এইমাত্র পাওয়া

শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা: শিক্ষকতার বাইরে পেশায় ‘অনুমতি’—বাস্তবতা কতটা যুক্তিসংগত?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।

গ্রামের এক উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল করিম স্যার। সকাল আটটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত তিনি ক্লাস নেন, খাতা দেখেন, অভিভাবকদের অভিযোগ শোনেন। মাস শেষে বেতন হাতে পান এমন এক অঙ্ক, যা দিয়ে সংসারের বাজারের থলেটাই ভরে না। তাই সন্ধ্যায় তিনি নিজের বাড়ির বারান্দায় দু-একজন ছাত্রকে টিউশন পড়ান, আর মাঝেমধ্যে বাজারে গিয়ে একটি স্টেশনারি দোকানে হিসাব লেখার কাজ করেন।

একদিন খবর এলো—শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশ, শিক্ষকতার বাইরে অন্য কোনো পেশায় জড়াতে হলে নিতে হবে অনুমতি। করিম স্যার ভাবলেন, “অনুমতি নেবো? কাদের কাছে? যে বেতনে ভাত জোটে না, সে অনুমতি নেবে কিসের জোরে?”

পরদিন স্কুলে গিয়ে দেখলেন সহকর্মীরা ফিসফিস করছে—“ডাক্তাররা সরকারি হাসপাতাল শেষে প্রাইভেট চেম্বার করেন, আইনজীবীরা সরকারি পদে থেকেও প্র্যাকটিস করেন; কিন্তু শিক্ষকরা নাকি অন্য পেশায় গেলে অনুমতি লাগবে!”

প্রশ্নটি বাস্তব—রাষ্ট্র কি একই মানদণ্ডে সবার জন্য নীতি প্রণয়ন করছে, নাকি শিক্ষকদের ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ হচ্ছে?

বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন সম্প্রতি বলেছেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি অন্য পেশায় যুক্ত হতে হলে অনুমতি নিতে হবে। এই বক্তব্য শিক্ষকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।

সরকারের যুক্তি হতে পারে—শিক্ষক যেন পূর্ণ সময় ও মনোযোগ শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় করেন। কিন্তু বাস্তব প্রশ্ন হলো, শিক্ষকদের আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতা কি সেই সুযোগ দিচ্ছে?

বাংলাদেশে হাজার হাজার সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষক আছেন, বিশেষ করে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা সীমিত বেতনে জীবনযাপন করেন। জীবনযাত্রার ব্যয়, সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, বাসাভাড়া—সব মিলিয়ে অনেকেই বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত আয়ের পথ খোঁজেন। এই প্রেক্ষাপটে ‘অনুমতি’ শব্দটি তাদের কাছে কেবল প্রশাসনিক শর্ত নয়, বরং আত্মমর্যাদার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

রাজশাহীর এক কলেজ শিক্ষক বলেন “আমরা যদি স্কুল-কলেজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করি, তার বাইরে ব্যক্তিগত সময় কীভাবে ব্যবহার করবো, সেটা কি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হতে পারে?

ডাক্তাররা যেমন সরকারি হাসপাতালে দায়িত্ব শেষে প্রাইভেট চেম্বারে বসেন, তেমনি আমরা সন্ধ্যায় কোচিং, ব্যাবসায়ীক প্রতিষ্ঠান যেমন স্টেশনারি দোকান, মেডিসিনের দোকান, কাজী, সাংবাদিকতা, লেখক  বা অন্য কোনো কাজ করলে দোষ কোথায়?”

আরেকজন মাধ্যমিক শিক্ষক বলেন,
“আমাদের বেতন এমন যে মাসের শেষে ধার করতে হয়। রাষ্ট্র যদি সম্মান দেয়, তবে সেই সম্মানের সঙ্গে আর্থিক নিরাপত্তাও দিতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না।”

তাদের বক্তব্যে একটি অভিন্ন সুর—শিক্ষকতা একটি মহান পেশা, কিন্তু মহানতা দিয়ে সংসার চলে না। রাষ্ট্র যদি চায় শিক্ষক পুরো সময় শিক্ষায় নিবেদিত থাকবেন, তবে তার বিনিময়ে উপযুক্ত বেতন ও সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

একজন শিক্ষক নেতা বলেন,
“রাষ্ট্রের নীতি সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী—অনেকে সরকারি চাকরির পাশাপাশি প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন। সেখানে শিক্ষকরা কেন আলাদা নিয়মের মুখোমুখি হবেন?”

তিনি আরও বলেন,
“আমরা দায়িত্বে গাফিলতির পক্ষে নই। কেউ যদি ক্লাস ফাঁকি দিয়ে অন্য পেশায় জড়ান, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হোক। কিন্তু যিনি দায়িত্ব পালন শেষে ব্যক্তিগত সময়ে কাজ করছেন, তাকে অনুমতির বেড়াজালে আটকে রাখা অযৌক্তিক।”

শিক্ষক নেতাদের মতে, এই নির্দেশনা কার্যকর হলে তা হয়তো দুর্নীতির নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে—কারণ ‘অনুমতি’ মানে ফাইল, ফরম, তদবির—যা আবার প্রশাসনিক জটিলতা বাড়াবে।

ঢাকার এক অভিভাবক বলেন,
“আমরা চাই আমাদের সন্তান ভালো শিক্ষা পাক। কিন্তু শিক্ষক যদি আর্থিক চাপে থাকেন, তার মানসিক অবস্থা কেমন থাকবে? তিনি যদি দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেন, তার বাইরে কী করেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয় হওয়া উচিত।”

একজন ব্যবসায়ী মন্তব্য করেন,
“সরকার যদি মনে করে শিক্ষক অন্য পেশায় গেলে শিক্ষার মান কমে যাবে, তবে আগে শিক্ষকদের বেতন বাড়ানো উচিত। নিষেধাজ্ঞা দিয়ে মান উন্নয়ন সম্ভব নয়।”

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এখানে মূল প্রশ্ন হলো ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ বা স্বার্থের সংঘাত। একজন শিক্ষক যদি নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের বাধ্য করে প্রাইভেট টিউশন নেন, তা অবশ্যই অনৈতিক। কিন্তু দায়িত্ব শেষে অন্য পেশায় যুক্ত হওয়া কি স্বার্থের সংঘাত তৈরি করে?

একজন অর্থনীতিবিদ বলেন,
“রাষ্ট্রের উচিত নীতিনির্ধারণে সমতা রক্ষা করা। যদি সব সরকারি কর্মচারীর জন্য একই নিয়ম প্রযোজ্য না হয়, তবে তা বৈষম্যের জন্ম দেয়।”

একজন সমাজবিজ্ঞানী মন্তব্য করেন,
“শিক্ষক সমাজকে আদর্শের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আদর্শের ভার চাপিয়ে দিয়ে তাদের আর্থিক বাস্তবতা উপেক্ষা করা যায় না। সামাজিক সম্মান ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা—দুটোই জরুরি।”

বাংলাদেশে সরকারি চিকিৎসকরা সরকারি দায়িত্ব শেষে প্রাইভেট চেম্বারে বসেন—এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাস্তবতা। আইনজীবীরাও বিভিন্ন দায়িত্বের পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস চালান। তাহলে শিক্ষক কেন আলাদা?

সরকার যদি যুক্তি দেয়—শিক্ষকতা একটি পূর্ণকালীন পেশা—তবে একই যুক্তি কি অন্য পেশার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য নয়? নাকি সমাজে শিক্ষকের কণ্ঠ তুলনামূলক দুর্বল বলেই তাদের ওপর কঠোরতা সহজ?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, শিক্ষকদের সংগঠিত শক্তি তুলনামূলকভাবে কম। তাদের বেতন কাঠামোও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার বিষয়। ফলে নীতিনির্ধারকরা হয়তো মনে করেন—এই শ্রেণির ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ তুলনামূলক সহজ।

সমাধান হতে পারে কয়েকটি ধাপে—
© সব সরকারি পেশাজীবীর জন্য অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন।

© কেউ দায়িত্বে গাফিলতি করলে কঠোর ব্যবস্থা।

© শিক্ষককে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করলে অতিরিক্ত আয়ের প্রয়োজন কমবে।

© যদি অনুমতি বাধ্যতামূলক হয়, তবে তা সহজ ও স্বচ্ছ হতে হবে।

শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা হয়তো শিক্ষার মান উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো—নীতির সাফল্য নির্ভর করে তার ন্যায়সংগত প্রয়োগের ওপর। শিক্ষক যদি দায়িত্ব পালন শেষে অন্য পেশায় যুক্ত হতে চান, তাকে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ বা জটিল অনুমতির বেড়াজালে আটকে রাখা সমাধান নয়।

রাষ্ট্র যদি শিক্ষককে সমাজের আলোকবর্তিকা মনে করে, তবে সেই আলো জ্বালিয়ে রাখতে প্রয়োজন ন্যায়, সমতা ও মর্যাদা। কেবল নির্দেশ দিয়ে নয়, বাস্তব সহায়তা দিয়ে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—
ডাক্তার পারলে শিক্ষক কেন নয়?
আর যদি না-ই পারেন, তবে কি রাষ্ট্র তাদের এমন অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে বিকল্প পথ খোঁজা ছাড়া উপায় নেই?

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/০১/০৩/২০২৬

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.