ইহা একটি ব্যতিক্রমী শিক্ষা

দেশের চিরাচরিত পারিবারিক সংস্কৃতি ভাঙিয়া পড়িতেছে। যৌথ পরিবার ভাঙিতেছে অর্থনৈতিক ও পারিপার্শ্বিক কারণে। ভাঙিতেই পারে। কিন্তু তাহা বলিয়া পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও স্নেহবোধ ক্ষয় হইতে পারে না; মায়ার বন্ধন নষ্ট হইতে পারে না। তাহা মানিয়া লওয়া কষ্টের। দুর্ভাগ্যবশত এই সমাজে পিতা-মাতা ও সন্তানদের মধ্যে রয়েছে মতবিরোধ, একের প্রতি অন্যের বন্ধনও দুর্বল হইয়া পড়িতেছে। প্রায়শই পত্রিকার পাতায় পুত্রের হাতে পিতা খুন অথবা অশীতিপর বৃদ্ধ মাতাকে রাস্তায় ফেলিয়া যাইবার সংবাদ দেখিতে পাওয়া যায়। আমরা প্রায়ই অভিযোগ শুনিতে পাই, ইদানীং সন্তানদের আর পূর্বের মতো মা-বাবার প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা নাই!

কথা যে খানিকটা সত্য তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। এই পরিস্থিতি অথবা পরিবেশ হইতে মুক্তি পাইতে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক পুস্তকের শিক্ষাই যথেষ্ট নহে। প্রয়োজন পাঠ্যপুস্তকের বাহিরে আরো কিছু শিক্ষা প্রদান ও গ্রহণ, যাহার উত্স হওয়া উচিত পরিবার ও স্কুল। আর ইহা মাথায় রাখিয়াই মঠবাড়িয়ার মিরুখালী স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকগণ একটি মহতী উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছেন। ২১ জানুয়ারি মায়ের প্রতি সম্মান ও ভক্তি জানাইতে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সমবেত প্রায় ৯০০ শিক্ষার্থী ভক্তিভরে মায়েদের পা ধোয়াইয়া দিয়াছে। পত্রিকান্তরে তাহার ছবিও প্রকাশ পাইয়াছে। তাহারা ইহার নাম দিয়াছেন ‘মা সমাবেশ’। এই ব্যতিক্রম আয়োজনের জন্য কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ।

মায়ের প্রতি ভালোবাসা শুধু প্রাকৃতিক, সামাজিক বা ধর্মীয় অনুশাসনের বিষয় নহে। বহু দিক হইতে মা জীবনের অপরিহার্য অংশ। আব্রাহাম লিংকন বলিয়াছিলেন, ‘যাহার মা আছে, সে কখনো গরিব নহে।’ আমাদের জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলিয়াছিলেন, ‘মা হইল পৃথিবীর একমাত্র ব্যাংক, যেইখানে আমরা আমাদের সব দুঃখ-কষ্ট জমা রাখি এবং বিনিময়ে লই অকৃত্রিম ভালোবাসা।’ কিন্তু এই মায়ের প্রতিও আমাদের কিছু কর্তব্য রহিয়াছে, যাহা প্রায়শই আমরা ভুলিয়া যাই। সেই কথাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনে করাইয়া দিয়াছেন শিক্ষকগণ! শিক্ষার্থীদের সজাগ করিয়া তুলিবার একটি বিষয় আছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে যদি মায়ের প্রতি ভক্তি ও কর্তব্যের কথা স্কুল কর্তৃপক্ষ মনে স্মরণ করাইয়া দেন তাহা হইলে সন্তানদের সুন্দর জীবন গড়িয়া উঠার সম্ভাবনা আরো বাড়িয়া যায়।

আজকের শিক্ষার্থী আগামী দিনের মা অথবা বাবা। আমরা বিশ্বাস করি, যে ধরনের আচরণ আজকের শিক্ষার্থীরা তাহাদের মাতা-পিতার সঙ্গে করিবে, ভবিষ্যতে নিজেরাও মাতা-পিতা হইয়া একই রকমের আচরণ ফেরত পাইবে। তাই সুস্থ ও সুন্দর জীবন গড়িয়া তুলিতে এই আচরণ শিক্ষা দেওয়া স্কুলের একটি দায়িত্বই বটে। শুধু পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ঐ স্কুলটিই নহে, এমন উদ্যোগ দেশের অন্যান্য স্কুলেও গ্রহণ করা উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। স্কুল শুধু পাঠের স্থান নহে, শিশুদের মানসিক গঠনেও স্কুল একটি বিশাল ভূমিকা রাখিয়া থাকে। আর সেই ভূমিকাটি সুচারুরূপে সম্পন্ন করাই স্কুল কর্তৃপক্ষের পবিত্র দায়িত্ব।


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.