এইমাত্র পাওয়া

সরকার বদলায়, দালাল বদলায়—চাঁদাবাজি বদলায় না

।। এ এইচ এম সায়েদুজ্জামান।। 

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল দর্শন—জনগণই রাষ্ট্রের মালিক, আর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেই মালিকের সেবক। রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংবিধান, প্রশাসনিক নৈতিকতা—সব তত্ত্বই একক কথাই বলে: জনগণকে সেবা দেওয়া সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

কিন্তু বাস্তবতা আমাদের সামনে যে চিত্র তুলে ধরে তা হলো উল্টো। সেবা পেতে হলে জনগণকেই সেবকদের কাছে মাথা নত করে এগোতে হয়, কখনো ফাইল আটকে, কখনো ইচ্ছাকৃত জটিলতা তৈরি করে, কখনো ভয় দেখিয়ে, কখনো ‘উপরি’ বা ‘দ্রুত সেবা ফি’ নামে চাঁদা আদায় করে।

এ যেন রাষ্ট্রীয় সেবার বিনিময়ে আরেকটি অনানুষ্ঠানিক রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে গেছে—দালাল রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রের পাসপোর্ট নেই, ক্ষমতার কোনো আনুষ্ঠানিক বলয় নেই; তবুও এদের ক্ষমতা বাস্তব।

সরকার বদলায়, দল বদলায়, আমলা বদলায়; কিন্তু এই দালালচক্র বদলায় না। পরিবর্তন শুধু তাদের পরিচয়ে—কারো রাজনৈতিক রং বদলায়, কারো পৃষ্ঠপোষকতা বদলায়, কারো পদায়নের ক্ষেত্র বদলায়। কিন্তু চাঁদাবাজির ধরন, রেট, রীতি—সবই অপরিবর্তনীয়।

ভূমি অফিস বাংলাদেশের দুর্নীতির অন্যতম সবচেয়ে কুখ্যাত প্রতিষ্ঠান। ভূমি সংক্রান্ত যে কোনো কাজ—খতিয়ান সংশোধন, নামজারি, দাখিলা, পর্চা—শতভাগ নিয়ম মেনেও করা যায় না ঘুষ ছাড়া।

ফাইল আটকে রাখা হয়, নাগরিককে বারবার ঘুরানো হয়, দালালদের হাতে জিম্মি করা হয়। অনেক সাব-রেজিস্ট্রার বা ভূমি কর্মকর্তার অভিযোগ পাওয়া যায় যে, পদায়ন পেতে লক্ষ-কোটি টাকার ঘুষ লাগে। ফলে অফিসে গিয়ে সেই টাকা উদ্ধার করতে হয় জনগণের কাছ থেকে ‘চাঁদা’ আদায় করে।

এই প্রক্রিয়া এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে অনেক কর্মকর্তা এটাই ‘নিয়ম’ ভাবেন। জনগণও জানেন—ভূমি অফিসে যেতে হলে আগে ‘মাথা’ ঠিক করতে হবে, না হলে বছর পার হলেও কাজ হবে না।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), জেলা শিক্ষা অফিস, উপজেলা শিক্ষা অফিস—সবখানেই দালালচক্র সক্রিয়। শিক্ষক নিয়োগ থেকে বদলি, ঊর্ধ্বতন শিক্ষকের এমপিও ভেরিফিকেশন, বিল দাখিল, বেতন উত্তোলন—সবকিছুতেই দালাল লাইন, দালাল সিন্ডিকেট।

এমনকি অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি বা পরিচালনাকারী রাজনৈতিক নেতারাই এই চাঁদাবাজির মূল সুবিধাভোগী।

সুতরাং বর্তমানে শিক্ষা একটি সেবা নয়, বরং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক অর্থনৈতিক চাঁদাবাজির ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।

সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া রোগীর অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো—

ভর্তির সময় ‘চা-পান’ খরচ,

ওয়ার্ড বয়কে টাকা,

অস্ত্রোপচারের সময় অগ্রাধিকার পেতে টাকা,

ডাক্তারের দেখা পেতে টাকা,

বিভিন্ন সেবার বিনিময়ে ‘বখশিশ’,

সিটি স্ক্যান, এক্স-রে বা ল্যাব রিপোর্ট দ্রুত পেতে টাকা,

ওষুধ পাওয়ার সময় দালালদের কমিশন—

সব মিলিয়ে সরকারি হাসপাতালে মানুষ যেন প্রথমে রোগী হিসেবে নয়, বরং অর্থের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

বেসরকারি হাসপাতালের ব্যয় এত বেশি যে, সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেখানেই যদি চাঁদাবাজি হয়, তাহলে রাষ্ট্র কাকে রক্ষা করবে?

পুলিশের কাজ—নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধ রোধ করা। কিন্তু থানায় সেবা নিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা প্রায়ই দুঃস্বপ্নের মতো।

বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়—ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে অভিযোগ জানাতে গেলে তাকে নানা অযুহাতে চাঁদা দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘটনা আরও ভয়াবহ—

পুলিশই চাঁদাবাজদের পক্ষ নেয়,

ভুয়া মামলা দিয়ে ব্যবসায়ীদের চাঁদা আদায়,

গণ মামলায় নিরপরাধদের নাম ঢুকিয়ে চলমান ব্ল্যাকমেইলিং,

দালাল ও পুলিশের আঁতাত,

অপরাধীর সঙ্গে পুলিশের গোপন চুক্তি।

এমন ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন নয়; পুরো কাঠামোতে রূপ নিয়েছে। যখন জনগণের আস্থার শেষ আশ্রয়স্থল ‘থানা’ই চাঁদাবাজির ঘাঁটিতে পরিণত হয়, তখন নাগরিকের রাষ্ট্রে বিশ্বাস ভেঙে পড়ে।

বিআরটিএর ‘নাম’ই আজ ঘুষের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।
লাইসেন্স পেতে হলে—

দালাল ধরতে হয়,

পরীক্ষায় পাস হোক বা না হোক, পাস করে নিতে হয়,

গাড়ির ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন—সবই ঘুষ দিয়ে।

কেউ কেউ বলেন, “বিআরটিএ হচ্ছে দেশের সবচেয়ে সংগঠিত দুর্নীতির কারখানা”।

ফুটপাত দখল, দোকান বসানো, হকারদের নির্দিষ্ট জায়গা বরাদ্দ—এসব সবই চাঁদার ওপর টিকে থাকে।
ফুটপাতের প্রতিটি দোকানের পিছনে থাকে দালাল, রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় মাস্তান ও পুলিশের এক অদৃশ্য চেইন।
একেকজন হকারকে প্রতিদিন ২০০–১০০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়।
চাঁদা দেওয়া না হলে—

দোকান ভেঙে দেওয়া হয়,

পণ্য সরিয়ে নেওয়া হয়,

মামলা দেওয়া হয়।

এখানেও সরকারি ও বেসরকারি দুই গোষ্ঠীর স্বার্থ জড়িত।

সরকার আসে, সরকার যায়। কিন্তু দালালেরা টিকে থাকে। কারণ

দলীয় প্রভাবশালী নেতা, যুব সংগঠনের নেতারা অনেক দালালকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়। ফলে দালালরা সরকার যাই হোক টিকে থাকতে পারে।

একজন কর্মকর্তা যদি পদায়ন পেতে লাখ-কোটি টাকা খরচ করেন, তাহলে তিনি সেই টাকা জনগণের কাছ থেকেই তুলে নেবেন।

অভিযোগ দিলে তদন্ত হয় না, হয় হলেও দোষীদের শাস্তি হয় না। ফলে দালাল চক্র নিরাপদেই থাকে।

যত বেশি জটিল প্রক্রিয়া, তত বেশি দালালের প্রয়োজন হয়—এটাই তাদের শক্তি।

“দ্রুত সেবা চাইলে কিছু দিতে হবে”—এ ধরনের ধারণা সমাজেও স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

চাঁদাবাজী যেকারণে কমছে না। কারণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতেই সমস্যা—

দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা সীমিত,

অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযানগুলো সাময়িক,

রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকে,

মামলা–তদন্তগুলো প্রমাণের অভাবে শেষ হয়ে যায়।

জনগণও প্রতিবাদের ভাষা হারাতে থাকে, কারণ তারা জানে—কথা বললে আরও হয়রানি হবে।

চাঁদাবাজি রাষ্ট্রের দুই স্তরকে ধ্বংস করে—

যখন একজন ভুক্তভোগী থানায় গিয়ে ন্যায়বিচারের বদলে চাঁদা দেওয়ার পরামর্শ পায়, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার বিশ্বাস চূর্ণ হয়।

কিছু কর্মকর্তা যখন চাঁদা খেয়ে পদোন্নতি পায়, তখন সৎ কর্মকর্তারাও হতাশ হয়ে পড়ে।

তারা হঠাৎ ধনী হয়, ক্ষমতাবান হয়। ফলে তরুণরাও মনে করে—সৎ পথে কিছু হয় না।

চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হলে-

সব সেবা ডিজিটালাইজ, ফাইল ট্র্যাকিং সিস্টেম, অনলাইন পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করা।

স্বচ্ছ পদায়ন নীতি, স্বাধীন নজরদারি।

দোষী কর্মকর্তার চাকরি হারানো নিশ্চিত করতে হবে।

যেখানে জনগণের অভিযোগ সরাসরি রেকর্ড হবে।

দালালকে স্বীকৃতি দেওয়াই চাঁদাবাজির প্রথম ধাপ। দালালকে অপরাধী হিসেবে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

ঘুষ না দিয়ে সেবা পাওয়ার অধিকার সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে।

ধর্মীয় অনুশাসন বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের সামাজিক-ধর্মীয় প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ইসলামী শরিয়তসহ ধর্মীয় নীতিতে চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি ও জুলুমকে স্পষ্টভাবে বড় গুনাহ হিসেবে নিন্দা করা হয়েছে। 

চাঁদাবাজি সাধারণত ঘুষের রূপ নেয়। ইসলামে ঘুষ স্পষ্টভাবে হারাম।

রাসুল (সা.) বলেন:“ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত।”

— (আবু দাউদ)

যে সরকারি কর্মকর্তা ঘুষ নেয়, সে গুনাহগার।
যে দালাল হয়ে ঘুষ নেয়, সেও অভিশপ্ত।
যে চাঁদা দেয়—জবরদস্তি হলে তার গুনাহ কম, কিন্তু ব্যবস্থাটি সমর্থন করা কখনোই বৈধ নয়।

জুলুম শুধু শারীরিক নয়; আর্থিক জুলুমও নিষিদ্ধ।
যখন সরকারি সেবা নেওয়ার জন্য মানুষকে বাধ্য হয়ে টাকা দিতে হয়, সেটি জুলুম।

কুরআনে আল্লাহ বলেন: “অবশ্যই জালিমরা সফল হয় না।”

— (সুরা আনআম, ৬:২১)

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সেবা ব্যবস্থায় চাঁদাবাজি আজ একটি গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাধি। সরকার পরিবর্তন হয়, প্রশাসনের কাঠামো বদলায়, রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে—কিন্তু দালালচক্র ও চাঁদাবাজি একই থেকে যায়। কারণ এর শিকড় রয়েছে আমাদের প্রশাসনিক সংস্কৃতি, পদায়ন বাণিজ্য, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্বল নজরদারি ও সামাজিকভাবে দুর্নীতি মেনে নেওয়ার মানসিকতায়। ফলে নাগরিক যে সেবার প্রকৃত মালিক, সে-ই হয়ে ওঠে সবচেয়ে অবহেলিত, প্রতারিত এবং শোষিত পক্ষ।

এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে প্রথমে স্বীকার করতে হবে—চাঁদাবাজি কোনো বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ভেতরে গেঁথে থাকা একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এ রোগের চিকিৎসা শুধু আইন কঠোর করলেই হবে না; প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, স্বচ্ছ পদায়ন, দালালমুক্ত ডিজিটাল সেবা, নির্ভীক তদন্ত ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।

রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে—সেবা দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়, জনগণের মৌলিক অধিকার। এই অধিকার ফিরিয়ে দিতে না পারলে সরকার যতই বদলাক, উন্নয়নের ভাষণ যত জোরালো হোক, দালালচক্র ও চাঁদাবাজির কালো ছায়াই রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে যাবে।

একটি সত্য তাই বারবার ফিরে আসে—
যদি চাঁদাবাজি না থামে, তবে প্রকৃত পরিবর্তন কখনোই আসবে না।

লেখা: শিক্ষক ও গবেষক। 

শিক্ষাবার্তা /এ/২৩/১১/২০২৫

দেশ বিদেশের শিক্ষা, পড়ালেখা, ক্যারিয়ার সম্পর্কিত সর্বশেষ সংবাদ শিরোনাম, ছবি, ভিডিও প্রতিবেদন সবার আগে দেখতে চোখ রাখুন শিক্ষাবার্তায়


Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Discover more from শিক্ষাবার্তা ডট কম

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading