।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান ।।
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। রাজধানীর একটি মোড়ে ডিউটি করছিলেন একজন কনস্টেবল। ট্রাফিক জট, হর্নের শব্দ, মানুষের বিরক্তি—সব মিলিয়ে চেনা দৃশ্য। হঠাৎ কয়েকজন তরুণ মোটরসাইকেল নিয়ে সিগন্যাল ভেঙে চলে যেতে চাইলে পুলিশ থামান। পরিচয় জানতে চাইতেই শুরু হয় হাসাহাসি, তারপর মোবাইল ক্যামেরা অন, আর মুহূর্তেই অশ্লীল স্লোগান—
“পুলিশ কোন চ্যা– বা…”
চারপাশে লোক জড়ো হয়। কেউ থামায় না, কেউ প্রতিবাদ করে না। বরং অনেকে ভিডিও করে, যেন এটা বিনোদন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। শিরোনাম—“মেধাবী যুবকের সাহসী প্রতিবাদ!”
এই দৃশ্য কি বিচ্ছিন্ন? নাকি আমাদের সময়ের প্রতিচ্ছবি?
অশ্লীল ভাষা কি প্রতিবাদের ভাষা?
প্রতিবাদ মানেই কি গালি? প্রশ্ন করা, সমালোচনা করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা—এসব গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু সেই ভাষা যদি হয় অশ্লীল, হিংস্র ও অপমানজনক, তবে তা আর প্রতিবাদ থাকে না; হয়ে ওঠে নৈতিক দেউলিয়াপনা।
আজ এক শ্রেণির যুব সমাজ নিজেদের ‘মেধাবী’, ‘সচেতন’, ‘প্রগতিশীল’ প্রমাণ করতে গিয়ে ভাষার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। তারা ভুলে যাচ্ছে—ভাষাই মানুষকে সভ্য করে, আবার ভাষাই মানুষকে পশুত্বের দিকে ঠেলে দেয়।
ইসলাম ভাষাকে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, চরিত্রের আয়না হিসেবে দেখেছে।
কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন—
“মানুষ এমন কোনো কথা উচ্চারণ করে না, যা তার কাছে সংরক্ষক ফেরেশতা লিপিবদ্ধ করে না।”
(সূরা ক্বাফ: ১৮)
অর্থাৎ, প্রতিটি শব্দের দায় আছে—দুনিয়ায় যেমন, আখিরাতেও তেমন।
রাসুল (সা.) বলেছেন—
“মুমিন কখনো গালাগালকারী, অভিশাপদাতা, অশ্লীলভাষী ও অশোভন আচরণকারী হতে পারে না।”
(তিরমিজি)
এখানে স্পষ্ট—অশ্লীল ভাষা শুধু সামাজিক অপরাধ নয়, এটি ঈমানি দুর্বলতার লক্ষণ।
নিরাপত্তা বাহিনী কোনো ব্যক্তি বা দল নয়—এটি রাষ্ট্রের একটি স্তম্ভ। পুলিশকে গালি দেওয়া মানে আইনের শাসনকে তুচ্ছ করা। আজ পুলিশকে, কাল বিচারককে, পরশু শিক্ষককে—এভাবেই সমাজে কর্তৃত্ব ও শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন,-“সমালোচনা ও অপমানের পার্থক্য না জানলে সমাজ অরাজকতার দিকে যায়। নিরাপত্তা বাহিনী দুর্বল হলে সবচেয়ে বেশি ভোগে সাধারণ মানুষ।”
তিনি আরও বলেন, অনলাইনে পুলিশকে হেয় করা ভবিষ্যতে বাস্তব সহিংসতার মনস্তত্ত্ব তৈরি করে।
শিক্ষক সমাজ কী বলছে
একজন শিক্ষক নেতা জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন,-“এটা শুধু রাজনৈতিক বা সামাজিক সমস্যা না, এটি শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যর্থতা। আমরা ভালো রেজাল্ট শেখাচ্ছি, ভালো মানুষ হওয়া শেখাচ্ছি না।”
তার মতে, পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—দুটোই ভাষার শালীনতা শেখাতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিশুরা ছোটবেলা থেকেই ঘরে, রাস্তায়, টিভিতে, ইউটিউবে অশ্লীল ভাষা শুনে বড় হচ্ছে। পরে সেটাকেই ‘সাহস’ মনে করছে।
রিকশাচালক থেকে শুরু করে দোকানি, গৃহিণী—অনেকেই ক্ষুব্ধ। এক মধ্যবয়সী মানুষ বলেন,
“আজ পুলিশকে গালি দিচ্ছে, কাল আমাদেরই দেবে। তখন কি কেউ প্রতিবাদ করবে?”
আরেকজন বলেন,
“আমরা ভয় পাই। এরা আইন মানে না, শালীনতা মানে না—এরা ভবিষ্যতে কী করবে?”
এই নীরব সাধারণ মানুষই আসলে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়—এই অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সমাজের বড় অংশ নীরব। কেউ বলে, “ছেলে মানুষ”, কেউ বলে, “সময়ই খারাপ”। কিন্তু ইতিহাস বলে, নীরব সমাজেই অবক্ষয় দ্রুত ছড়ায়।
আজ যদি গালিকে ‘এক্সপ্রেশন’ বলা হয়, তবে আগামী প্রজন্ম কী শিখবে?
এই সংস্কৃতি থেকে মুক্তির উপায়
© পরিবারে ভাষার শিক্ষা: বাবা-মাকে বুঝতে হবে, সন্তানের মুখের ভাষা তার ভবিষ্যৎ চরিত্র গড়ে।
© শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষা: পাঠ্যবইয়ে শুধু তথ্য নয়, মূল্যবোধ থাকতে হবে।
© সোশ্যাল মিডিয়ায় দায়িত্বশীলতা: অশ্লীল ভিডিও ভাইরাল না করে বর্জন করতে হবে।
© আইনের প্রয়োগ: গালাগাল ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে হেয় করা যেন ‘হালকা বিষয়’ না থাকে।
© ধর্মীয় ও সামাজিক সচেতনতা: মসজিদ, মন্দির, চার্চ—সব জায়গা থেকেই শালীনতার বার্তা আসতে হবে।
সাহস মানে গালি নয়। সাহস মানে সত্য বলা, শালীনভাবে প্রতিবাদ করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো—কিন্তু মানবিক সীমার ভেতরে থেকে।
নিরাপত্তা বাহিনী নিখুঁত নয়, সমালোচনার ঊর্ধ্বেও নয়। কিন্তু অশ্লীল ভাষায় অপমান করা কোনো সংস্কার আনে না, বরং সমাজকে আরও অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
আজ আমরা যদি ভাষার অবক্ষয়কে ‘মেধা’ বলে প্রশ্রয় দিই, তবে কাল সভ্যতার সংজ্ঞা বদলে যাবে। প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি সেই বাংলাদেশই চাই?
লেখক : এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান, শিক্ষক ও গবেষক।
শিক্ষাবার্তা /এ/ ০৮/০২/২০২৬
দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
