এইমাত্র পাওয়া

১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস: বেগম খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক উদ্যোগ

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 
একটি জাতির সভ্যতা, মূল্যবোধ ও অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে ওঠে শিক্ষার মাধ্যমে। আর সেই শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন শিক্ষক।

অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ ও সামাজিক আলোচনায় শিক্ষক সমাজ দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত থেকেছে। এই প্রেক্ষাপটে ১৯ জানুয়ারিকে “জাতীয় শিক্ষক দিবস” হিসেবে ঘোষণা ছিল বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় অধ্যায়।

বিশেষ করে সদ্য প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে ২০০৩ সালে জাতীয় শিক্ষক দিবসের প্রবর্তন ছিলো শিক্ষক সমাজের জন্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর শিক্ষা ব্যবস্থার নানা সংস্কার হলেও শিক্ষকদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির প্রশ্নটি বরাবরই প্রান্তিক ছিল। শিক্ষকরা জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে কথায় সম্মান পেলেও বাস্তবে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ছিল সীমিত।

ঠিক এই জায়গা থেকেই ১৯ জানুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা একটি প্রতীকী নয়, বরং নৈতিক ও রাজনৈতিক বার্তা বহন করেছিল—রাষ্ট্র শিক্ষককে শুধু কর্মচারী নয়, জাতি গঠনের অংশীদার হিসেবে দেখে।

২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার প্রত্যক্ষ উদ্যোগে ১৯ জানুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো শিক্ষক সমাজ রাষ্ট্রীয়ভাবে আলাদা করে সম্মানিত হওয়ার সুযোগ পায়।

ওই বছর রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহমেদ জাতীয় শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন স্তরের শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের হাতে জাতীয় পুরস্কার তুলে দেন। এটি ছিল কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়; বরং শিক্ষক সমাজের আত্মমর্যাদা পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।

এই দিবস ঘোষণার পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলনও ছিল। শিক্ষকরা তখন নানা সংকটে জর্জরিত—এমপিও জটিলতা, স্বল্প বেতন, পদোন্নতির অনিশ্চয়তা ও সামাজিক অবমূল্যায়ন।

জাতীয় শিক্ষক দিবস শিক্ষক সমাজকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করেছিল। রাষ্ট্র যখন শিক্ষককে সম্মান জানায়, তখন সমাজও তাকে ভিন্ন চোখে দেখতে শেখে। ফলে শিক্ষকতার পেশা তরুণদের কাছে কিছুটা হলেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

এখানে স্মরণ করা প্রয়োজন, বেগম খালেদা জিয়া নিজে একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতেন। তার শাসনামলে শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ এবং শিক্ষক কল্যাণমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।

জাতীয় শিক্ষক দিবস ঘোষণা সেই ধারাবাহিকতারই অংশ। এটি প্রমাণ করে, শিক্ষা ও শিক্ষক বিষয়ে তার অবস্থান ছিল কৌশলগত নয়, বরং দর্শনগত।

বর্তমানে একটি বিতর্কিত বাস্তবতা হলো—জাতীয় শিক্ষক দিবস কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া। ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫ অক্টোবরকে “বিশ্ব শিক্ষক দিবস” হিসেবে পালন করা হচ্ছে, জাতীয় শিক্ষক দিবসের পরিবর্তে। আন্তর্জাতিক দিবস পালন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—তাহলে জাতীয় শিক্ষক দিবসের প্রয়োজন কী ছিল, এবং কেন সেটি হারিয়ে গেল?

বিশ্ব শিক্ষক দিবস একটি বৈশ্বিক প্রতীক; কিন্তু জাতীয় শিক্ষক দিবস ছিল আমাদের নিজস্ব প্রেক্ষাপটে শিক্ষকদের সম্মান জানানোর দিন। জাতীয় দিবসের মাধ্যমে রাষ্ট্র তার শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষক সংকট ও বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোকে আলাদাভাবে তুলে ধরতে পারত। আন্তর্জাতিক দিবসের আড়ালে সেই জাতীয় দায়বদ্ধতা কিছুটা হলেও ম্লান হয়ে গেছে বলে মনে করেন অনেক শিক্ষাবিদ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—জাতীয় শিক্ষক দিবস ছিল একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্য। ইতিহাসের সেই অধ্যায় অস্বীকার করলে বা উপেক্ষা করলে আমরা কেবল একটি দিবস নয়, বরং শিক্ষক সমাজের প্রতি রাষ্ট্রের একটি নৈতিক দায়ও অস্বীকার করি। ইতিহাস মুছে ফেললে বাস্তবতা বদলায় না; বরং তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করে।

আজ যখন আমরা শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলি, তখন শিক্ষক সম্মানের বিষয়টি নতুন করে ভাবা জরুরি। শিক্ষককে অনুপ্রাণিত না করে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার অসম্ভব। জাতীয় শিক্ষক দিবস ছিল সেই অনুপ্রেরণার প্রতীক। এটি ফিরিয়ে আনা না গেলেও অন্তত তার ইতিহাস স্বীকার করা উচিত।

বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে জাতীয় শিক্ষক দিবস প্রবর্তন প্রমাণ করে—রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও কখনো কখনো সামাজিক ন্যায়বোধের প্রকাশ হতে পারে। শিক্ষক সমাজকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া ছিল একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। এই ইতিহাস স্মরণ করা মানে কোনো ব্যক্তি বা দলকে মহিমান্বিত করা নয়; বরং শিক্ষা ও শিক্ষকতার মর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

পবিত্র কুরআনের প্রথম ওহিতেই আল্লাহ তায়ালা শিক্ষা ও জ্ঞানের নির্দেশ দিয়েছেন— “পড়ো তোমার প্রভুর নামে” (সূরা আল-আলাক: ১)।
এ থেকেই বোঝা যায়, শিক্ষা ছাড়া মানবজীবন পূর্ণতা পায় না, আর শিক্ষক ছাড়া শিক্ষা বাস্তবায়িত হয় না।
আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, “আল্লাহ তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞান দেওয়া হয়েছে—তাদের মর্যাদা বহু স্তরে উন্নীত করবেন” (সূরা আল-মুজাদিলা: ১১)।

এই আয়াত জ্ঞানী ও শিক্ষক সমাজের সম্মান আল্লাহর পক্ষ থেকেই নির্ধারিত বলে ঘোষণা দেয়।
রাসূলুল্লাহ সা: শিক্ষকদের মর্যাদা তুলে ধরে বলেন,
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং শিক্ষা দেয়” (বুখারি)।
আরেক হাদীসে তিনি বলেন, “নিশ্চয়ই আমাকে শিক্ষক হিসেবেই প্রেরণ করা হয়েছে” (ইবনে মাজাহ)। অর্থাৎ শিক্ষকতা নবীজির মিশনের অংশ।

শিক্ষক নেতা জাকির হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও সম্মানের দাবিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পর্যায়ে তুলে এনেছিলেন। শিক্ষকদের ন্যায্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ১৯ জানুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে প্রবর্তন করেন, যা বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।

শিক্ষক নেতা জসিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বাস করতেন—শিক্ষক সম্মানিত না হলে শিক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী হয় না। তাই তাঁর নেতৃত্বে শিক্ষকরা প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও সম্মান লাভের সুযোগ পেয়েছিলেন। জাতীয় শিক্ষক দিবসের সূচনা ছিল শিক্ষক সমাজের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।

আরেক শিক্ষক নেতা প্রিন্সিপাল সেলিম মিঞা  বলেন, আজও শিক্ষক সমাজ সেই ঐতিহাসিক উদ্যোগ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে। তিনি বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া শুধু রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি ছিলেন শিক্ষাবান্ধব রাষ্ট্রনায়ক—যিনি শিক্ষকদের জাতি গঠনের মূল শক্তি হিসেবে দেখেছেন।”

শেষ কথা হলো—একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায়, যখন সে তার শিক্ষককে সম্মান করতে শেখে। ১৯ জানুয়ারি জাতীয় শিক্ষক দিবস সেই শিক্ষাই দিয়েছিল। ইতিহাসের সেই অধ্যায় আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শিক্ষকের সম্মান মানেই জাতির সম্মান। 

লেখক : শিক্ষক ও গবেষক। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.