নিউজ ডেস্ক।।
দীর্ঘ বিরতি শেষে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরছে দেশের লাখো শিক্ষার্থী। রোজা, ঈদুল ফিতর, স্বাধীনতা দিবসসহ ৩৭ দিনের টানা ছুটির পর আগামীকাল রবিবার থেকে খুলছে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তবে এই ফেরা কেবল নিয়মিত ক্লাস নয়, একটি উদ্বেগও আছে। কারণ বছরের শুরুতেই সময় হারিয়েছে শিক্ষা, আর সেই ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ এখন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। সামনে অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা, সময় কম, এই বাস্তবতায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক- সবাই এক অনিশ্চয়তার মুখে।
শিক্ষকদের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে মার্চ তিন মাসে কার্যকর ক্লাস হয়েছে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ দিন। জানুয়ারির প্রথমার্ধ কেটেছে বই বিতরণে, এরপর ক্রীড়া প্রতিযোগিতার কারণে ক্লাস ব্যাহত হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনসহ নানা কারণে ক্লাস সীমিত ছিল মাত্র ৪-৫ দিনে। মার্চের পুরো মাসে হাতেগোনা তিন দিন ক্লাস হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবস্তুর ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে শুরুতেই, যা এখন বড় শিখন ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে।
এদিকে সামনে থাকা সময়টাও খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়। এপ্রিল ও মে মাস মিলিয়ে মাধ্যমিক স্তরে তাত্ত্বিকভাবে ৩০-৩২ দিন ক্লাসের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে তা কমে যেতে পারে। ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার কারণে অনেক স্কুলে পাঠদান বন্ধ থাকবে। এতে কার্যকর ক্লাস নেমে আসতে পারে ১৬-১৮ দিনে। অন্যদিকে প্রাথমিক স্তরে ৫ মে থেকে শুরু হচ্ছে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা, অর্থাৎ প্রস্তুতির সময় মিলছে মাত্র ১৮-১৯ দিন।
দীর্ঘ ছুটির কারণে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি পুষিয়ে নিতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর ঈদের পর টানা ১০টি শনিবার ক্লাস নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনও নেই। এতে ক্ষোভ বাড়ছে অভিভাবকদের মধ্যে। তারা বলছেন, একই সংকট থাকা সত্ত্বেও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা বাড়তি ক্লাসের সুবিধা পাচ্ছে না।
রাজধানীর বনশ্রীর একটি বেবসরকারি মাধ্যমিক স্কুলের একজন শিক্ষক নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘বই পেতে দেরি, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, নির্বাচন- সব মিলিয়ে ক্লাসই হয়নি। এখন অল্প সময়ে সিলেবাস শেষ করা কঠিন।’ তিনি বলেন, রমজানের হঠাৎ ছুটির ঘোষণা হওয়ায় বাধ্য হয়ে পড়া হোমওয়ার্ক হিসেবে দিয়েছি। কিন্তু ছুটিতে শিক্ষার্থীরা কতটুকু পড়ে, তা অনিশ্চিত।
বনশ্রী ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সুমাইয়া বলেন, ক্লাস কম হওয়ায় অনেক বিষয় বুঝতে পারেনি। সিলেবাসের বড় অংশ এখনও বাকি। পরীক্ষার আগে চাপ বাড়ছে। এই শিক্ষার্থীর অভিভাবক শফিকুর রহমান খান অভিযোগ করে বলেন, ‘স্কুলে ক্লাস হয় না, প্রাইভেটই ভরসা। বছরজুড়ে ছুটি, কিন্তু পড়াশোনার অগ্রগতি নেই।’
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, মাধ্যমিকেও প্রাথমিকের মতো শনিবার ক্লাস চালু করতে হবে। ছুটির তালিকা পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
শিখন ঘাটতি প্রসঙ্গে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী মনে করেন, শিক্ষার মানোন্নয়নে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদানের বিকল্প নেই, কিন্তু বাস্তবে সেই ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ছে। পাঠ্যবই সরবরাহে দেরি, অনিয়মিত ক্লাস ও ঘন ঘন ছুটির কারণে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা ক্রমেই কমছে। তিনি বলেন, শেখার ঘাটতি নিয়ে করা গবেষণার তথ্যও উদ্বেগজনক হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকেই বহন করতে হবে।’
স্কুল শিক্ষকরা জানান, সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। জুনেই অর্ধবার্ষিক পরীক্ষা, হাতে পর্যাপ্ত সময় নেই। সিলেবাসের অর্ধেক শেষ করাই এখন লক্ষ্য। তবে বাস্তবতা হচ্ছে সময়ের তুলনায় সিলেবাস অনেক বেশি, আর ক্লাসের দিন অনেক কম। প্রাথমিক স্তরে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা এখনও কার্যকর সহায়তা থেকে বঞ্চিত। এভাবে চললে শিক্ষার মান কীভাবে ধরে রাখা সম্ভব?
ছুটি প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) বিএম আব্দুল হান্নান জানান, সাপ্তাহিক দুই দিনের ছুটি ও বিভিন্ন দিবস-উৎসবের কারণে স্বাভাবিকভাবেই ক্লাসের সংখ্যা কমে যায়। কিছু ছুটি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও রমজানে ক্লাস চালুর পরিকল্পনা শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আপত্তিতে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে পাঠদানের সময় বাড়াতে নতুনভাবে কী করা যায়, তা নিয়ে মন্ত্রণালয় ও মাউশি কাজ করছে।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
