আনিস মালিক:
মেজো ভাই আনোয়ার হোসেনের শশুর মিয়া মোহাম্মাদ শানু ইদের পরের দিন মারা যাবার কারনে বৃহস্পতিবার শোকাচ্ছন্ন পরিবারের সাথে দেখা করতে যাওয়া গলাচিপা উপজেলার চিকনিকান্দি ইউনিয়নের মাঝগ্রামের দারোগা বাড়ি।
২৪ মার্চের পর এই প্রথম বাসার বাহিরে দুরের উদ্দেশ্যে বের হওয়া স্বাস্থ্য বিধি মেনে। বাসা থেকে রিকশা নিয়ে রূপাতলিতে গিয়ে দেখি বাস ছাড়া সব যানবাহন চলছে, মাঝে মধ্যে রাস্তায় জটলাও আছে। লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে এসব ছোট বড় যানবাহনে। যেহেতু স্বাস্থ্য বিধি মেনে যেতে হবে তাই মাস্ক, গ্লোবস পড়ে স্যানিটাইজার ও অতিরিক্ত গ্লোবস, মাস্ক ও ভিটামিন সি ট্যাবলেট সাথে নিয়ে ৩শত টাকায় মটর সাইকেল ভাড়া করে গেলাম লেবু খালী ফেরি ঘাট।
দেখলাম একটা ফেরি চলছে অবিরাম, কিন্তু দুই পাশে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার যান ও মানুষ জট। এত মানুষ সাধারন সময়েও চোখে পরে না। যার অধিকাংশের মুখে মাস্ক পর্যন্ত নেই স্বাস্থ্য বিধি বা দুরত্ব মানা দুরে থাক। ফেরীতে উঠে দেখি একটি পিকআপে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন লোক মাথার উপর মোটা রঙিন পলিথিন দিয়ে ঘুপসি মেরে বসে আছে সাধারন চোখে যা দেখে বোঝার উপায় নেই। ফেরীতে অতিরিক্ত লোকজন, যানবাহন ভরপুর, আছে নিয়মিত হকার।
ফেরী পার হবার পর সেখান থেকে চলে গেলাম বগা ফেরী ঘাট। মোটর সাইকেলে ভাড়া ১৫০ টাকা। সেখানকার অবস্থাও একই রকম লেবু খালী ফেরীর মত।
ওপারে উঠে দেখি অনেক গুলো মোটর সাইকেল এক পাশে দাড় করানো কিন্তু ড্রাইভার খুজে পেলাম না। একজনের সহযোগীতায় এক ছোট্ট ঘরের মধ্যে দেখি আট থেকে দশ জনে মিলে লুডু খেলছে কারো মুখে মাস্কটি পর্যন্ত নেই। যাত্রী শুনে একজন এগিয়ে এসে শুনতে চাইলেন কোথায় যাব? গন্তব্যর কথা বললে, ভাড়া চাইলেন ৭ শত টাকা।
আমি কিছু না বলে অন্য ড্রাইভার খুজছি। পেছনে সেই ড্রাইভারটি আমাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন, ভাড়া বলবেন না? ভাড়া বেশি চাওয়া ও তার মুখে মাস্ক না থাকায় তার গাড়িতে যেতে চাইছিনা ভেবে কিছু না বলে এড়িয়ে যেতে চাইলাম। লোকটি এবার আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করে বসলো। এবার পিছন ফিরে গিয়ে জানতে চাইলাম কি বললেন? তিনি উত্তর দিলেন যা বলছি তাতো শুনছেনই। দিলাম দু-চার চোট লাগিয়ে আর বললাম, যদি বেশী বাড়া বাড়ি করো তো এখানেই আইনের সহায়তা নিয়ে তোমাকে শায়েস্তা করা হবে। গাজা খোর টাইপের লোকটি নরম হয়ে যাওয়ায় অন্য এক মটর সাইকেল চালক এগিয়ে এসে ৪শত টাকা চাইলে সাড়ে তিনশত টাকা দিয়ে গন্তব্যে পৌছালাম। চালকটি বলল, ভাই বাগা ফেরী ঘাট এলাকার লোকজন এরকম ব্যবহার অচেনা যাত্রীর সাথে হর-হামেশাই করে থাকে, কেউ প্রতিবাদ করলে খুন খারাবি পর্যন্ত হয়ে যায়, আপনি যা করলেন তা অভাবনীয়।
মানুষ কেন আইনের আশ্রয় নেয় না জানতে চাইলে বলল, এখানে ওদের একটা সিন্ডিকেট আছে যার নাটাই স্থানীয় এক নেতার হাতে। তবে জানতে চাইলেও সেই নেতার নামটি বলতে চাইলো না। গিয়ে আবার বরিশাল ফিরে আসার ব্যস্ততা থাকায় সেই নেতার নামটি জানাও হলো না।
এবার পৌনে তিনটার আগে মেঝ ভাইয়ের শশুর বাড়ি থেকে বের হয়ে গলাচিপার দিকে যাত্রা শুরু করলাম, কিন্তু গলাচিপার কাঙ্খিত কাজটি না হওয়ায় অল্প দুরে থেকে ফিরে একই মটর সাইকেলে চলে এলাম শেহা কাঠী খেয়া ঘাট।
মানুষ জন স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছে তাদের কারো মধ্যে ভাবান্তর পেলাম না যে দেশে এতবড় একটা ব্যাধির একের পর এক আক্রমনে প্রতিদিন বড় বড় ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও সাধারন মানুষ শনাক্তও অশানাক্ত প্রায় অর্ধশতাধিক মৃত বরন করছে। যাদের দাফন কাফনেও কোন আত্মীয় স্বজন থাকতে পারছে না। মরে পরে থাকলে কেউ ভয়তে কাছে যাচ্ছে না। প্রত্যাহ আক্রান্ত হচ্ছে দুই হাজরের কাছা কাছি বা বেশী।
এপারে এসে আরেকটা মটর সাইকেলে পটুয়াখালী সদরে এলাম ৮০ টাকা দিয়ে। সে নামিয়ে দিলো শহরের ডিসি অফিসের সামনে সেখান থেকে অটোতে করে চৌমাথা এসে ২শত টাকায় মটর সাইকে ভাড়া করে লেবু খালি। ফেরী পার হয়ে আবারো ৩শত টাকায় দিয়ে বরিশাল রূপাতলি। এরপর অটো নিয়ে বাসায় এসে পরিদেয় সব সার্ফের গুড়া দিয়ে ধুয়ে সাবান দিয়ে পুরো শরীর ধৌত করন চলল আধা ঘন্টা ধরে।
প্রায় আড়াই মাস পর এই জার্নির মধ্যে এক বারেও মনে হলো না গ্রামগঞ্জে এরা এমন একটি ব্যধির মধ্যে বসবাস করছে। অথচ ইদের পরের দিন শেরে বাংলা মেডিকেলে দুই নারী মারা গেলো পাঁচ মিনিটের মধ্যে যার একজন বাকেরগঞ্জের কোন এক গ্রামের অন্যজন পটুয়াখালী অন্য আরেকটি গ্রামের বাসিন্দা।
স্থানীয় পর্যায়ে কোভিড-১৯ নামে অতিমারী ছড়িয়ে পড়লেও গত কালের এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় মনে হলো সরকারের এত প্রচার বিজ্ঞাপন সতর্কীকরন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরেও এদের মধ্যে কোন সচেতনতা নেই। কয়েক জনের কাছে জানতে চাইলে তারা বলল গ্রামে এহনও ভাইরাস টাইরাস আয় নাই। আমাগো অতে কিছু অইতো না। আমার লা-জবাব। আক্ষেপ সরকার এত এত অর্থ দিলো, চাল ডাল দিলো, বড় লোকেরা ত্রান দিয়ে সেলফি তুললো তাহলে ভুক্তভোগী তারা কোথায় গেলো। গ্রামীন অর্থনীতি তো সব ঠিকই আছে। বরং পণ্যের দাম আগের তুলনায় বেশী।
যানবাহন ভাড়া দিগুন কম পক্ষে। তাদের তো রাতারাতি ধনী হয়ে ফুলে ফেপে ওঠার কথা। আবার ত্রান লাগবে কিসে? গ্রাম পর্যায়ের ইউপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, নেতারা ত্রান মেরে দিচ্ছে কেন সেটা এবার বুঝলাম। প্রত্যন্ত অঞ্চলের অর্থনীতির চাকা সচল থাকায় যেখানে গরীবই নাই সেখানে ত্রান দিয়ে সময় ও লোক জন জড়ো করার দরকার কি? সরকার যেহেতু বরাদ্ধ দিয়েই দিছে তাহলো সেটা আত্মসাৎ করাটাই মহৎ উপায়! গ্রাম বা শহরাঞ্চলে এরকম চলতে থাকলে ঢাকা নারায়নগঞ্জ হয়ে ইটালি নিউইয়ার্কের মতো হতে আমাদের দেশটার খুব বেশী বোধ হয় দেরী নেই।
লেখক-সাংবাদিক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
