধে আমার মতো অনেকেরই ভালো ধারণা নেই; কিন্তু শিক্ষা মূল্যায়ন ব্যবস্থা বা পরীক্ষা পদ্ধতির বিবর্তন, জাতীয় পরিমণ্ডলের বাইরে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগ সম্প্রসারণের প্রতিফলন বাংলাদেশে চোখে পড়ে না। উল্লেখ্য, SEAMEO নামের এশিয়ার ১০টি সদস্য দেশ- ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও ভিয়েতনামের সঙ্গে সহযোগী সদস্য হিসেবে ছয়টি দেশ যুক্ত রয়েছে : অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও নিউজিল্যান্ড। পাঁচ দশক বা বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনার ফলে সিমিও-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান মূল্যায়ন ব্যবস্থা বা পরীক্ষা পদ্ধতিতে কাঠামোগত রূপান্তর এনে সময়ের চাহিদা পূরণে সক্ষম পেশাগত দক্ষতা ও কারিগরি নৈপুণ্য অর্জনে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পেরেছে। নিজ নিজ দেশের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখেই মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর পাঠগ্রহণ-পরবর্তী মূল্যায়ন ব্যবস্থা সক্রিয় রাখতে সক্ষম হয়েছে। কাম্য মূল্যবোধে সমৃদ্ধি, উন্নত জীবনের জন্য দক্ষতা অর্জনে সহায়ক শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা প্রগতিশীল ও সমন্বিত করতে পারলে অনেক অসম্ভবই যে সম্ভব হয়ে ধরা দিতে পারে এগুলো তারই দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশে আমরা এ থেকে শিক্ষা নিতে পারলে এবারের এসএসসির ফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শ অনেকটাই কার্যকর হবে। আমাদের আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রয়োজন, কর্মবাজার ও বিশ্বায়নের যুগের নানা অর্জন ও উদ্ভাবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করি।
অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ : জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ প্রণয়ন কমিটির সদস্য, শিক্ষা উন্নয়ন গবেষক
prof.qfahmed@gmail.com
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
