এইমাত্র পাওয়া

লক্ষাধিক নন-এমপিও কর্মচারী চরম দুর্দশায়

অনলাইন ডেস্ক :

যশোরের মণিরামপুরের ঢাকুরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। বর্তমানে এই কলেজে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫২০। শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ২৮ জন। সরকারি কোনো অনুদান নেই, প্রতিষ্ঠান থেকেও শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না বললেই চলে। শিক্ষকদের বেশির ভাগই প্রাইভেট-টিউশনি, কেউ মুদি দোকান আবার কেউ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে সব কিছুই বন্ধ।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ তাপস কুমার কুণ্ডু বলেন, ‘মফস্বলের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থীরা তেমন কোনো বেতন দেয় না। তাই আমরা শিক্ষক-কর্মচারীদেরও বেতন-ভাতা দিতে পারি না। আমাদের কলেজের ফলাফল ভালো। এর পরও এমপিওভুক্তিতে স্থান পায়নি। প্রায় দেড় মাসের মতো কলেজ বন্ধ। শিক্ষক-কর্মচারীরা অন্য যে কাজ করত তাও বন্ধ রয়েছে। কারো কাছে হাতও পাততে পারছে না। আবার মুখ ফুটে বলতেও পারছে না। আমি অধ্যক্ষ, আমি জানি। আমার শিক্ষক-কর্মচারীরা খেয়ে না খেয়ে অতি মানবেতর জীবন যাপন করছে।’

জানা যায়, দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নন-এমপিও এক লাখ ১০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। যারা সরকার থেকে বেতন পান না। আবার স্কুল-কলেজ থেকেও তেমন কোনো আর্থিক সুবিধা পান না। প্রায় ১০ বছর এমপিওভুক্তি বন্ধ থাকার পর গত ২৩ অক্টোবর নতুন দুই হাজার ৭৩০টি প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী, যা গত জুলাই থেকে কার্যকর হওয়ার কথা। তবে এখনো সেসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্তির সুবিধা পাননি। করোনায় এই কার্যক্রমও অনেকটা পিছিয়ে গেছে। ফলে লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী চরম দুর্দশায় জীবন পার করছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের মধ্যেই যেন শিক্ষক-কর্মচারীরা বেতন-ভাতা পান সে জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। ছুটির মধ্যেও নতুন এমপিওভুক্তি নিয়ে কাজ চলছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোড সৃষ্টিসহ অনলাইনের যা কাজ আছে, সেগুলো করা হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরকে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, ‘যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ। এখন প্রজ্ঞাপন জারির জন্য অপেক্ষা। ছুটির সময়েও আমরা কিছু গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে রাখছি। যাতে দ্রুততম সময়ে সব কাজ শেষ করা যায়। প্রজ্ঞাপন জারির পর স্বাভাবিক নিয়মেই শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করতে হবে। তবে সব কাজ যেন দ্রুততম সময়ে শেষ হয় সে ব্যাপারে সবাইকে অধিদপ্তর থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে।’ জানা যায়, এমপিওভুক্তির জন্য প্রাথমিক তালিকাভুক্ত দুই হাজার ৭৩০টি প্রতিষ্ঠানকে দুই ভাগ করে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এর মধ্যে স্কুল ও কলেজ যাচাই করেছে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর। আর কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদরাসা যাচাই করেছে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাদরাসা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।

মাউশি অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে অনলাইনে শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন করতে হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রত্যেক শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওসংক্রান্ত কাগজপত্র প্রতিষ্ঠান প্রধান অনলাইনে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে আপলোড করবেন। এরপর তা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা যাচাই শেষে পাঠাবেন জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে। তিনি সন্তুষ্ট হলে সেই নথি পাঠাবেন আঞ্চলিক উপপরিচালকের কাছে। উপপরিচালক তা নিষ্পত্তি করে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য এমপিওসংক্রান্ত কেন্দ্রীয় কমিটিতে উপস্থাপন করবেন। প্রত্যেক বিজোড় মাসের সভায় তা চূড়ান্ত হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এভাবে শিক্ষকদের চার ঘাটে ধরনা দিতে হবে। ঘুষ ছাড়া বেশির ভাগ শিক্ষকই কোনো অফিস থেকে কাগজ ছাড় করতে পারেন না। ফলে চলতি অর্থবছরে সব শিক্ষক-কর্মচারীর এমপিওভুক্ত হওয়াটা কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ নির্দেশনা ছাড়া এই কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। আর এই এমপিও শেষ না হলে আগামী অর্থবছরে নতুন এমপিওভুক্তির কাজও ধরা সম্ভব হবে না। তবে শিক্ষাসচিব বলেন, ‘আগামী অর্থবছরে অর্থপ্রাপ্তি সাপেক্ষে নতুন এমপিওভুক্তির কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’

বাংলাদেশ নন এমপিও শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, ‘করোনার এই সময়ে আমাদের শিক্ষক-কর্মচারীরা চরম দুর্দশায় প্রতিটি দিন পার করছেন। প্রতিদিনই একাধিক শিক্ষক-কর্মচারী ফোন করে তাঁদের দুর্দশার কথা জানাচ্ছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘নতুন এমপিওভুক্ত হওয়া প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা গত ছয় মাসেও বেতন-ভাতা পাননি। চলতি অর্থবছরে এই কাজ শেষ না হলে আগামী অর্থবছরে সরকার নতুন প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তিতে কতটা আগ্রহী হবেন তা নিয়েও আমরা শঙ্কায় রয়েছি।’


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.