আহমদ রফিক।।
পাকিস্তানি আমলে পূর্ববঙ্গে সংঘটিত ভাষা আন্দোলন আপাতদৃষ্টিতে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক চরিত্রের হলেও এ আন্দোলনের অর্থনৈতিক-সামাজিক তাৎপর্য ছিল জাতীয় জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যেমন প্রেক্ষাপট বিচারে, তেমনি এর উত্তর প্রভাবের ক্ষেত্রে। ভাষা আন্দোলন, বিশেষ করে ১৯৫২ ফেব্রুয়ারি তথা একুশের আন্দোলন। স্বল্পকালীন হয়েও পূর্ববঙ্গের সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রে এক অভাবিত বাঁকফেরা চরিত্রবদল ঘটিয়েছিল।
পরবর্তী কয়েক বছর সে ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রকাশ সাহিত্যসৃষ্টি ও সংস্কৃতিচর্চার আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতায় যা বিশেষভাবে প্রকাশ পেয়েছিল সে সময়কার সাহিত্য-সংস্কৃতির সম্মেলনগুলোতে। যেমন কুমিল্লায় (১৯৫২-এর আগস্ট), ঢাকায় (১৯৫৪) ও টাঙ্গাইলের কাগমারীতে (১৯৫৭)। তাছাড়া জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানেও তা স্পষ্ট, যেমন বাংলা নববর্ষ, রবীন্দ্র-নজরুলজয়ন্তীর উদযাপনে। একইভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক চেতনার প্রকাশ ঘটে বায়ান্ন-পরবর্তী পূর্ববঙ্গের সাধারণ নির্বাচনে; যার ফলে পূর্ববঙ্গে স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ রাজনীতির অনেকটাই উচ্ছেদ। ১৯৫৩ সালে গঠিত যুক্তফ্রন্টের ২১ দফাভিত্তিক নির্বাচনে একচেটিয়া বিজয় এবং যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠন (১৯৫৪) তার প্রমাণ। রাজনৈতিক বিশ্নেষকদের মতে, যুক্তফ্রন্টের ওই ধস নামানো বিজয়ের পেছনে ছিল দেশব্যাপী একুশে চেতনার প্রভাব। স্মরণযোগ্য যে, বায়ান্নতেই ভাষাকেন্দ্রিক ছাত্র আন্দোলন দেশব্যাপী গণআন্দোলনে পরিণত হয়ে জনমনে ভাষিক জাতীয়তাবাদের বীজতলা তৈরি করে, পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক ঘটনায় যা অঙ্কুরিত ও বিকশিত।
কথাটা আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বে বারবার উচ্চারিত যে, ভাষা আন্দোলনের সূত্র প্রভাবেই বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ এবং পরিশেষে ঊনসত্তরের গণজাগরণ হয়ে একাত্তরের রণাঙ্গনে উপস্থিত এবং পরিণামে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয়। ভাষা আন্দোলনের বহুমাত্রিক তাৎপর্য বিবেচনা করেই জাতিসংঘের ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারির শহীদ দিবসকে `আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস` হিসেবে ঘোষণা করে। একুশের তথা ভাষা আন্দোলনের আন্তর্জাতিক মর্যাদা ও স্বীকৃতি এভাবে ইতিহাস চিহ্নিত হয়ে ঐতিহাসিক মর্যাদা অর্জন করে।
দুই.
জাতীয় পর্যায়ের এমন একটি আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক, বিশেষভাবে অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংশ্নিষ্টতা বিচার নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের চিন্তা ভিন্ন নয়। ব্রিটিশ ভারতে অবিভক্ত বঙ্গদেশের পূর্বাঞ্চল (বর্তমান বাংলাদেশ) আর্থ-সামাজিক বিচারে পশ্চাৎপদ অবস্থানেই ছিল; যদিও কৃষি উৎপাদনে এ অঞ্চল এবং সার্বিক বিচারে কৃষকবঙ্গ সমগ্র প্রদেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড তৈরির অন্যতম সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত। সে শক্তি নানা পথে কেন্দ্রীভূত হয় রাজধানী কলকাতায়।
ইংরেজ শাসনামলে মেকলের বরপুত্র হিসেবে চিহ্নিত বঙ্গীয় শিক্ষিত এলিট শ্রেণি থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সন্তান জমিদার-ভূস্বামীদের কলকাতাকেন্দ্রিক অবস্থানও বঙ্গের অর্থনৈতিক চরিত্র নিয়ন্ত্রণ করেছে। বঙ্গের বিশেষত পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যার বৃহৎ অংশ কৃষক, কারিগর শ্রেণির মানুষ এবং তাদের অধিকাংশ মুসলমান। জমিদার-মহাজন বনাম কৃষক শ্রেণির অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব সমাজে কতটা প্রবল ছিল, তার প্রমাণ মেলে পূর্ববঙ্গে দীর্ঘ সময়জুড়ে সংঘটিত কৃষক বিদ্রোহ ও আন্দোলন।
সে ঘটনাবলি ইতিহাসে মোটামুটিভাবে সংকলিত। ধারাবাহিক এসব আন্দোলন ও বিদ্রোহের চাপে ইংরেজ শাসকের টনক নড়ে, কিছুটা হলেও তাকাতে হয় প্রজাস্বার্থের দিকে। সরকারি তাগিদে প্রণীত হয় ১৮৮৫-তে প্রজাস্বত্ব আইন এবং সমাজ ও রাজনীতির ধারাবাহিক চাপে ক্রমান্বয়ে প্রজাস্বত্ব আইনের সংশোধন ও সংস্কার এবং সেই সঙ্গে মুসলমান নিয়ন্ত্রিত প্রজা-রাজনীতির উদ্ভব ও বিকাশ। বিশ শতকের প্রথম দিকে মুসলিম রাজনীতিতে এর বিশেষ অবস্থান। মনে রাখতে হবে যে, ব্রিটিশ ভারতে অন্যতম প্রধান উর্বর ও উৎপাদনক্ষম ভূমিবঙ্গে, পাঞ্জাবে, বিশেষভাবে পূর্ববাংলায়। কিন্তু বঙ্গে শাসক শ্রেণির প্রবর্তিত ভূমিব্যবস্থার কারণে উৎপাদক কৃষক শ্রেণির অর্থনৈতিক দুর্দশা ছিল প্রবাদপ্রতিম। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, জমিদার-মহাজনের দ্বন্দ্ব সমাজের চাপে শোষিত কৃষক শ্রেণি।
সামন্ত ভূস্বামীদের প্রজা শোষণের নির্মমতার প্রতিক্রিয়ায় জন্ম নেয় দীর্ঘস্থায়ী প্রজাবিদ্রোহ ও সেই সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ঐতিহাসিক কারণে সৃষ্ট সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শোষক জমিদার ও শোষিত প্রজার ধর্ম ভিন্ন হওয়ায় সাম্প্রদায়িক আবহ অনেকটা অবধারিত বা ভবিতব্য হয়ে ওঠে। যাই হোক, কৃষক বিদ্রোহগুলোর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় প্রজাদের জন্য সুযোগ-সুবিধা আদায় ও নির্যাতন বন্ধে গড়ে ওঠে মধ্যশ্রেণির তৎপরতায় প্রজা-রাজনীতি। বিশ শতকের বিশের দশক থেকে ত্রিশের দশকের কালপরিসরে প্রজা-রাজনীতির উদ্ভব ও বিকাশ মূলত ভূমি-সংশ্নিষ্ট মুসলমান রাজনীতিকদের হাত ধরে।
ভারতে এর অনেক আগে জনৈক ইংরেজ আমলার হাত ধরে ১৮৮৫ সালে দেশীয় স্বার্থে যে জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা, তার নেতৃত্বে ছিল বোম্বাই-গুজরাট অঞ্চলের বণিক ও শিল্পপতি শ্রেণির নায়ক এবং বঙ্গের জাতীয়তাবাদী ঘরানার জনাকয় উচ্চশিক্ষিত এলিট। দুর্ভাগ্য, ভারতীয় ও বঙ্গীয় রাজনীতির যে জাতীয় কংগ্রেস, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় আবেদন-নিবেদনে তাদের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় কংগ্রেস সর্বজনীন চরিত্রের সেক্যুলার জাতীয়তাবাদী প্রতিষ্ঠান হতে পারেনি। এর বড়সড় অংশে ছিল ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ, যে স্বাতন্ত্র্যবাদ আরও প্রকট মাত্রায় দেখা যায় ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগ সংগঠনে। এ দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে ও রাজনীতিতে সম্প্রদায়বাদ প্রধান হয়ে ওঠার কারণে শাসকের সঙ্গে আপসরফায়, প্রবল রক্তস্রোতে ভারত বিভাগ ও স্বাধীনতা অর্জন- সেই সঙ্গে বঙ্গ বিভাগ। সৃষ্টি ভারত ও পাকিস্তান নামের দুই ডোমিনিয়ন।
এই বিভাজন ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পূর্ববঙ্গ। মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক প্রচারে প্রভাবিত বাঙালি মুসলমান তা বুঝতে পারেনি। তাই চোখ বুঝে তারা মুসলিম লীগের বাক্সে ভোট দিয়েছে (১৯৪৬)। পাকিস্তান অর্জন করতে গিয়ে যুক্তবঙ্গের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কেন্দ্র রাজধানী কলকাতা হারায় দ্বিভাজিত বঙ্গের পূর্ববঙ্গ (পূর্ব পাকিস্তান)। যুক্তবঙ্গের শিল্প-বাণিজ্য-ব্যাংক-বীমা তথা অর্থকরী শক্তি থেকে যায় বিভাজিত পশ্চিমবঙ্গে। ফলে পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক সংকট শুরু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্মলগ্ন থেকে। তাতে বাতাস দেয় পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থিত পাক রাজনীতির কেন্দ্রীয় শাসক শ্রেণি।
তিন.
স্বপ্নের পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও বাঙালি মুসলমানের আর্থ-সামাজিক সমস্যা-সংকট শুরু ১৯৪৭-এর আগস্ট থেকেই। খাদ্য সংকট, লবণ সংকট, উচ্চ দ্রব্যমূল্য, ব্যাপক চোরাচালানের মতো ঘটনাদিতে তা পরিস্ম্ফুট। দেশে আধা দুর্ভিক্ষের মতো অবস্থা। এ অবস্থা পশ্চিম পাকিস্তানে দেখা দেয়নি। শিল্পকারখানা, ব্যাংক-বীমা-বাণিজ্য, উচ্চ শিক্ষায়তন- সবই কেন্দ্রীভূত পশ্চিম পাকিস্তানে, মূলত পাঞ্জাবে ও সিন্ধুতে। বিভাজিত বঙ্গদেশের পূর্ববঙ্গের এমন অর্থনৈতিক দুরবস্থার আশঙ্কা বাঙালি রাজনীতিকের বিচক্ষণতায় ধরা দেয়নি। বড় বিশ্বাস ছিল জিন্নাহ-লিয়াকত প্রমুখ মুসলিম লীগ নেতাদের ওপর। আর প্রচারণার গুণে সাধারণ মানুষ পাকিস্তানের সুখস্বপ্নে বিভোর, যেন হাতে পাবে জাদুর চেরাগ। সদ্য বিভাজিত পূর্ববঙ্গের শিল্পকারখানার শূন্যতা অনেকটা পূরণ করে অবাঙালি শিল্পোদ্যোক্তাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত পাটকল, বস্ত্রকল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরির কারখানা; তেমনি ব্যাংক, বীমার মতো প্রতিষ্ঠান মূলত তাদেরই; যেমন- ইস্পাহানী, আদমজী, বাওয়ানী, দাউদ প্রমুখের। শিল্প-বাণিজ্য প্রশাসনিক উচ্চপদ সবই অবাঙালি পাকিস্তানিদের একচেটিয়া দখলে। শিক্ষিত ও অর্থকরী হিন্দু। সম্প্রদায়ের সদস্যদের স্থান প্রধানত দখল করে অবাঙালি, সামান্য বাঙালি মুসলমানদের ভাগে। এর কারণ দেশ শাসন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত অবাঙালি শাসক শ্রেণির হাতে, তারাই সবকিছুর ভাগবাটোয়ারার অধিকারী। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে আর্থ-সামাজিক সবদিককার সুবিধাভোগী বিভিন্ন অবাঙালি শ্রেণি, বিশেষ করে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণি। তাই পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যা বিচারে বাঙালি গরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তানের রাজধানী ক্রমান্বয়ে করাচি, রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদ। করাচি বন্দরের আধুনিকায়ন প্রাধান্য পায়। পাঞ্জাব ও সিন্ধুতে স্থাপিত হয় নানা ধরনের শিল্পকারখানা, বিশেষ করে বস্ত্র শিল্প, ভারী শিল্প, নতুন উচ্চ শিক্ষায়তন। অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কথিত ২২ পরিবারের হাতে আর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ অবাঙালি নেতৃত্বের (সামরিক-বেসামরিক) হাতে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সবদিক থেকে পিছিয়ে পড়ে পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানি বাঙালি। তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাজ হলো অবাঙালি নেতৃত্বের সব কাজে সায় দেওয়া।
চার.
এমন এক উদ্ভট ব্যবস্থার পাকিস্তানি রাজনীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পতাকা ওড়ায় পূর্ববঙ্গের ছাত্র-যুব সমাজের বড়সড় অংশ। উপলক্ষ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নির্ধারণ। এদের লক্ষ্য একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষিত উর্দুর পাশে বাংলাকে প্রতিষ্ঠিত করা। কারণ, রাষ্ট্রভাষার সঙ্গে জড়িত ভাষিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ। এক কথায় পাকিস্তানে বাঙালির ভবিষ্যৎ।
একমাত্র উর্দু রাষ্ট্রভাষার প্রতিষ্ঠা পূর্ববঙ্গীয় বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও নান্দনিক ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেবে- এমন আশঙ্কা থেকে স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রেরণায় বাঙালি ছাত্র-যুব সমাজ প্রতিবাদে সোচ্চার হয়ে ওঠে। বিস্ময়কর যে, এ প্রতিবাদের তাত্ত্বিক সূচনা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কিছু আগে জুন-জুলাইতে (১৯৪৭) বাংলা রাষ্ট্রভাষার পক্ষে লেখালেখিতে। এরপর সংগঠিত পর্যায়ের আন্দোলন ১৯৪৮, ১৯৫০, সর্বশেষ ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারিতে। শেষোক্ত আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে কয়েকজন বিক্ষোভকারীর মৃত্যু ভাষা আন্দোলনকে দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়; এমনকি দূর গ্রামের শিক্ষায়তনে। এখানেই ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক তাৎপর্য।
মূলত রাজনৈতিক তাৎপর্য অর্থাৎ রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত নানামাত্রিক জাতীয় উন্নয়নের বিষয়টি নিয়েই ভাষা আন্দোলনের কারিগরদের আপসহীন লড়াই শুরু হয়। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদ নেতাদের পিছুটান তাদের লড়াকু তৎপরতায় প্রভাব ফেলতে পারেনি। যেমন ২০ ফেব্রুয়ারিতে জারি ১৪৪ ধারা ভাঙার বিষয়টিতে অবিশ্বাস্য দৃঢ়তা প্রকাশ করে ছাত্র-যুব সমাজ, যদিও রাজনৈতিক নেতারা এ ক্ষেত্রে লড়াইয়ে নামতে রাজি ছিলেন না। অকুতোভয় ছাত্র-যুব সমাজ সব বাধাবিপত্তি অগ্রাহ্য করে লড়াইয়ে নেমেছিল। লক্ষ্য- রাষ্ট্রভাষা বাংলা, রাজনীতির ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অধিকার এবং জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দাবি আদায়। এ কথা সত্য যে, ১৯৪৭-এর আগস্ট থেকে ১৯৫১ পর্যন্ত অর্থাৎ প্রাক-বায়ান্ন পর্বে কেন্দ্রীয় সরকারের অনুসৃত পূর্ববঙ্গবিরোধী বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক নীতিমালার বিষয়গুলো আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে কিছুটা প্রচ্ছন্নই ছিল। অর্থনীতি বলে কথা। সেগুলো পরে বিশেষ করে ষাটের দশকে এক দেশে দুই অর্থনীতির বিবেচনায় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে ক্রমশ এর বিস্তার। যেমন যুক্তবঙ্গে রাজধানী কলকাতাকে সমৃদ্ধ করে তুলতে মধ্য ও বিত্তবান শ্রেণিসহ গোটা পূর্ববঙ্গের অর্থনৈতিক ভূমিকা ছিল পশ্চাদ্ভূমি তথা হিন্টারল্যান্ডের মতো, তেমনি একই ভূমিকা হয়ে ওঠে পশ্চিম পাকিস্তানের (পাঞ্জাব-সিন্ধু) উন্নয়নে পূর্ববঙ্গের। তাই পাকিস্তান তথা পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়ন খাতের বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হয় পূর্ববাংলার রপ্তানিযোগ্য পণ্যের; যেমন- পাট, চা, চামড়া ইত্যাদি।
এ ছাড়াও ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক আমদানি-রপ্তানির বৈষম্য, রাজস্ব আয়-ব্যয়ে বৈষম্য, উন্নয়ন পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নে বৈষম্য (ছোট্ট উদাহরণ- ঢাকার মধ্যেই দ্বিতীয় রাজধানী তথা সেকেন্ড ক্যাপিটাল নির্মাণ, তাও আবার ঐতিহাসিক মণিপুরি ফার্মটিকে ধ্বংস করে)। এ জাতীয় বৈষম্য ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থায়। সেচ ব্যবস্থায়, শিল্পকারখানা স্থাপনে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে, ভারী শিল্প স্থাপনের মতো বহুবিধ ক্ষেত্রে। আর বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান বা সাহায্য ব্যবহারে দুই পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্য ও একদেশদর্শিতা হয়ে ওঠে বহু আলোচিত বিষয়। রাজনীতিসচেতন বাঙালি শিক্ষিত শ্রেণির অনেকেরই চোখে পড়েছে পূর্ববঙ্গের শিল্পকারখানা ও বৃহৎ বাণিজ্যে অবাঙালি পুঁজিপতি ও বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর একাধিপত্য এবং সেই সূত্রে অর্জিত সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার। পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানে পাচার কোনো কোনো বাঙালির চোখে অনৈতিক মনে হয়নি। কিন্তু পাকিস্তানের পূর্ব প্রান্তিক প্রদেশ পূর্ববাংলা তার ফলে অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ দুর্বল হয়েছে। বলতে হয়, জিন্নাহর পাকিস্তান মূলত পাঞ্জাব-সিন্ধুর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্যই। বাঙালি ও পূর্ববঙ্গের প্রতি বিজাতীয় বিরূপতা ও বৈষম্য বিশেষত ভাষিক বৈরিতা বাঙালি তরুণদের ভাষা আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করে। এরই ধারাবাহিকতায় জাতীয়তাবাদী গণআন্দোলন এবং একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধ, পরিণামে স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বভাবতই ভাষা আন্দোলনের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচার রাজনৈতিক বিচারে গুরুত্বপূর্ণ।
ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
