জাহাঙ্গীর আলম সেলিমঃ
বিশ্ব আজ মৃত্যুপুরী। করোনার ছোবলে বিপর্যস্ত। প্রতিদিন আক্রান্ত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। থামছে না মৃত্যুর মিছিল। বিশ্বজুড়ে চলছে স্বজন হারানোদের আহাজারী। বাতাসে লাশের গন্ধ। ভেসে যাচ্ছে দেশ-দেশান্তরে। মানুষ অজানা আশংকায় প্রহর গুনছে। কে,কখন ও কিভাবে করোনায় আক্রান্ত হয়ে পরেন এই ভয়ে। আস্থা নেই নিজের ওপরও! ক্রমশ: পরিবার ও স্বজনদের সাথে দূরত্ব বাড়ছে। কমছে নৈকট্য। এ মহামারী থামার কোনো লক্ষণ দৃশ্যত দেখা যাচ্ছে না।তাহলে কি কবি শামসুর রাহমানের কবিতার বইয়ের নামের একটি শব্দ উহ্য রেখে বলা যায় না‘-উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে বিশ্ব!
লকডাউন,কোয়ারেন্টিন ও আইসোলেশন-কোনো কিছুই কোভিড-১৯ এর লাগাম টেনে ধরতে পারছে না। বন্দিশালায় মানুষ অসহায়।বন্ধ শিল্পকারখানা।থেমে গেছে ব্যবসা-বাণিজ্য। স্থবির অর্থনীতি। খেটে খাওয়া মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ! কী অপেক্ষা করছে সামনের দিনগুলোতে ?
মানবিকতা আজ সবার ওপরে। মানুষ লড়ছে মানুষের জন্য। একে অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পরছে।বাড়িয়ে দিচ্ছে সহযোগিতার হাত। জাত-পাত,ধর্ম,বর্ণ ও গোত্রের কোনো বালাই নেই। পরিচয় একটাই-তা হলো মানুষ। সাম্প্রতিক করোনাকালীন বিশ্বের চিত্র তাই বলছে। সবদেশেই বলছে মানুষ মারা যাচ্ছে।কেউ বলছে না হিন্দু,মুসলমান,বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান মারা যাচ্ছে। অবশেষে জয় হলো মানুষের। সবার ওপরে মানুষ সত্য,তাহার ওপরে নাই।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন-“বলতে পারিস বিশ্বপিতা ভগবানের কোন সে জাত?” অথবা রাজলক্ষী ও শ্রীকান্ত উপন্যাসে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রশ্ন করেছেন-মরার আবার জাত কিরে? বাংলা সাহিত্যের দুই দিকপাল বেঁচে থাকলে আজ অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব দেখে খুশি হতেন। কারণ,মূলত তাঁদের চাওয়া ছিল অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হুঁসিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছে-করোনাভাইরাস সহজে দূর হবে না।প্রতিনিয়ত ভাইরাসটি তাঁর চরিত্র পাল্টাচ্ছে। এ মুহুর্তে ২১৩ দেশে ছড়িয়ে পরেছে।প্রায় ৩ লক্ষ ৪০ হাজার লোকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আক্রান্তের সংখ্যা অর্ধ কোটি ছাড়িয়ে। দেশে মৃত্যু বরণ করেছে ৪৫২ জন। এ ছাড়াও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় সাত শতাধিক বাংলাদেশির প্রাণহানি ঘটেছে। মানুষ সংগ্রাম করছে করোনার বিরুদ্ধে। বেঁচে থাকার জন্য।হয়ত একদিন জয়ী হবে মানুষ। হেরে যাবে করোনা। কিন্তু বিষয়টি সময় সাপেক্ষ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
এখনও কোভিড-১৯ এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। বিশ্বের দেশে দেশে বিজ্ঞানীরা নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখনও সফলতার মুখ দেখেনি। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিষেধক আবিষ্কার না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন সচেতনতা। আসুন আমরা বিশ্ব সংস্থার গাইড লাইন ও সরকারের বিধি নিষেধ মেনে চলি। এবং করোনা মুক্ত থাকি।
পুরো দেশ আজ করোনার কবলে। ৬৪ জেলাতেই করোনার রোগী রয়েছে। ধীরে ধীরে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে পরেছে। গ্রামগুলো ঘনবসতিপূর্ণ। শিক্ষার হার কম। সচেতনায় অনেক পিছিয়ে। এমতাবস্থায় যদি মহামারী আকার ধারণ করে তা সামাল দেয়া কঠিন। কাজেই প্রশাসনকে এ বিষয়ে সক্রিয় ও সচেতন থাকতে হবে।বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ উন্নয়নশীল একটি দেশ। কিন্তু করোনার ছোবলে পরে অর্থনীতির চাকা থমকে দাঁড়িয়েছে। কলকারখানা,আমদানি রফতানি প্রায় বন্ধ।কমে যাবে বৈদেশিক মুদ্রা। লকডাউনের কারণে মানুষ ঘরবন্দি। বসে বসে খাচ্ছে জমানো টাকা। দিন দিন বাড়ছে বেকারের হার। বিশেষ নিম্ন মধ্যবিত্তের অবস্থা করুণ। এমতাবস্থায় সরকার সাধ্যমত চেষ্টা করছে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার জন্য। সরকারের উদ্যোগের কোনো কমতি নেই।
কিন্তু প্রশ্ন হল এভাবে কত দিন চলবে? হয়ত লকডাউন উঠে যাবে। তখন কি অবস্থা দাঁড়াবে? মহামারী। আর মহামারী রুখে দেয়ার সক্ষমতা কি আমাদের আছে? নেই। তাহলে বাড়াতে হবে সচেতনতা। করোনাকে সাথে নিয়েই বাঁচতে হবে।তার জন্য যা যা প্রয়োজন তাই করতে হবে।
অর্থনীতি সচল রাখতে সর্বাগ্রে কৃষি সেক্টরকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ,একমাত্র কৃষিখাতই পারে অর্থনীতি সচল রাখতে। এর জন্য সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এক ইঞ্চি জমিও পতিত রাখা যাবে না। এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে কৃষি মন্ত্রনালয়কে।
করোনা উত্তর বিশ্ব হোক মানবিক। যেখানে থাকবে না হিংসা-বিদ্বেষ,অস্ত্রের ঝনঝনানি ও বর্ণ-বৈষম্য। মানুষের বিবেক জাগ্রত হোক-সকলের মতো এ আমারও প্রত্যাশা।
লিখেছেন
শফিকুল কাদির
ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ
কান্দিপাড়া আব্দুর রহমান ডিগ্রি কলেজ
গফরগাঁও, ময়মনসিংহ।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
