এইমাত্র পাওয়া

৯৫ শতাংশ শিক্ষার কারিগরদের এলপিআর কেন অনুপস্থিত?

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 
রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষা খাতের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। আর এই শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হচ্ছেন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মচারীরা। বাংলাদেশের বাস্তবতায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, যেখানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীরা এমপিওভুক্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—এই বিশাল অবদান সত্ত্বেও তারা এখনও অনেক মৌলিক ও মানবিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত, যার অন্যতম হলো অবসর-পূর্ব এলপিআর (Leave Preparatory to Retirement)।
সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের আগে এক বছর বা নির্ধারিত সময় এলপিআর ভোগ করার সুযোগ পান। এই সময়টুকু একজন কর্মজীবী মানুষের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর হঠাৎ করে দায়িত্ব, রুটিন, সহকর্মী এবং সামাজিক পরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া মানসিকভাবে সহজ নয়। এলপিআর মূলত সেই মানসিক ও সামাজিক শূন্যতা মোকাবেলার একটি মানবিক ব্যবস্থা। এই সময় একজন কর্মচারী ধীরে ধীরে অবসরজীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান।

কিন্তু এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ক্ষেত্রে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অবসরের শেষ দিন পর্যন্ত তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন। যেদিন শেষবার স্বাক্ষর করেন, সেদিনই কার্যত তাদের কর্মজীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। পরদিন থেকে আর কর্মস্থলে যাওয়ার সুযোগ নেই, নেই মানসিকভাবে প্রস্তুত হওয়ার সময়ও। হঠাৎ করেই তারা নিজেকে এক গভীর শূন্যতার মধ্যে আবিষ্কার করেন।

এই আকস্মিক বিচ্ছিন্নতা অনেক সময় মানসিক কষ্ট, হতাশা এমনকি স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই এই বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করা হচ্ছে। এই সংগঠনের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভুঁইয়া  যথার্থই বলেছেন, এলপিআর কেবল একটি প্রশাসনিক সুবিধা নয়, এটি একটি মানবিক অধিকার। যারা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয় করেছেন শিক্ষার্থীদের মানুষ করার কাজে, তাদের অবসর যেন কষ্টের না হয়—এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠে আসে—যখন সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষকরা একই শিক্ষাব্যবস্থার অংশ, একই পাঠ্যক্রম অনুসরণ করেন, একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেন, তখন সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে এই বৈষম্য কেন?

সংবিধানের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান অধিকারপ্রাপ্ত। অথচ বাস্তবে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বারবার বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

এলপিআর না থাকার ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা শুধু মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং আর্থিক ও পারিবারিক পরিকল্পনাতেও সংকটে পড়েন। অবসর-পূর্ব সময়টুকুতে একজন কর্মজীবী মানুষ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, চিকিৎসা, পারিবারিক দায়িত্ব বণ্টন এবং সামাজিক জীবনের পুনর্গঠনের সুযোগ পান। এই সময় না পেলে অবসরজীবন অনেকটাই অনিশ্চিত ও আতঙ্কপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্র যখন ডিজিটাল বাংলাদেশ, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছে, তখন শিক্ষকদের মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করা আরও জরুরি। কারণ সম্মানিত ও নিরাপদ শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেম জাগ্রত করতে। শিক্ষক যদি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত থাকেন, তাহলে তার পক্ষে পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে শিক্ষাদান করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এলপিআর চালু করলে সরকারের ওপর অতিরিক্ত বড় কোনো আর্থিক চাপ পড়বে—এমন ধারণাও বাস্তবসম্মত নয়। বরং এটি একটি পরিকল্পিত ও পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। একই সঙ্গে এটি শিক্ষক সমাজের মধ্যে আস্থা, সন্তুষ্টি ও কর্মস্পৃহা বাড়াবে, যা পরোক্ষভাবে শিক্ষার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি কেবল সুবিধার প্রশ্ন নয়, এটি সম্মানের প্রশ্ন। অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক যেন রাষ্ট্রের কাছ থেকে অবহেলিত বোধ না করেন। তিনি যেন গর্ব করে বলতে পারেন, রাষ্ট্র তার দীর্ঘ শ্রমের মূল্য দিয়েছে, তার মানবিক চাহিদাকে গুরুত্ব দিয়েছে।

অতএব, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য সরকারি চাকরিজীবীদের ন্যায় এলপিআর ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এটি কোনো অযৌক্তিক দাবি নয়, বরং ন্যায্য ও মানবিক দাবি। শিক্ষক কর্মচারী ঐক্যজোটের এই দাবি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার শিক্ষা খাতের প্রতি তার আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতার প্রমাণ দিতে পারে।

শেষ পর্যন্ত বলতে হয়, একটি সভ্য রাষ্ট্র তার প্রবীণ নাগরিকদের—বিশেষ করে শিক্ষক সমাজকে—কীভাবে অবসর জীবনে সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়, তার মাধ্যমেই রাষ্ট্রের মানবিক মানদণ্ড নির্ধারিত হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এলপিআর প্রদান সেই মানবিক রাষ্ট্র গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। এখন প্রয়োজন সদিচ্ছা ও নীতিনির্ধারকদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। 

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading