এইমাত্র পাওয়া

কোভিড-১৯ ও সদ্য সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষকদের আত্মীকরণ হালচাল

মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন।।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ সকল শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিকট স্বল্প খরচে উচ্চ শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিগত ৩০ জুন, ২০১৬ সালে অর্থাৎ প্রায় ৪ বছর আগে ১৯৯টি কলেজ ক্রমান্বয়ে অদ্যবধি ৩০৫টি কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দেন।

কিন্তু বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারদের একাংশের বৈরী, অসৌজন্যমূলক ও অসহযোগিতামূলক আচারণ ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৬ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর চাকরি আত্তীকরণ সম্ভব হয়নি। ফলে এই চার বছরে প্রায় ৮০০ শিক্ষক সরকারি কোনরূপ সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই বেসরকারিভাবেই অবসরে গেছেন, নিদারুণ অর্থে কষ্টে ভুগছেন প্রায় সাড়ে ৫ হাজার নন-এমপিও শিক্ষক, শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে সদ্য সরকারিকৃত কলেজগুলোর স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম।

অনেকটা অহেতুক দীর্ঘ সময় নষ্ট করে গত ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সকল কাগজপত্র যাচাই বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

অহেতুক সময় নষ্ট করার বলার কারণ হচ্ছে- কাগজ যাচাই বাছাই করার নামে যে সময় তারা নষ্ট করেছেন আমি মনে করি তা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রোণিত ও অযৌক্তিক। কেননা বেসরকারি কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ প্রদান হতে শুরু করে এমপিও প্রদান, সিনিয়র স্কেল, প্রমোশন সব কিছু তাদের হাত দিয়ে হয়েছে। তবে এখন কেন বলা হচ্ছে? কতিপয় শিক্ষকদের নিয়োগ অবৈধ, এমপিও অবৈধ।

আর এত জাল সনদধারী শিক্ষকের চাকুরী এমপিও বা হল কি করে? মাউশিতে তো আর বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের কর্তৃত্ব নেই। তার মানে কি বলতে হবে “সর্ষের মধ্যে ভূত”! তারা কারা যারা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হয়ে প্রজাতন্ত্রের কাজকে অহেতুক দীর্ঘায়িত করছে? মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাকে বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি করছে?

মাউশিতে যখন শেষবার মূল কাগজপত্র যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছিল তখন আমার কলেজের পক্ষে আমিও সেখানে গিয়েছিলাম। যাচাই বাছাইয়ের সময়ে দেখলাম সারা দেশে অভিজ্ঞ ও সিনিয়র বিসিএস শিক্ষা কর্মকর্তা থাকেত কিছু জুনিয়র শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা যারা কিনা “নো বিসিএস, নো ক্যাডার” আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল তাদেরকে দিয়ে যাচাই বাছাইয়ের কাজ করানো হয়েছে। কেন এমনটা করা হল?

মূল উদ্দেশ্য কি বেসরকারি শিক্ষকদের অপদস্ত করা? যাচাই বাছাইয়ের সময়ে বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও অনেক সিনিয়র শিক্ষকদের সাথে তাদের অধিকাংশদের আচারণ-কথাবার্তা শোভন ও সহযোগিতামূলক ছিল না। আমি দেখেছি কিছু কলেজের অধ্যক্ষ রাগে ক্ষোভে যাচাই বাছাইয়ের কক্ষ হতে বের হয়ে গেছেন, অনেকে নীরবে অশ্রু সংরবণ করেছেন। যা খুবই দুঃখজনক।

(সংশিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষকদের চাকরি আত্তীকরণের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরির প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে কাগজপত্র ‘যাচাই’। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের (মাউশি) দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গত ৩ বছরে একই কাগজপত্র তিনবার যাচাই করেন। এভাবে কাজটি ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

অতীতে নজির থাকা সত্ত্বেও নির্বাচিত কলেজগুলোর শিক্ষকদের চাকরি যাতে ক্যাডারভুক্ত না হয়, সে লক্ষ্যে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যাপক শাহেদুল খবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে আন্দোলন হয়। আন্দোলনের মুখে এসব কলেজের শিক্ষকরা ক্যাডারভুক্ত হতে পারেননি।

সদ্য সরকারিকৃত কলেজের শিক্ষক নেতারা মনে করেন, এখন জাতীয়করণের মূল কাজটি মাউশির যে শাখা করছে, সেটির বর্তমান পরিচালক উল্লিখিত শাহেদুল খবীর চৌধুরী। অপরদিকে ওই আন্দোলন চলাকালে যারা টি-শার্ট আর শাড়িতে ‘নো বিসিএস নো ক্যাডার’ লোগো লাগিয়ে রাজধানীতে ঘোরাফেরা করেছেন ও ফেসবুকে প্রোফাইল পিকচার লাগিয়েছেন তারা ছিলেন ও আছেন এই কাজে বিভিন্ন ডেস্কের দায়িত্বে। দৈনিক যুগান্তরঃ ১৪ জানুয়ারি ২০২০)

যাহোক অবশেষে সকল কলেজের ফাইল যখন শিক্ষামন্ত্রণালয়ে তখন সেখানেও লোকবল সংকট। তাছাড়া সেখানে আরো নতুন সংকট তৈরি হয়েছে যে কলেজগুলো সরকারিকরণের কাজ বিলম্বিত করতে মাউশির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ৫৫টি ত্রুটি ‘আবিষ্কার’ করেন। অবশ্য এর মধ্যে বেশকিছু যৌক্তিক বলে জানা গেছে।

এগুলো হচ্ছে নিয়োগের ব্যাপারে শূন্যপদ, গভর্নিং বডির সিদ্ধান্ত, বোর্ড গঠন, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, লিখিত-মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ ও এর নম্বরপত্র, প্রার্থীর কাম্য যোগ্যতা, নিয়োগপত্র, যোগদানপত্র ইত্যাদি।
বাংলাদেশ সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদের সভাপতি মোঃ আতাউর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক ড. এম আহাম্মদ আলী মল্লিকের নেতৃত্বে একটি দল বেশ কয়েকবার সচিব মহোদয় মোঃ মাহবুব হোসেন স্যার, অতিরিক্ত সচিব (কলেজ) মহোদয় মোঃ বেলায়েত হোসেন তালুকদার স্যারের সাথে দেখা করে সরকারিকরণের বিগত ৪ বছরের সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন।

তার সাথে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সালে মাননীয় স্পিকার মহোদয়, ডেপুটি স্পিকার মহোদয়ের সাথে দেখা করে তাঁদের মাধ্যমে সরকারিকরণের বিগত ৪ বছরের কার্যক্রম তুলে ধরে দ্রুত সরকারিকরণের কাজ সমাপ্ত করার জন্য স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

যার ফলশ্রুতিতে সরকারিকরণের কাজের কিছুটা গতি বাড়লেও সারা বিশ্বের ন্যায় বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে প্রভাবে কোভিড-১৯ রোগের প্রাদুর্ভাবে মনে হচ্ছে সরকারিকরণের কাজের গতি মন্থর।

উল্লেখ্য, শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দ্বারা মোট তিন দফায় কলেজগুলো পরিদর্শন ও তথ্য যাচাই করা হয়। ২০১৬ সালে কলেজগুলো জাতীয়করণে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির পর মাউশির টিম সরেজমিন পরিদর্শন করে ও প্রত্যেক শিক্ষকের কাগজপত্র যাচাই করে। এরপর জাতীয়করণের গেজেট হওয়ার কথা।

কিন্তু ক্যাডার কর্মকর্তাদের আন্দোলন ও রিটের কারণে ২ বছর ২ মাস ১৪ দিন বিলম্বে ২০১৮ সালের ৩১ জুলাই নতুন সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা-২০১৮ জারি করা হয়। এতে বলা হয়, নতুন সরকারি হওয়া কলেজ শিক্ষকরা নন-ক্যাডার মর্যাদা পাবেন। অথচ দেশ স্বাধীনের পর আগের সব বিধিতে ক্যাডার মর্যাদা দেয়া হতো।

এরপর ২০১৮ সালের ১২ আগস্ট প্রতিষ্ঠান সরকারিকরণের আদেশ (জিও) জারি করা হয়। অতঃপর দীর্ঘ সময় ধরে যাচাই বাছাই করে অযৌক্তিক কালক্ষেপণ করে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে এসে সকল কলেজের ফাইল মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রণালয়ের কাজ শেষ হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের ফাইল যাবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে। এরপর ফাইল যাবে অর্থ মন্ত্রণালয় ও সরকারি কর্মকমিশনে (পিএসসি)।

৩০ জুন ২০১৬ সালে কলেজগুলো সরকারি ঘোষণার পর আনন্দে ভাসিয়েছিল বেসরকারি কলেজ শিক্ষকদের। যার ফল ২০১৭ কিংবা ২০১৮ সালে পাওয়ার কথা কিন্তু সময়ের ব্যবধানে “বিসিএস শিক্ষা সমিতি”র অযৌক্তিক আন্দোলনে এ আনন্দ ‘মধুর বেদনা’ হিসেবে পরিণত হয়েছে।

সরকারিকরণের নানা শর্তের বেড়াজালে পড়ে এসব কলেজের শিক্ষকদের এখন সুযোগ-সুবিধাভোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘশ^াস ফেলতে হচ্ছে। একইসাথে সরকারিকরণের দীর্ঘসূত্রতার রেশ কাটতে আরো কয়েক বছর লাগবে এমন বাস্তবতা মেনেই দিন পার করছেন কলেজ শিক্ষকরা।

৩০৫ কলেজের নন-এমপিও শিক্ষকরা আজ দিশেহারা। তাদের নাই নিয়মিত বেতন। অনেকে যাই কিছু টিউশনি করে সংসার ব্যয় নির্বাহ করত কোভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাবে আজ তাও বন্ধ। বিভিন্ন কলেজের প্রায় সাড়ে ৫ হাজার নন-এমপিও শিক্ষকদের মধ্যে প্রায় ৩ হাজার শিক্ষক চরম অর্থে কষ্টে জর্জরিত। তারা না পারছে কিছু করতে না পারছে হাত পাততে। তারা আজ মহাসংকটে, সাথে তাদের পরিবার পরিজনও।

যেখানে মানুষের ১ মাস বেতন না থাকলে হাহাকার লেগে যায় সেখানে প্রায় ৪ বছর কিভাবে তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে তা তারা ব্যতীত অন্য কেউ বুঝবেনা। যার ক্ষুধা আছে সে জানে ক্ষুধা কি জিনিস। ক্ষুধার চেয়ে বড় কষ্টের জিনিস মনে হয় পৃথিবীতে অন্য কিছুই নেই।
পরিশেষে মানবতার মা, ৩০৫ কলেজ সরকারিকরণের মা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নিকট আবেদন জানাচ্ছি খুব দ্রুত যাতে সরকারিকরণের কাজ শেষ হয় তার জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে আরো একবার যেন তাগাদাপত্র দেন।

অন্যদিকে এর মধ্যে নন-এমপিও শিক্ষকদেরকে যেন সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয় তার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। প্রয়োজনে তা পরবর্তীতে সমন্বয় করা হোক।

 লেখক-কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ সরকারি কলেজ শিক্ষক পরিষদ (বাসকশিপ)


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.