নিউজ ডেস্ক।।
একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছিলেন শেখ হাসিনা, জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একই অপরাধে সেই আদালতেই মৃত্যুদণ্ড হল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর।
তুমুল আন্দোলনের মুখে সরকারের পতনের পর ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার এই দণ্ড তার দল আওয়ামী লীগকে পাঁচ দশক পর আবার বিপর্যয়ের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
পঁচাত্তরে শেখ হাসিনার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগে ভাঙন ধরলেও তখন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়নি।
এবার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর আওয়ামী লীগ ও তার সব সংগঠনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, নির্বাচনের পথও বন্ধ হয়ে গেছে নিবন্ধেন স্থগিত করায়।
ফলে আওয়ামী লীগ ভবিষ্যতে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কী না, নেতাকর্মীদের কী ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে, সেসব বিষয় সামনে এসেছে।
সোমবার বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল-১ শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রাণদণ্ড দিয়েছে তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকেও। রাজসাক্ষী হয়ে অপরাধ স্বীকার করায় পাঁচ বছর কারাভোগের লঘুদণ্ড পেয়েছেন ওই সময়ের পুলিশ প্রধান চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। শেখ হাসিনার সঙ্গে তার বোন শেখ রেহানা ভারতে চলে যান। দলের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতারও সেখানে থাকার খবর এসেছে।
অভ্যুত্থানের পর জনরোষের মুখে বাড়ি ছাড়া হয়েছেন টানা সাড়ে ১৫ বছর দেশ শাসন করা আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ নেতাকর্মী, দেশে কিংবা বিদেশে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পরও এক ধরনের ছন্নছাড়া অবস্থার মধ্যে পড়েছিল আওয়ামী লীগ, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায়ও আসে দলটি।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা বর্তমান সরকার, দলটির উদ্যোগ এবং ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিন্তু এর আগে বলেছে যে, বিচার প্রক্রিয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আছে। তো এখন এটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই নিষেধাজ্ঞা কী কী প্রক্রিয়ার কোন পর্যায়ে এসে পুনর্বিবেচনা করা হবে? পুনরায় বহাল হবে নাকি নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে? সেটাও কিন্তু আওয়ামী লীগের ফেরা না ফেরার ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ‘টার্নিং পয়েন্ট’।”
এর বাইরে শেখ হাসিনা ছাড়া আওয়ামী লীগ কীভাবে এগোবে তা সরকার এবং তার দলের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এই বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি যে কর্মকাণ্ডগুলো আমরা আজকে সারাদিন ধরে দেখেছি, বিশেষ করে ৩২ নম্বর। এখনো ৩২ নম্বর (বঙ্গবন্ধুর বাড়ি) ‘রাজনৈতিক জুজু’ হিসেবে কাজ করছে। সেটি কিন্তু আমার কাছে মনে হয় যে, আওয়ামী লীগকে আনার প্রক্রিয়ায় কিন্তু সেটি একটি দরজা খুলে দিতে পারে।
“বিশেষ একটা গোষ্ঠী যে বারবার করে ৩২-কে টার্গেট করে আগানো এবং সেটা এই রায়ের দিনও এবং এর আগে আমরা দেখেছি। এটা শেখ হাসিনাবিহীন আওয়ামী লীগের চিন্তায় রসদ হতে পারে আপাতভাবে।”
এছাড়া ভূ-রাজনৈতিক বিষয়ও সমানভাবে প্রভাব ফেলতে পারে- এমন ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, “ভারত বলেছে যে, শেখ হাসিনাকে তারা ফেরত দেবে না। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কিংবা এর আগে আমরা দেখেছি, যেটা সরকার পরিবর্তনে আমেরিকার ভূমিকার কথা বিভিন্ন জায়গা থেকে বলা হয়েছে। এবং বারবার আওয়ামী লীগও বলেছে যে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র দ্বারা তাদেরকে উত্খাত করা হয়েছে।
“এবং এখনো আমরা দেখেছি যে আজকে ‘একটা চুক্তি খুবই গোপনে’ স্বাক্ষরিত হল। যেটি হল আন্তর্জাতিক একটা প্রক্রিয়ারই অংশ, আন্তর্জাতিক আগ্রহের একটা অংশ। বন্দরগুলোকে বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া। তো সেক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় যখন একই দিনে ঘটে, তখন কিন্তু শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায়টি আওয়ামী লীগের ফেরা বা না ফেরার ক্ষেত্রে শুধু একটি একক শর্ত হিসেবে হাজির হয় না।”
কোনো রাজনৈতিক দলকে ‘আইন করে নিষিদ্ধের পক্ষে না’ থাকার কথা তুলে ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন বলেন, “এখনকার পরিস্থিতি খুব সহিংস হতে পারে এবং নির্বাচন যত এগোবে সেই ক্ষেত্রে যে ৩২ থেকে ৩৫ শতাংশ সমর্থক আছে আওয়ামী লীগের, তাদের নড়াচড়া এবং তাদের ‘অ্যাকশনের’ ওপরেও নির্ভর করবে অনেক কিছু।”
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর সংসদ লেকে ভাসানো হয় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী গয়না নৌকা, যা আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর সংসদ লেকে ভাসানো হয় গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী গয়না নৌকা, যা আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রতীক।
হাসিনার দণ্ডিত হওয়ার মানে কী
২০১৩ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের আগে গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ সংশোধন আওয়ামী লীগই বিধান করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে ‘কোনো অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত হইয়াছেন’ এমন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার ‘যোগ্য হইবেন না’।
সে বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরই সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অযোগ্য হয়ে গেছেন শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। এখন মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়ে যাওয়ায় সেটা আরও জোরালো হল।
শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে পলাতক দেখিয়ে জুলাই গণহত্যা মামলার বিচার চলায় কোনো আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ ছিল না তাদের। ফলে, রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন তাদের পক্ষে মামলা লড়েছেন।
ট্রাইব্যুনালে রায় হওয়ার পর রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবীর জন্য আর কোনো আইনি প্রক্রিয়া সামনে না থাকার কথা বলেছেন তিনি।
অন্যদিকে, প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম বলেছেন, পলাতক থাকাবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল করার সুযোগ আসামিদের নেই। আপিল করতে হলে আগে তাদেরকে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
এর আগে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, চৌধুরী মঈনুদ্দিন ও আশরাফুজ্জামানসহ বেশ কয়েকজনের পলাতক অবস্থায় বিচার হয়েছিল। তাদের কেউ আত্মসমর্পণ করেননি এবং আপিলও করতে পারেননি।
পলাতক আসামিদের আপিলের বিষয়ে এক প্রশ্নে সোমবার তাজুল ইসলাম বলেন, “যেকোনো আদালতে কোনো আদেশের বিরুদ্ধে যদি আপিল করতে হয়, যেমন আমাদের এই মামলায় ৩০ দিনের মধ্যে আসামিরা চাইলে সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করতে পারবেন। কিন্তু সেই আপিল দায়ের করতে হলে পলাতকরা কেউ করতে পারবেন না, কারণ পলাতক ব্যক্তির আইনগত কোনো অধিকার থাকে না।
“সুতরাং আপিল করতে হলে অবশ্যই তাকে (শেখ হাসিনা) বাংলাদেশে এসে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং জেলে গিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্টের কাছে তার সাজার বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন। যদি আত্মসমর্পণ না করেন, তাহলে আপিলের অধিকার থাকবে না।”
শেখ হাসিনাকে ফেরানো কীভাবে?
ভারত সরকারের ‘অতিথি’ হিসেবে দিল্লিতে শেখ হাসিনার অবস্থানের কথা লিখেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম।
২০২৪ সালের অক্টোবরে হাসিনার বিচারের উদ্যোগ নেওয়ার পর তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এরপর দুদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফেরত দিতে দিল্লিতে চিঠি পাঠিয়েছিল ঢাকা।
এর মধ্যে একটি মামলায় বিচারকাজ শেষ হয়ে গেলেও তাকে ফেরত চেয়ে পাঠানো চিঠির কোনো জবাব দেয়নি ভারত সরকার।
সোমবার জুলাই আন্দোলনে মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির রায় হওয়ার পর শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে আবারও ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
এদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আজকের রায়ে পলাতক আসামি শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত এই ব্যক্তিদের দ্বিতীয় কোনো দেশ আশ্রয় দিলে তা হবে অত্যন্ত অবন্ধুসুলভ আচরণ এবং ন্যায়বিচারের প্রতি অবজ্ঞার সামিল।
“আমরা ভারত সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই তারা যেন অনতিবিলম্বে দণ্ডপ্রাপ্ত এই দুই ব্যক্তিকে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। দুই দেশের মধ্যে বিরাজমান প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুসারে এটি ভারতের জন্য অবশ্য পালনীয় দায়িত্বও বটে।”
আর রায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, হাসিনাকে ফেরত চেয়ে আবারও দিল্লিতে চিঠি পাঠাবে সরকার।
প্রত্যর্পণ চুক্তির পাশাপাশি ইন্টারপোলের মাধ্যমে পলাতক হাসিনা ও কামালকে ফেরত আনার প্রচেষ্টা চালানোর কথা সোমবার বলেছেন প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, “দুই উপায়ে পলাতক আসামিদের, তাদেরকে আনা যেতে পারে। একটি হল, ২০১৩ সালে বহিঃসমর্পণ যে চুক্তি হয়েছিল…
“সেই চুক্তি অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন, তাদেরকে বাংলাদেশ ভারত সরকারের কাছে ফেরত চাইবে এবং ভারত সরকার যদি আইনের শাসন, ন্যায়বিচারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়, তারা সেই আসামিদেরকে ফেরত প্রদান করবেন। এবং তাদেরকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে তাদেরকে যে সাজা দেওয়া হয়েছে, সেটা কার্যকর করা যাবে।”
এছাড়া ইন্টারপোলের মাধ্যমে দেশে ফেরানোর চেষ্টা চালানোর কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সেটি হচ্ছে, যেহেতু বাংলাদেশের একটি উপযুক্ত আদালতে তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে, তাদেরকে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়ে এসে সাজা কার্যকর করা যেতে পারে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।”
রায় নিয়ে শেখ হাসিনার প্রতিক্রিয়া
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সঙ্গে দাবি করেছেন, তিনি কিংবা তার দলকে আত্মপক্ষ সমর্থনের ‘ন্যায্য সুযোগ’ দেওয়া হয়নি।
সোমবার রায়ের পর শেখ হাসিনা এক বিবৃতিতে এমন প্রতিক্রিয়া জানান বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে।
রায়ের পর শেখ হাসিনা বিবৃতিতে বলেন, “এর মাধ্যমে একটি অনির্বাচিত সরকারের উগ্রপন্থি ব্যক্তিদের বেপরোয়া ও হত্যার মানসিকতা বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে।”
জুলাই আন্দোলন দমনে ১৪০০ জনকে হত্যায় উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দেওয়া, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজের’ মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। তার মধ্যে চার অভিযোগে শেখ হাসিনাকে দোষী সাব্যস্ত করেছে ট্রাইব্যুনাল।
সবগুলো অভিযোগ অস্বীকারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিরুদ্ধে ‘পক্ষপাতের’ অভিযোগ তুলেছেন শেখ হাসিনা।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার কতদূর?
‘অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি করতে ২০২৪ সালের ২ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে আবেদন জমা দেয় জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম)।
এনডিএমের চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজের জমা দেওয়া ওই অভিযোগে বলা হয়, আওয়ামী লীগ এবং ১৪ দলের শরিক রাজনৈতিক দলগুলো গণহত্যার সরাসরি হুকুমদাতা এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র ও জনতার আন্দোলন নির্মূলের জন্য দায়ী।
গত ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। জেলায় জেলায় একই ঘটনা ঘটেছে।
গত ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর ঢাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। জেলায় জেলায় একই ঘটনা ঘটেছে।
দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ সংগঠনগুলোর বিচারের তদন্ত কাজ শুরুর কথা গত ২ অক্টোবর জানিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি তাজুল ইসলাম।
এর মধ্যে সোমবার রায় হওয়া মামলার তথ্য উপস্থাপনের সময়ও আওয়ামী লীগকে ‘অপরাধী সংগঠন’ হিসেবে তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছিল প্রসিকিউশন। তবে এই মামলার বিচার্য বিষয় না হওয়ায় এ বিষয়ে কোনো পর্যবেক্ষণ রায়ে দেয়নি আদালত।
এ বিষয়ে তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ১৪ দলের ব্যাপারে ব্যাপারে প্রসিকিউশনের যে আলাদা তদন্ত চলমান আছে, দল হিসাবে সংগঠনের ব্যাপারে যে, তারা সত্যিকার অর্থে অপরাধী কি-না, সেটা একটা আলাদা মামলায় বিচার্য বিষয় হতে পারে।
“এই মামলাতে যেহেতু কোনো দল পক্ষ নয়, বা আসামি হিসেবে সম্পৃক্ত করা হয়নি, সে কারণে আদালত দলীয়ভাবে কারও ব্যাপারে পর্যবেক্ষণ দেওয়া থেকে বিরত থেকেছেন।”
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কী হয়েছিল?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর পাল্টে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার ঘনিষ্ঠদের অনেকেই যোগ দেন খুনিদের সঙ্গে। পরে কারাগারে হত্যা করা হয় আওয়ামী লীগের শীর্ষ চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের এই চার নেতা জাতীয় নেতা হিসেবেও খ্যাত।
এমন বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগেও দেখা দেয় ভাঙন, যা অব্যাহত থাকে ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরও।
পঁচাত্তর পরবর্তী আওয়ামী লীগের বিভক্তি সম্পর্কে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ তার ‘আওয়ামী লীগ: উত্থান পর্ব ১৯৪৮-১৯৭০’ বইয়ে লিখেছেন, “শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর আওয়ামী লীগ মোটামুটি ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছিল। দলের মধ্যে ছন্দটা হারিয়ে গিয়েছিল। মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে আলাদা আওয়ামী লীগ–এমন পরিস্থিতিতে দল আবার ভাঙার অবস্থা হয়েছিল।”
১৯৮১ সালের ১৩ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় হোটেল ইডেনে। এ অধিবেশনে সর্বসম্মতভাবে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে শেখ হাসিনাকে নির্বাচিত করা হয়। আর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত করা হয় আব্দুর রাজ্জাককে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতি হিসেবে দেশে ফিরে কয়েক ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ।
শেখ হাসিনাতেই ‘আস্থা’ আওয়ামী লীগের
আদালতে শাস্তি প্রাপ্ত বা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর দলীয় পদ থাকবে কি, থাকবে না এমন কোনো বিষয় আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে বলা নেই। তবে এ বিষয় নিয়ে গঠনতন্ত্রের ৬০ ধারায় বলা আছে, “এই গঠনতন্ত্রে যেসব বিষয়ে উল্লেখ নাই, সেই সকল বিষয়ে উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কার্যনির্বাহী সংসদ বা জাতীয় কমিটির থাকিবে।”
প্রাণদণ্ডের রায় হওয়ার পরও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ওপরই আস্থা রাখার কথা বলেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আওয়ামী লীগ সব সময়ই জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল, আছে। ভবিষ্যতেও আওয়ামী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ থাকবে।”
আওয়ামী লীগের কর্মসূচি কীভাবে কার নেতৃত্বে পালন হবে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগের সকল কর্মসূচি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সারাদেশের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পালন করবে। আর আওয়ামী লীগের নেতারা নেত্রীর নির্দেশনায় দলের কর্মসূচি পূর্বের ন্যায় ঘোষণা করবে।”
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে নিয়মিত বিভিন্ন লাইভ অনুষ্ঠানে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন ভারতে অবস্থান করা শেখ হাসিনা। বিদেশের মাটিতে আওয়ামী লীগ এবং অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে টেলিফোনে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে তাকে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সম্প্রতি তার ইমেইল সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। এগুলোতে জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমা না চাওয়ার কথা বলেন তিনি। এবং মামলাকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত’ হিসেবে অভিহিত করেন।
দেশ ছাড়ার পর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের স্থানীয় নেতারা বিচ্ছিন্নভাবে সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল করে আসছে। এর মধ্যে ঢাকার তেজগাঁও, গুলিস্তান ও খামারবাড়িতে কয়েকহাজার দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছে নেতাকর্মীরা।
প্রায় ১৪ মাস পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমানোর চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দায়ের করা মামলার তারিখ নির্ধারণ নিয়ে ১০ থেকে ১৩ নভেম্বর বিক্ষোভ ও ‘ঢাকা লকডাউন’ কর্মসূচি দেয় আওয়ামী লীগ।
সেক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাই এই ‘লকডাউনের’ ডাক দিয়েছে। দেশে থাকা নেতাকর্মীরা তাদের ডাকেই বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন।
আগামী দিনেও কর্মসূচি সফল করার জন্য বিদেশে বসে নানা বার্তা দিচ্ছেন তারা, যা পালন করার ঘোষণা দিয়ে আসছে দেশে থাকা নেতাকর্মীরা।
শেখ হাসিনার মামলার রায় ঘোষণার দিনটিকে ঘিরে আওয়ামী লীগ অনলাইনে রোববার থেকে দুই দিন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত বোমাবাজি আর যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটছে গত কয়েক দিন ধরেই। ঢাকায় দেখা না গেলেও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর আগে দুই নেত্রী বেশ কয়েকবার একসঙ্গে রাজনৈতিক কারণে কারাগারে গেলেও, ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে প্রথমবারের মতো আইনি প্রক্রিয়ায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। ছবি: সংগৃহীত
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। এর আগে দুই নেত্রী বেশ কয়েকবার একসঙ্গে রাজনৈতিক কারণে কারাগারে গেলেও, ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে প্রথমবারের মতো আইনি প্রক্রিয়ায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। ছবি: সংগৃহীত
কর্মসূচি দেওয়া হলেও মাঠে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন।
সোমবার ফেইসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি লিখেছেন, “৩০০ জন এমপির পক্ষে কী নিজ নিজ সংসদীয় আসনে ১০০ জন লোকের একটা করে মিছিল করানোর সামর্থ নাই? প্রায় ৫০ জন মন্ত্রীদের পক্ষে কী ৫০টা মিছিল আয়োজনের সামর্থ নাই?
“৮১ জন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের প্রত্যেকের পক্ষে ১০০ জন করে ৮১টা মিছিল আয়োজনের সামর্থ নাই? বিভিন্ন জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানার নেতাদের কী একটা করে মিছিল আয়োজনের সামর্থ নাই? নৌকার নমিনেশন নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়রদের পক্ষে কী একটা করে মিছিল করানোর সামর্থ নাই?”
এরপর তিনি লেখেন, “আসলে বিগত ষোল বছরে বঙ্গবন্ধু কন্যা কিছু অথর্ব ও চাটুকারদেরকে নেতৃত্বের আসনে বসিয়েই আওয়ামী লীগটাকে পোকলা করে দেওয়া হয়েছে। সুসময়ের সেইসব নেতা নামের অথর্ব ও চাটুকারদের প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ করছি।”
পটপরিবর্তনে উল্টে যায় পাশার দান
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আদালতেই আদালতের রায় পাল্টে যাওয়ার ঘটনা দেখা গেছে অতীতে। যে ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কামালের প্রাণদণ্ড হয়েছে, সেই ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের দায়ে একই দণ্ড হয়েছিল জামায়াত নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামের।
জুলাই আন্দোলনের পটপরিবর্তন পর সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ আবেদন করে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস পেয়েছেন তিনি। মুক্ত হয়েছেন কারাগার থেকে।
একই পটপরিবর্তনের পর একে একে বিভিন্ন মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অনেক নেতা।
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল আদালত।
একইসঙ্গে তার ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মাগুরার সাবেক সংসদ সদস্য কাজী সালিমুল হক কামাল, ব্যবসায়ী শরফুদ্দিন আহমেদ, কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী ও মমিনুর রহমানকে ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেয় আদালত।
এরপর নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কারাগারে বিশেষ জেলে কারান্তীণ হন তিনি।
সেই কারাগারে থাকাবস্থায় ওই বছরের অক্টোবরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় আরও সাত বছরের কারাদণ্ড হয় তার।
আর জিয়ার অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় হাই কোর্টে খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়।
খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর মায়ের জায়গায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের হাল ধরেন তারেক রহমান, যিনি লন্ডনে আছেন। এখনও সে পদে আছেন দলের সিনিয়র এই ভাইস চেয়ারম্যান।
দুই মামলায় দণ্ডিত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী ২০২০ সাল থেকে সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি পান। এর পর থেকে ছয় মাস পরপর সেই সাময়িক মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছিল।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরদিন ৬ অগাস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে খালেদা জিয়ার দণ্ড মওকুফ করেন।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সাজা মওকুফের পরও খালেদার আইনজীবীরা আপিলের পথে যান। গত বছরের নভেম্বরে দুই মামলায় সাজা স্থগিত করে সুপ্রিম কোর্ট। সে মাসেই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় খালেদা জিয়াকে খালাস দেয় হাই কোর্ট।
আর চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা ও তারেককে খালাস দেয় আপিল বিভাগ।বিডিনিউজ
Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
শিক্ষাবার্তা ডট কম অনলাইন নিউজ পোর্টাল
