।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
মানুষের জীবনে ঋতুর পরিবর্তন যেমন প্রকৃতিকে নতুন রঙে রাঙায়, তেমনি ঈমানদারের জীবনে রমজান আসে আত্মার এক অনন্য বসন্ত হয়ে। শীতের শেষে যেমন মরা ডালে নতুন কুঁড়ি ফোটে, তেমনি পাপ-অবহেলা-গাফিলতিতে আচ্ছন্ন হৃদয়ও রমজানের ছোঁয়ায় সজীব হয়ে ওঠে। এই মাস শুধু রোজা রাখার আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম ও আল্লাহর জিকিরে ডুবে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। তাই একে ইবাদত ও জিকিরের বসন্তকাল বলা অযৌক্তিক নয়, বরং যথার্থ।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে” (সূরা রা’দ, আয়াত ২৮)। এই আয়াত শুধু একটি আধ্যাত্মিক উপদেশ নয়; এটি মানুষের মানসিক ও আত্মিক শান্তির এক চূড়ান্ত সূত্র। আজকের পৃথিবী অস্থিরতা, উদ্বেগ ও প্রতিযোগিতার চাপে বিপর্যস্ত। মানুষ বাহ্যিক সাফল্য পেলেও অন্তরে অশান্তি বয়ে বেড়ায়। অথচ রমজান আমাদের শিখিয়ে দেয়—শান্তি কোনো বাহ্যিক অর্জনে নয়, বরং আল্লাহর স্মরণে।
রমজান মানেই সিয়াম সাধনা। সিয়াম শুধু ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করা নয়; এটি ইচ্ছা ও প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রশিক্ষণ। যখন একজন মুমিন সারাদিন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পানাহার থেকে বিরত থাকে, তখন তার হৃদয়ে আল্লাহর উপস্থিতির অনুভূতি জাগ্রত হয়। এই অনুভূতিই তাকে জিকিরমুখী করে তোলে। কারণ রোজার প্রকৃত চেতনা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন জিহ্বা আল্লাহর নাম উচ্চারণে সজীব থাকে এবং হৃদয় তাঁর স্মরণে ভিজে থাকে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানকে ইবাদতের বসন্তকাল হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বসন্ত যেমন প্রকৃতিকে প্রাণবন্ত করে, তেমনি রমজান মানুষের অন্তরকে প্রাণবন্ত করে তোলে। বছরের অন্য সময় আমরা হয়তো ইবাদতে শৈথিল্য দেখাই, কিন্তু রমজানে সেই অলসতা ভেঙে যায়। মসজিদে তারাবির কাতার দীর্ঘ হয়, কোরআন তিলাওয়াতের সুর ভেসে আসে ঘরে ঘরে, দান-সদকার হাত প্রসারিত হয়। এই সামগ্রিক ইবাদত-পরিবেশ মানুষকে জিকিরে উদ্বুদ্ধ করে।
হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জিকিরের মাধ্যমে জিহ্বাকে তাজা রাখবে, কিয়ামতের দিন সে হাসতে হাসতে জান্নাতে প্রবেশ করবে (বায়হাকি)। এই প্রতিশ্রুতি একজন ঈমানদারের জন্য কত বড় অনুপ্রেরণা! আমরা দুনিয়ার হাসির পেছনে ছুটি, অথচ আখিরাতের চিরস্থায়ী হাসির পথ হয়তো খুব সহজ—নিয়মিত জিকির। “সুবহানাল্লাহ”, “আলহামদুলিল্লাহ”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার”—এই ছোট ছোট বাক্যগুলোই আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। এত সহজ আমল, অথচ কত অবহেলিত!
রমজানে শয়তান শৃঙ্খলিত থাকে—এ কথা হাদিসে বর্ণিত। এর তাৎপর্য হলো, এ মাসে গোনাহের প্রতিবন্ধকতা কমে যায়, সৎকাজের পথ সহজ হয়। তাই এ সময় জিকিরের অভ্যাস গড়ে তোলা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সুযোগ গ্রহণ করি? নাকি ইফতার ও সেহরির বাহারি আয়োজনেই ব্যস্ত থাকি? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপ্রয়োজনীয় ব্যস্ততা কি আমাদের জিকির থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে না?
আল্লাহ হাদিসে কুদসিতে বলেন, বান্দা যখন ঠোঁট নেড়ে আমার জিকির করে, আমি তার খুব কাছে থাকি। এই নৈকট্য কোনো রূপক কল্পনা নয়; এটি এক বাস্তব আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। যে ব্যক্তি নিয়মিত জিকির করে, সে অনুভব করে—তার হৃদয় নরম হয়ে আসছে, অন্যের প্রতি সহানুভূতি বাড়ছে, গোনাহের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্ম নিচ্ছে। অর্থাৎ জিকির শুধু মুখের উচ্চারণ নয়; এটি চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া।
রমজানের আরেকটি বড় শিক্ষা হলো তাওবা ও ইস্তেগফার। “সাইয়্যিদুল ইস্তেগফার” পাঠ করা, আয়াতুল কুরসি তিলাওয়াত করা, “সুবহানাল্লাহি ওয়াবিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আজিম” পড়া—এসব আমল শুধু সওয়াবের হিসাব বাড়ায় না, বরং হৃদয়ের জং পরিষ্কার করে। অন্যায়-অপরাধে মানুষের মন কালিমালিপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর জিকির সেই কালিমা ধুয়ে দেয়। যেমন লোহায় জং ধরলে তা ঘষে পরিষ্কার করতে হয়, তেমনি অন্তরের জং কাটাতে দরকার জিকিরের ঘষামাজা।
সমাজের সামষ্টিক চিত্রেও রমজান এক ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। মানুষ নামাজে মনোযোগী হয়, মিথ্যা ও প্রতারণা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করে, দান-খয়রাতে আগ্রহী হয়। যদি এই চর্চা সারা বছর অব্যাহত থাকত, তাহলে সমাজে নৈতিক অবক্ষয় অনেকটাই কমে যেত। তাই রমজান শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের মাস নয়; এটি সামাজিক সংস্কারেরও সুযোগ।
তবে বাস্তবতা হলো, অনেকের কাছে রমজান কেবল রুটিনে সীমাবদ্ধ। সেহরি, রোজা, ইফতার—তারপর আবার আগের অভ্যাসে ফিরে যাওয়া। অথচ রমজানের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া অর্জন। তাকওয়া মানে আল্লাহভীতি, সচেতনতা, আত্মসংযম। এই তাকওয়া অর্জনের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো জিকিরকে জীবনের অংশ করে নেওয়া। সকাল-সন্ধ্যায় তাসবিহ, কাজের ফাঁকে ফাঁকে আল্লাহর নাম স্মরণ—এসব ছোট অভ্যাস বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য রমজান এক মহাসুযোগ। প্রযুক্তির যুগে মনোযোগ ভেঙে যাচ্ছে, ধৈর্য কমছে। রোজা ধৈর্য শেখায়, জিকির মনোসংযোগ বাড়ায়। যদি তরুণরা রমজানে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় জিকির ও কোরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করে, তবে তাদের মানসিক দৃঢ়তা ও নৈতিক শক্তি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। ব্যক্তিজীবনের সংকট মোকাবিলায়ও তারা অধিক সক্ষম হবে।
রমজানের শেষ দশক আমাদের আরও গভীর ভাবনায় ডাকে। লাইলাতুল কদরের সন্ধান, ইতিকাফ, অধিক পরিমাণে কিয়ামুল লাইল—এসব আমল জিকিরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। এই সময়টুকু যদি আমরা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর স্মরণে কাটাতে পারি, তবে তা আমাদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
আমাদের প্রশ্ন করা উচিত—রমজান শেষে কি আমাদের জিকিরের অভ্যাস থাকবে? নাকি ঈদের আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে তা হারিয়ে যাবে? বসন্তের ফুল যেমন ঝরে পড়ে, তেমনি কি আমাদের ইবাদতের উদ্যমও ঝরে যাবে? যদি তাই হয়, তবে রমজানের শিক্ষা আমরা ধারণ করতে পারিনি।
অতএব, রমজানকে শুধু একটি মাস হিসেবে নয়, বরং একটি প্রশিক্ষণকাল হিসেবে দেখা দরকার। এই মাসে আমরা জিকিরের রুটিন তৈরি করব—সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়া, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক তাসবিহ, নিয়মিত ইস্তেগফার। ধীরে ধীরে এটি অভ্যাসে পরিণত হবে। তখন রমজান শেষ হলেও জিকিরের বসন্ত আমাদের অন্তরে বিরাজ করব।
পরিশেষে বলা যায়, রমজান সত্যিই ইবাদত ও জিকিরের বসন্তকাল। এই বসন্তে যে হৃদয় জেগে ওঠে, সে আর সহজে অন্ধকারে ফিরে যায় না। আল্লাহর স্মরণে যে মন প্রশান্ত হয়, সে মন দুনিয়ার ঝড়েও অবিচল থাকে। তাই আসুন, আমরা রমজানকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করি। জিহ্বাকে তাজা রাখি জিকিরে, হৃদয়কে পরিষ্কার রাখি তাওবায়, জীবনকে সাজাই তাকওয়ার আলোয়। আল্লাহ আমাদের সেই তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/০৫/০৩/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
