।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় “বার্ষিক ছুটি” শব্দটি যতটা স্বস্তির মনে হওয়ার কথা, বাস্তবে শিক্ষক ও কর্মচারীদের কাছে তা ততটাই বিভ্রান্তিকর ও হতাশাজনক। কাগজে-কলমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বছরে প্রায় ৭৬ দিন ছুটি দেখানো হলেও বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে—এই ছুটির বড় একটি অংশ আদৌ ছুটি নয়। বরং হিসাবের খাতায় ছুটি, কিন্তু বাস্তবে দায়িত্ব পালন—এ এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতারণা।
বাংলাদেশে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার ও শনিবার। অথচ বার্ষিক ছুটির তালিকা প্রণয়নের সময় দেখা যায়, বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিবস যেগুলো স্বাভাবিকভাবেই শুক্রবার বা শনিবারে পড়ে, সেগুলোকেও আলাদা করে বার্ষিক ছুটি হিসেবে গণনা করা হয়। এতে করে প্রকৃত ছুটির সংখ্যা কাগজে বাড়লেও বাস্তবে শিক্ষক–কর্মচারীদের কোনো অতিরিক্ত বিশ্রাম মেলে না।
উইলস লিটন ফ্লাওয়ার স্কুল এন্ড কলেজে সিনিয়র শিক্ষক মতিয়ার রহমান আক্ষেপ করে বলেন, “শুক্রবার এমনিতেই ছুটি। সেই দিন যদি কোনো দিবস পড়ে, সেটাকেও ছুটি ধরা হয়। তাহলে আমাদের বাড়তি কী পাওয়া গেল? এটা তো ছুটি গণনার নামে চোখে ধুলো দেওয়া।”
সমস্যা আরও গভীর হয় তখন, যখন কোনো কোনো দিবস শুক্রবার বা শনিবারে পড়লেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তা আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করা হয়। শহীদ দিবস, জাতীয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দিবসে শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক। অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা, র্যালি, সাংস্কৃতিক আয়োজন—সবকিছুতেই সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে হয়।
ইন্জিনিয়ারিং স্কুল এন্ড কলেজের প্রভাষক সোহেল রানা বলেন, “যেদিন আমরা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানে থাকি, সভা-অনুষ্ঠান করি, শিক্ষার্থীদের তদারকি করি—সেই দিনকে কীভাবে ছুটি বলা যায়? অথচ সেই দিনটিও বার্ষিক ছুটির হিসাব থেকে কেটে নেওয়া হয়।”এটি কেবল যুক্তিহীনই নয়, বরং শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়নের পরিপন্থী।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও করুণ। অফিস সহকারী, লাইব্রেরিয়ান, ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট, পিয়ন, নৈশপ্রহরী—এই কর্মচারীরা দিবস পালনসহ নানা প্রশাসনিক কাজে প্রায়ই অতিরিক্ত সময় কাজ করেন। কিন্তু ছুটির হিসাবের ক্ষেত্রে তারাও একই বৈষম্যের শিকার।
কর্মচারী ফেডারেশন এর মহাসচিব রাজা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমরা ছুটি পেলাম কই? দিবসের দিন ডিউটি করি, অনুষ্ঠান শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকি। তারপর শুনি, ওই দিন নাকি আমাদের বাৎসরিক ছুটির মধ্যেই ধরা হয়েছে। এটা তো ছুটি নয়, এটা ঠকানো।”
এই কৃত্রিম ছুটির হিসাব শিক্ষক–কর্মচারীদের মধ্যে মানসিক চাপ ও পেশাগত ক্লান্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। নিয়মিত পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সহশিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রকৃত বিশ্রামের সুযোগ না থাকলে কর্মক্ষমতা কমে আসাটাই স্বাভাবিক।
শিক্ষক নেতা প্রকৌশলী আলমগীর হোসেন বলেন, “আমাদের বলা হয় শিক্ষকরা অনেক ছুটি পান। কিন্তু বাস্তবে আমরা ছুটি কাটানোর সুযোগই পাই না। বছরের পর বছর ধরে এভাবে চলতে থাকলে মানসিকভাবে ভেঙে পড়া ছাড়া উপায় থাকে না।”
শিক্ষক নেতা আবু রায়হান বলেন– এই বিষয়টিকে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও অব্যবস্থাপনার ফল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বার্ষিক ছুটির সংজ্ঞা ও গণনার পদ্ধতিই ভুল।“সাপ্তাহিক ছুটি কখনোই বার্ষিক ছুটির অংশ হতে পারে না। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমনীতির পরিপন্থী। তদুপরি, যেদিন শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে দায়িত্ব পালন করেন, সেই দিনকে কোনোভাবেই ছুটি বলা যায় না।”
শিক্ষক নেতা প্রিন্সিপাল সেলিম মিয়া বলেন,“এটা নিছক প্রশাসনিক ভুল নয়, এটা পরিকল্পিত অবহেলা। ছুটির নামে শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে। আমরা চাই এই নীতির অবিলম্বে সংশোধন।”
বিষয়টি সমাধানে কয়েকটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি—
© সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোকে বার্ষিক ছুটির হিসাব থেকে সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে।
© যে সব দিবসে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম পালন করা হয়, সেগুলোকে ছুটি হিসেবে গণ্য না করে কর্মদিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
© প্রকৃত ছুটির একটি স্বচ্ছ ও যৌক্তিক তালিকা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষক ও কর্মচারীরা বাস্তব অর্থেই বিশ্রামের সুযোগ পান।
© এই বিষয়ে শিক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে নীতিমালা চূড়ান্ত করা উচিত।
শিক্ষা ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি শিক্ষক ও কর্মচারীরা। তাদের ন্যায্য অধিকার উপেক্ষা করে, কাগজে-কলমে ছুটির সংখ্যা দেখিয়ে বাস্তবে কাজ করিয়ে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। “বার্ষিক ছুটি” যদি সত্যিই ছুটি না হয়, তবে তা নতুন নামে ডাকাই শ্রেয়। নতুবা এই প্রতারণামূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে শিক্ষক–কর্মচারীদের প্রকৃত বিশ্রাম নিশ্চিত করাই হবে একটি মানবিক ও ন্যায্য রাষ্ট্রের পরিচয়। কারণ ক্লান্ত, বঞ্চিত ও হতাশ শিক্ষক দিয়ে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ আলোকিত হতে পারে না।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক।
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
