।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
ভোরের আজানের পরপরই ঘুম ভাঙে রফিকের। অ্যালার্মের দরকার হয় না—ভাড়া দেওয়ার তারিখ যত কাছে আসে, ঘুম তত হালকা হয়ে যায়। রান্নাঘর থেকে চায়ের কেটলির শব্দ আসে, কিন্তু চা আর গলা দিয়ে নামতে চায় না। টেবিলের ওপর বেতনের কাগজটা পড়ে আছে—সংখ্যাগুলো সে মুখস্থ করে ফেলেছে। মোট বেতন, বিদ্যুৎ বিল, স্কুলের বেতন, বাজার খরচ—সব হিসাব মিলে শেষ পর্যন্ত যে সংখ্যাটা দাঁড়ায়, সেটার নাম ‘ভাড়া’। মাস শেষে রফিক বুঝতে পারে, সে আসলে নিজের জন্য নয়, একটা ছাদের জন্যই কাজ করে যাচ্ছে।
এই শহরে রফিক একা নয়। হাজারো মধ্যবিত্ত মানুষের সকাল শুরু হয় একই রকম দুশ্চিন্তা নিয়ে—এ মাসে মালিক কী বলবেন? ভাড়া বাড়ানোর ইঙ্গিত দেবেন কি না? বাসা ছাড়তে বললে নতুন বাসা পাওয়া যাবে তো? সন্তানদের স্কুল বদলাতে হবে না তো? ঢাকা শহরে ভাড়াটে হওয়া মানে শুধু একটি বাসায় থাকা নয়; প্রতিদিন অনিশ্চয়তার সঙ্গে সহাবস্থান করা।
এমনই এক সকালে সংবাদমাধ্যমে চোখ পড়ে নতুন খবরের দিকে—ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বাড়িভাড়া নিয়ে নতুন নির্দেশিকা দিয়েছে। সেখানে লেখা, বাড়ির বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশ পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া যাবে। হিসাব মিলিয়ে দেখতেই রফিকের বুকের ভেতরটা কেমন শূন্য হয়ে যায়। তার বাসা যে এলাকায়, সেখানে ৭০ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট কেনাবেচা হয়। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে তার বাসার ভাড়া হওয়া উচিত মাসে ৮৭ হাজার টাকা। অথচ সে দেয় ১৮ হাজার। এতদিন যে ভাড়ায় সে বেঁচে ছিল, সেটাকেই এখন মনে হচ্ছে কোনো দয়ার দান।
রফিক জানে, আজ নয়—কালই হয়তো মালিক এসে বলবেন, “নতুন নিয়ম হয়েছে, আমাদেরও কিছু করার নেই।” সে জানে, এই শহরে নিয়মের চেয়ে ক্ষমতা বড়, আর ভাড়াটের ক্ষমতা সবচেয়ে কম। নির্দেশিকার ভাষা যতই ‘সুরক্ষা’র কথা বলুক, বাস্তবে সেটি রফিকের মতো মানুষের কাছে কেবল একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছে—এই শহরে থাকার অধিকার দিনে দিনে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।
এই হতাশা, এই ভয়ের জায়গা থেকেই প্রশ্ন ওঠে—ডিএনসিসির এই নির্দেশিকা কি সত্যিই ভাড়াটে সুরক্ষার জন্য, নাকি এটি ভাড়া বৃদ্ধির একটি নীলনকশা, যেখানে ৭০ লাখ টাকার ফ্ল্যাটে মাসিক ৮৭ হাজার টাকা ভাড়া ‘বৈধ’ হয়ে যায়?
এই নীতিমালা কার্যকর হলে বহু বাড়ির মালিক সহজেই বলতে পারবেন, “আমরা তো নিয়মের মধ্যেই আছি।” এতদিন যারা তুলনামূলক কম ভাড়ায় বাসা দিয়েছিলেন, তাঁরাও নতুন নির্দেশিকাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ভাড়া কয়েক গুণ বাড়াতে পারবেন। আইন যেখানে ভাড়াটেদের সুরক্ষার কথা বলে, সেখানে বাস্তবে এই নির্দেশিকা ভাড়াটেদের ওপর নতুন বোঝা চাপানোর আইনি বৈধতা তৈরি করছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—বিদ্যমান আইনের সঙ্গে এই নির্দেশিকার সাংঘর্ষিক দিক। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী অগ্রিম হিসেবে এক মাসের বেশি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু ডিএনসিসির নির্দেশিকায় সেই সীমা বাড়িয়ে এক থেকে তিন মাস করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—সিটি করপোরেশন কি সংসদে প্রণীত আইনের চেয়েও বড় ক্ষমতাধর?
আইন যেখানে ভাড়াটের পক্ষে, সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কীভাবে মালিকদের জন্য বেশি ‘উদার’ নিয়ম তৈরি করে?
এই নির্দেশিকা প্রণয়নের সময় ভাড়াটে সংগঠন, ভোক্তা অধিকারকর্মী বা নগর বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে—এমন কোনো তথ্য সামনে আসেনি। বরং দেখা যাচ্ছে, বাজারমূল্যের ওপর ভিত্তি করে ভাড়া নির্ধারণের এমন এক সূত্র চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ঢাকার বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই বেমানান। ঢাকায় ফ্ল্যাটের দাম অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিমভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে—জমির দালাল, আবাসন ব্যবসায়ী ও কালোটাকার প্রবাহে। সেই অস্বাভাবিক বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশকে ভাড়ার মানদণ্ড বানানো মানে ভাড়াটেদের শ্বাসরোধ করা।
আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—ভাড়াটের আয় কোথায় বিবেচনায় নেওয়া হলো? ঢাকার অধিকাংশ ভাড়াটে মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত। সরকারি চাকরিজীবী, বেসরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, ছোট ব্যবসায়ী—এঁদের বড় অংশের মাসিক আয় ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে। সেখানে ৭০–৮০ হাজার টাকা ভাড়া দেওয়ার ‘আইনি বৈধতা’ তৈরি হলে ভাড়াটেরা যাবে কোথায়? শহরের বাইরে? বস্তিতে? নাকি চাকরিই ছেড়ে দেবে?
বাড়ির মালিকদের যুক্তি সাধারণত একটাই—“আমরা বিনিয়োগ করেছি, লাভ তো চাই।” এই যুক্তির বিপক্ষে কেউ নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতটা লাভ ন্যায্য? কোনো ব্যবসায় কি সাত বছরের মধ্যে পুরো বিনিয়োগ তুলে নেওয়াই নীতি? অথচ ১৫ শতাংশ হারে ভাড়া নিলে সাত বছরের মধ্যেই একটি ফ্ল্যাটের নির্মাণ ও ক্রয়মূল্য উঠে আসে। এরপর বছরের পর বছর যে ভাড়া আসবে, তা নিট মুনাফা। তাহলে এই নীতিমালা কি বাড়িকে আবাসনের বদলে ‘নিশ্চিত লাভের মেশিনে’ পরিণত করছে না?
বিশ্বের বড় বড় শহরে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নীতি। অনেক দেশে ভাড়া বৃদ্ধির হার নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে দেওয়া হয়, ভাড়াটেকে উচ্ছেদ করার আগে কঠোর শর্ত থাকে, এমনকি আয়ভিত্তিক ভাড়া নির্ধারণের ব্যবস্থাও আছে। আর আমরা কী করছি? বাজারমূল্যের ওপর ভাড়া নির্ধারণ করে বাজারকেই চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক বানিয়ে দিচ্ছি—যে বাজার আগে থেকেই নিয়ন্ত্রণহীন।
এই নির্দেশিকার আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো—এটি ধাপে ধাপে ভাড়া বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করবে। অনেক মালিক হয়তো এক লাফে ৮৭ হাজার টাকা নেবেন না, কিন্তু বলবেন—“নির্দেশিকা অনুযায়ী তো নিতে পারি।” ফলে প্রতিবছর ১০–১৫ শতাংশ করে ভাড়া বাড়ানো হবে। ভাড়াটে প্রতিবাদ করতে গেলেই উত্তর আসবে—“আইন আমাদের পক্ষে।”
এভাবে ভাড়াটে ও মালিকের মধ্যে যে অসম ক্ষমতার সম্পর্ক, তা আরও প্রকট হবে। ভাড়াটের হাতে কোনো কার্যকর প্রতিকার থাকবে না। থানায় গেলে বলা হবে—এটা দেওয়ানি বিষয়। আদালতে গেলে বছরের পর বছর মামলা চলবে। আর সিটি করপোরেশন? তারা নির্দেশিকা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছে।
ভাড়াটে সুরক্ষার প্রকৃত অর্থ যদি বাস্তবায়ন করতে হতো, তবে করণীয় ছিল ভিন্ন। প্রথমত, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে কার্যকর করা। দ্বিতীয়ত, এলাকা ও আয়ভিত্তিক ভাড়ার একটি বাস্তবসম্মত কাঠামো তৈরি করা। তৃতীয়ত, অগ্রিম ভাড়ার নামে লুট বন্ধ করা। চতুর্থত, ভাড়াটেদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কার্যকর ট্রাইব্যুনাল বা সেল গঠন করা। কিন্তু এসব কঠিন পথ এড়িয়ে সহজ পথ বেছে নেওয়া হয়েছে—মালিকদের খুশি রেখে ভাড়াটেদের ওপর দায় চাপানো।
হাওলাদার নামের একজন সচেতন নাগরিক বলেন-এই হিসাব কাগজে-কলমে বৈধ,
কিন্তু বাস্তব জীবনে এটা মধ্যবিত্তের শ্বাসরোধ।
যে শহরে মানুষের বেতন বাড়ে না,
যেখানে শিক্ষক, কর্মচারী, চাকরিজীবী মাস শেষে হিমশিম খায়—
সেই শহরে বাজারদরের ১৫ শতাংশ ভাড়া চাপানো মানে
ভাড়াটেকে শহর ছাড়ার নোটিশ দেওয়া।
ভাড়াটে সুরক্ষার নামে
এটা সুরক্ষা নয়,
এটা ভাড়া বৃদ্ধির নেশাগ্রস্ত নীলনকশা।
এই নির্দেশিকা তাই ভাড়াটে সুরক্ষার দলিল নয়, বরং ভাড়া বৃদ্ধির আইনি ছাতা। ঢাকার মতো জনবহুল, বৈষম্যপীড়িত শহরে এমন নীতিমালা সামাজিক অস্থিরতা বাড়াবে, মধ্যবিত্তকে আরও কোণঠাসা করবে এবং আবাসনকে মানুষের মৌলিক অধিকার নয়, নিছক লাভের পণ্যে পরিণত করবে।
সময় এসেছে এই নির্দেশিকা পুনর্বিবেচনার। নইলে ইতিহাসে এটি স্মরণ থাকবে—ভাড়াটে সুরক্ষার নামে ভাড়াটেকে ঠেলে দেওয়ার এক পরিকল্পিত অধ্যায় হিসেবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক।।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
